ক্যাবটা তখন উল্টো দিকে যাচ্ছে, মোটামুটি একটা নির্জন জায়গায় ক্যাবটা থামবে, তখন দুই পাশ থেকে আসল ছিনতাইকারীরা উঠবে। তাদেরকে ছিনতাই করে চোখে মলম লাগিয়ে দেবে। ছিনতাইকারীরা কী রকম, তার উপর নির্ভর করে তাদের সাথে কী রকম ব্যবহার করবে। সাধারণত খুবই খারাপ ব্যবহার করে–ছিনতাই হওয়ার এটা হচ্ছে সবচেয়ে খারাপ অংশ, সে জন্যে অনেক দিন মন-মেজাজ খারাপ থাকে। মানুষ যখন মানুষকে সম্মান করে কথা না বলে, তার থেকে বড় অপমান আর কিছু নেই।
ছোটাচ্চু হঠাৎ দেখল তার পাশে মাহী কাঞ্চন থরথর করে কাঁপছে। মানুষটা মনে হয় খুব ভয় পেয়েছে। ছোটাচ্চু তাকে ধরে ডাকল, “কাঞ্চন ভাই।”
মাহী কাঞ্চন কোনো উত্তর দিল না, থরথর করে কাঁপতেই লাগল। ছোটাচ্চু মাহী কাঞ্চনকে ধরে একটা ছোট ঝাঁকুনি দিয়ে বলল, “কাঞ্চন ভাই, কথা বলেন।”
মাহী কাঞ্চন কোনো কথা বলল না, রথর করে কাঁপতেই থাকল। ছোটাচ্চু বলল, “আপনি কি ভয় পেয়েছেন? ভয়ের কিছু নাই। আমি আছি।”
মাহী কাঞ্চন এবারে কিছু একটা বলার চেষ্টা করল, কিন্তু কথাগুলো বোঝা গেল না, অবোধ্য বিলাপের মতো শোনা গেল। ছোটাচ্চু মাহী কাঞ্চনের হাতটা ধরে রেখে ফিসফিস করে বলতে লাগল, “কোনো ভয় নাই। আপনার কোনো ভয় নাই। আমি আছি। আমি আপনাকে দেখে শুনে রাখব। টাকা-পয়সা নিয়ে যাবে, আর কিছু হবে না। আপনার আর কোনো ক্ষতি হবে না! আমি থাকতে আপনার গায়ে আর কেউ হাত দিতে পারবে না।”
হঠাৎ করে ক্যাবটা থেমে গেল, ড্রাইভার বলল, “এই যে থামালাম। নামতে চাইলে নামো।” আগে আপনি করে বলছিল এখন তুমি করে বলছে। একটু পরে তুই করে বলবে। ক্যাবের ড্রাইভার কথা শেষ করে হা হা করে হাসতে থাকল, যেন খুব একটা উঁচুদরের রসিকতা করেছে। ছোটাচ্চু যেরকম ভেবেছিল ঠিক সে রকম দুই পাশ থেকে দুইজন এসে গাড়ির দরজা খুলে ঢুকে গেল আর সাথে সাথে ক্যাবটা ছেড়ে দেয়।
মানুষ দুইজন হাতে লুকানো দুটো চাকু বের করে, কোথায় চাপ দিতেই চাকুর কলা বের হয়ে আসে, ভয় দেখানোর অনেক পুরানো কায়দা। ছোটাচ্চুর জন্যে ঠিক আছে কিন্তু মাহী কাঞ্চনের জন্যে এটা ভয়ঙ্কর হয়ে দাঁড়াল। হঠাৎ করে তার সারা শরীরে খিচুনির মতো শুরু হয়ে গেল, মনে হলো মুখ থেকে ফেনা বের হয়ে আসছে। মানুষটির মনে হয় হার্ট এটাক হয়ে যাবে।
ছিনতাইকারী দুইজন অবশ্যি এর কিছুই লক্ষ করল না, একজন চাকুটা মাহী কাঞ্চনের মুখের উপর নাড়াতে নাড়াতে ড্রাইভারকে জিজ্ঞেস করল, “আজকের মক্কেল কী রকম ওস্তাদ?”
“হাতে ব্যাগ নাই, ল্যাপটপ-ক্যামেরা নাই।”
“ফকিরনীর পুতদের দিয়া বউনি?”
“হ।“
ছোটাচ্চু মাথা ঠাণ্ডা রাখল। ছিনতাইকারীদের কুৎসিত গালাগাল ঠাণ্ডা মাথায় হজম করল, নিজের মানি ব্যাগ, মোবাইল ফোন তুলে দিল, মাহী কাঞ্চনের পকেট থেকে মানি ব্যাগ, মোবাইল বের করে দিতে সাহায্য করল। মাহী কাঞ্চন কেমন যেন আচ্ছন্নের মতো হয়েছিল, ব্যাপারটা বুঝতেই পারল না। ছোটাচ্চু সারাক্ষণ মাহী কাঞ্চনের হাত ধরে রেখে ফিসফিস করে তার কানের কাছে বলতে লাগল, “ভয় নাই। কোনো ভয় নাই। আমি আছি। আপনার কোনো কিছু হতে দিব না, আপনাকে রক্ষা করব–”
মাহী কাঞ্চন ছোটাচ্চুর কোনো কথা শুনল বলে মনে হলো না। ছিনতাইকারী দুজন নেবার মতো যা কিছু আছে তা নিয়ে পকেট থেকে মলমের কৌটা বের করল, কোনো লাভ হবে না জেনেও ছোটাচ্চু নরম গলায় একটু অনুরোধ করল, বলল, “এটা না দিলে হয় না! আমাদের যা ছিল সব তো দিয়েই দিয়েছি! অন্ধকারে তো এমনিতেই কিছু দেখছি না।”
ছোটাচ্চুর পাশে বসে থাকা ছিনতাইকারী হা হা করে হেসে বলল, “কী কইতাছস তুই বেকুবের মতো! এইটা হচ্ছে আমাগো বিজনেসের ট্রেড মার্ক। এইটা না দিলে হয়?”
তারপর প্রথমে খপ করে মাহী কাঞ্চনের চুলের ঝুঁটি ধরে জোর করে চোখের পাতা খুলে এক দলা মলম ঢুকিয়ে দিল। প্রথমে বাম চোখে তারপর ডান চোখে। মাহী কাঞ্চন প্রথমে কেমন যেন গোঙানোর মতো শব্দ করল, তারপর দুই চোখ বন্ধ করে চুপ হয়ে থরথর করে কাঁপতে লাগল।
ছোটাচ্চুর দুই চোখেও মলম ঢুকিয়ে দিল, বাধা দিয়ে লাভ নেই জেনেও ছোটাচ্চু নিজের অজান্তেই খানিকক্ষণ নিজের চোখকে বাঁচানোর চেষ্টা করল, কোনো লাভ হলো না। উল্টো ধারালো চাকুর খোঁচায় কব্জির কাছে খানিকটা কেটে গেল। কী দিয়ে এই মলম তৈরি করে কে জানে–চোখের ভেতরে দেয়া মাত্রই দুই চোখ ভয়ঙ্করভাবে জ্বলতে থাকে, কিছুতেই আর চোখ খোলা রাখতে পারে না।
গাড়ির সামনে থেকে ড্রাইভার জিজ্ঞেস করল, “মক্কেলগো রেডি করছস?”
“জে ওস্তাদ। মক্কেল রেডি।”
“গাড়ি থামাই?”
“থামান ওস্তাদ।”
ছোটাচ্চু টের পেল হঠাৎ করে ক্যাবটা থেমে গেছে। বাম পাশের দরজাটা খোলার শব্দ হলো, তারপর ধাক্কা দিয়ে মাহী কাঞ্চন আর ছোটাচ্চুকে তারা রাস্তার পাশে কাঁদার মাঝে ফেলে দিল। প্রায় সাথে সাথেই ঝপাং শব্দ করে দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ হলো, তারপর গাড়িটা মুহূর্তের মাঝে অদৃশ্য হয়ে গেল।
ছোটাচ্চু বুকের ভেতর থেকে একটা নিঃশ্বাস বের করে দিয়ে মাহী কাঞ্চনকে টেনে দাঁড় করাল। বলল, “কাঞ্চন ভাই, আর কোনো ভয় নাই। বদমাইশগুলো পালিয়েছে।”
মাহী কাঞ্চন কথাগুলো শুনল কি না বোঝা গেল না। শুনলেও বুঝল কি না সেটাও বোঝা গেল না। থরথর করে কাঁপতেই লাগল। ছোটাচ্চু বলল, “চোখের মলম নিয়ে ভয়ের কিছু নাই, ডাক্তারের কাছে গেলেই চোখ ওয়াশ করে দিবে।”
