পাশের বেঞ্চে বসে শক্ত-সমর্থ একজন মানুষ চা খাচ্ছিল, বলল, “আমি আপনাগো আমার রিকশা দিয়া নিয়া যামু। কোনো চিন্তা নাই।”
আশেপাশে দাঁড়িয়ে-বসে থাকা মানুষগুলো মাথা নেড়ে বলল, “হ্যাঁ, মফিজ তুই-ই সাহেবদের লইয়া যা। তোর ধারে-কাছে কোনো সন্ত্রাসী আইব না।”
তাই কিছুক্ষণের মাঝে মফিজ নামের শক্ত-সমর্থ রিকশাওয়ালা তার নতুন রিকশায় ছোটাচ্চু আর মাহী কাঞ্চনকে প্রায় উড়িয়ে নিয়ে চলল। কার সাধ্যি আছে তার ধারে-কাছে কেউ আসে?
রাত সাড়ে এগারোটার দিকে ছোটাচ্চু মাহী কাঞ্চনকে নিয়ে তাদের বাসায় পৌঁছাল, দুজনকে দেখে বাচ্চারা যেভাবে চিৎকার করে উঠেছিল সেটা শুনে আশেপাশে কয়েকটা বাসার ছোট বাচ্চারা চমকে ঘুম থেকে উঠে তাদের কাপড় ভিজিয়ে ফেলেছিল।
রাত বারোটার সময় সব টেলিভিশন চ্যানেলে একটা বিশেষ বুলেটিনে জানানো হলো মাহী কাঞ্চন নিরাপদে ফিরে এসে একটা অজ্ঞাত প্রাইভেট ক্লিনিকে বিশ্রাম নিচ্ছেন। তিনি সুস্থ আছেন এবং ডাক্তারের নির্দেশে তিনি কারো সাথে কথা বলছেন না।
ঠিক তখন আসলে মাহী কাঞ্চন ছোটাচ্চুর একটা লুঙ্গি আর টি-শার্ট পরে খেতে বসেছে। দুশ্চিন্তায় বাসায় কারো খাওয়ার কথা মনে ছিল না, খেতে বসে দেখা গেল সবার প্রচও খিদে। ঝুমু খালা বলে পুরো খাওয়ার পর্বটা সামলে নেয়া গেল তবে সেও হিমশিম খেয়ে গিয়েছিল। মাহী কাঞ্চন যখন বলল ঝুমুর রান্না করা টাকি মাছের ভর্তার মতো সুস্বাদু খাবার সে জীবনে খায়নি তখন ঝুমু খালার মুখে যে হাসিটা ফুটে উঠেছিল সেটা দেখার মর্তে একটা বিষয় ছিল।
রাত একটার দিকে সবাইকে শুতে পাঠানোর চেষ্টা শুরু হলো কিন্তু কাউকে শুতে পাঠানো গেল না। মাহী কাঞ্চনও জানাল সে এত তাড়াতাড়ি ঘুমাতে পারে না। তখন তাকে একটা গান গাওয়ার অনুরোধ করা হলে সে সানন্দে রাজি হয়ে গেল। তিনতলায় মেজ চাচির হারমোনিয়াম নিয়ে আসা হলো এবং মাহী কাঞ্চন রাত তিনটা পর্যন্ত সবাইকে গান গেয়ে শোনাল। (শান্ত মনে মনে হিসেব করে বের করল এই গানগুলো যদি রেকর্ড করে সিডি বানিয়ে বিক্রি করতে পারত তাহলে তার নিট লাভ হতো সাড়ে তিন লক্ষ টাকা!)
রাত সাড়ে তিনটার দিকে বাচ্চাদেরকে জোর করে বিছানায় পাঠানো হলো। তার আগে সবার সাথে মাহী কাঞ্চনের নূতন করে আরো একবার সেলফি তুলতে হলো। মলম লাগানোর কারণে টকটকে লাল চোখের সেলফির নাকি গুরুত্ব অন্য রকম।
ভোররাত চারটার দিকে মাহী কাঞ্চন ছোটাচ্চুর বিছানায় এবং ছোটাচ্চু সোফায় শুতে গেল। (ছোটাচ্চু নিজেও লক্ষ করেনি ঠিক কখন থেকে সে মাহী কাঞ্চনকে ‘তুমি’ বলতে শুরু করেছে।
ঘুম আসছিল না বলে টুনি ভোররাতে একবার উঠে জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়েছিল। সে দেখল তাদের বাসার সামনে একটা সাদা গাড়ি। দেখা না গেলেও বোঝা যাচ্ছিল গাড়ির ভেতর কয়েকজন মানুষ বসে আছে।
.
দুই সপ্তাহ পর মাহী কাঞ্চন তার একটা কনসার্ট শুরু করার আগে মাইক্রোফোন হাতে নিয়ে বলল, “আজকের এই কনসার্টটি আমি উৎসর্গ করতে চাই এমন একজন মানুষকে, যে আমার জীবন বাঁচিয়েছে বলে আমি আজ আপনাদের সামনে হাজির হতে পেরেছি। নিজের জীবন বিপন্ন করে যে মানুষটি আমার জীবন বাঁচিয়েছে তার নাম শাহরিয়ার, মানুষটি আলটিমেট ডিটেকটিভ এজেন্সি নামে বাংলাদেশের প্রথম ডিটেকটিভ এজেন্সি শুরু করেছে। তার প্রতি আমার শ্রদ্ধা। আমার কৃতজ্ঞতা এবং আমার ভালোবাসা।”
বলাই বাহুল্য, এরপর ছোটাচ্চুকে বনানীতে একটা অফিস ভাড়া করতে হয়েছে, একজন অফিস সহকারীসহ তিনজন মানুষকে নিতে হয়েছে। দুইজন পুরুষ, একজন মেয়ে। তারপরও তারা কাজ করে কুলাতে পারছে না। মনে হয় আরো বড় অফিস, আরো কিছু মানুষ নিতে হবে। একটা গাড়ি কিনতে হবে, সাথে একজন ড্রাইভার।
সব মিলিয়ে টুনিও খুব ব্যস্ত।
৬. ছোটাচ্চুর কেমন জানি মন খারাপ
কয়দিন থেকে ছোটাচ্চুর কেমন জানি মন খারাপ। এই বাসার বাচ্চা কাচ্চারা ছোটাচ্চুকে কখনো মন খারাপ করতে দেখেনি, তাই সবাই কেমন জানি অবাক হয়ে গেছে, কী করবে বুঝতে পারছে না। ছোটাচ্চুকে সরাসরি এক-দুইবার জিজ্ঞেসও করা হয়েছে কিন্তু ছোটাচ্চু ঠিক করে উত্তরও দেয়নি। যেমন একদিন ছোটাছু তার বিছানায় পা তুলে গালে হাত দিয়ে বসে আছে, টুনি তার ঘরে ঢুকল। ছোটাচ্চু মাথা ঘুরিয়ে একবার টুনির দিকে তাকাল কিন্তু টুনিকে দেখল বলে মনে হলো না। টুনি ডাকল, “ছোটাচ্চু।”
ছোটাচ্চু উত্তর দিল না। টুনি তখন আবার ডাকল, “ছোটাচ্চু।” এবারে আগের থেকে একটু জোরে।
ছোটাচ্চু এবারে উত্তর দিল। বলল, “উঁ।” তারপর টুনির দিকে তাকিয়ে বলল, “কে? টুনি?”যেন তাকে প্রথম দেখছে।
টুনি মাথা নাড়ল, তারপর ছোটাচ্চুর কাছে গিয়ে বলল, “ছোটাচ্চু, তোমার কী হয়েছে?”
“আমার?” ছোটাচ্চু জোরে জোরে মাথা নেড়ে বলল, “আমার কী হবে? কিছু হয় নাই।”
“তাহলে তুমি কথা-টথা বলো না কেন?”
“কে বলে কথা বলি নাই? এই যে বলছি!”
“আগে প্রত্যেক দিন এসে তোমার অফিসে কী হচ্ছে সেগুলো বলতে, এখন কিছু বলো না।”
“কেন? আমি সেদিন বললাম না অফিসে কী হয়েছে। একটা খুব বড় ক্লায়েন্ট এসেছে, ওরা ভেবেছে চাঁদাবাজ”
টুনি মাথা নাড়ল, “না ছোটাচ্চু তুমি সেটা বলো নাই। চাঁদাবাজ ভেবে কী করেছে সেটা বলো নাই।”
