মাহী কাঞ্চন ঠিক যখন ক্যাবে উঠতে যাবে তখন টুনি বলল, “ছোটাচ্চু, তোমার সাথে যাওয়া উচিত–ওনার একা যাওয়া ঠিক হবে না।”
ছোটাচ্চু বলল, “ঠিকই বলেছিস।”
মাহী কাঞ্চন ব্যস্ত হয়ে বলল, “না না। কোনো দরকার নেই। আমি চলে যেতে পারব।”
ছোটাচ্চু বলল, “সেটা তো নিশ্চয়ই পারবেন। কিন্তু আপনার মতো এত বড় একজন মানুষকে একা যেতে দেওয়া ঠিক না। আমি সাথে আসি, বাসাটাও চিনে আসি।”
ছোটাচ্চু তখন মাহী কাঞ্চনের সাথে ক্যাবের পিছনে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল। ক্যাব চলে যাবার সময় সব বাচ্চারা মিলে হাত নাড়ল, গাড়ির ভেতর থেকে মাহী কাঞ্চন আর তার দেখাদেখি ছোটাচ্চুও হাত নাড়তে থাকল।
.
বচ্চাদের ছোট দলটি যখন ফিরে আসছে তখন তারা দেখল সাদা গাড়িটাকে রাস্তার পাশে দাঁড়া করানো হয়েছে। বাচ্চাদের দেখে গাড়ির পাশে দাঁড়িয়ে থাকা একজন মানুষ এগিয়ে এলো, তাদেরকে জিজ্ঞেস করল, “মাহী চলে গেছে?”
টুনি অবাক হয়ে বলল, “আপনারা কারা?”
মানুষটা বলল, “আমরা মাহীর বডি গার্ড। তাকে সব সময় পাহারা দেই। আজকে কোন হারামজাদা এসে গাড়ির চারটা চাকার হাওয়া ছেড়ে দিয়েছে–তাই তার পিছন পিছন যেতে পারলাম না!”
টুনির মুখ হাঁ হয়ে গেল। মানুষটা বলল, “মাহী কাঞ্চন অনেক বড় গায়ক হতে পারে কিন্তু তার মাথায় ঘিলু বলে কিছু নাই! মাত্র কয়দিন আগে ড্রাগ রিহ্যাব থেকে বের হয়েছে, কখন আবার কোন ছাগল তার হাতে ড্রাগ ধরিয়ে দেবে সেই জন্যে সব সময় তার পিছু পিছু থাকতে হয়। তাকে জানতে দেই না তাহলে চেঁচামেচি করে জান খেয়ে ফেলবে।”
টুনি বলল, “কিন্তু কিন্তু–”
“কিন্তু কী?”
টুনি কী বলবে বুঝতে পারল না। মানুষটা বলল, “তোমাদের বাসায় কেন এসেছিল পাগলটা?”
টুনি বলল, “আমার ছোটাচ্চু একজন ডিটেকটিভ। তাই তার কাছে এসেছিলেন।”
“ডিটেকটিভ? সত্যিকারের ডিটেকটিভ?”
“হ্যাঁ।”
“মাহী পাগলা এসে কী বলেছে তোমার ডিটেকটিভ চাচাকে?”
কী জন্যে এসেছিল সেটা টুনির জানার কথা না তাই ইতস্তত করে বলল, “সেটা তো ঠিক জানি না।”
গাড়ির পাশে দাঁড়িয়ে থাকা আরেকজন বলল, “পাগল মানুষ। কখন তার মাথায় কী চিন্তা আসবে কে জানে!”
প্রথম মানুষটি পকেট থেকে ফোন বের করে কোথায় জানি ফোন করল, তারপর বলল, “শোনো। আমরা মাহীকে ফলো করতে পারছি না। কোন হারামজাদা গাড়ির চারটা চাকা ফ্ল্যাট করে দিয়ে গেছে। যাই হোক, চিন্তা কোরো না, মাহী নিশ্চয়ই কিছুক্ষণে বাসায় পৌঁছে যাবে। একা যায় নাই, সাথে একজন ডিটেকটিভও গেছে। তাই চিন্তার কিছু নাই।”
অন্য পাশ থেকে ফোন করে নিশ্চয়ই জিজ্ঞেস করল পৌঁছাতে কতক্ষণ লাগবে। মানুষটি বলল, “খুব বেশি হলে আধ ঘণ্টা। যদি আধ ঘণ্টার মাঝে না পৌঁছায় আমাকে ফোন কোরো।”
তারপর ফোনটা পকেটে রেখে ড্রাইভারকে বলল, “গাড়ির চাকা ঠিক করার একটা দোকান খুঁজে বের করো। আমরা গাড়ির সাথে আছি। তুমি যাও।”
ড্রাইভার চলে গেল। বাচ্চার দলের সাথে টুনি আর শান্তও ফিরে এলো। শান্ত টুনিকে ফিসফিস করে বলল, “মানুষটার কী মুখ খারাপ দেখেছিস? কী খারাপভাবে আমাকে গালি দিল! ছিঃ!”
.
আধ ঘণ্টা পরও মাহী কাঞ্চন তার বাসায় পৌঁছাল না। ট্রাফিক জ্যামে আটকে গিয়েছে ভেবে আর দশ মিনিট অপেক্ষা করা হলো, তবুও মাহী তার বাসায় পৌঁছাল না। তখন মাহীকে ফোন করা হলো, দেখা গেল মাহীর ফোন বন্ধ। মাহী কাঞ্চনের বডি গার্ড দুজন তখন ছুটে এলো টুনিদের বাসায়। ততক্ষণে এক ঘণ্টা পার হয়ে গেছে। দেখা গেল ছোটাচ্চু বাসায় ফিরেনি। ছোটাচ্চুকে ফোন করা হলো, দেখা গেল তার ফোনও বন্ধ। হঠাৎ করে সবার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল।
.
ক্যাবে ওঠার পর ছোটাচ্চু বা মাহী কাঞ্চনের কেউই বুঝতে পারল যে, তারা খুব বড় একটা বিপদে পড়তে যাচ্ছে। কিছুক্ষণের মাঝেই তারা অবশ্যি সেটা আঁচ করতে পারল, কারণ ক্যাবটা হঠাৎ করে মাহী কাঞ্চনের বাসার দিকে না গিয়ে উল্টো দিকে যেতে শুরু করল। ছোটাচ্চু চিৎকার করে বলল, “কী হচ্ছে? কোন দিকে যাচ্ছেন?”
ড্রাইভার কোনো কথা বলল না, ক্যাব চালিয়ে যেতে লাগল। ছোটাচ্চু এবারে ধমক দিয়ে বলল, “কী হলো, কই যাচ্ছেন আপনি?”
ড্রাইভার এবারেও কোনো কথা বলল না। ছোটাচ্চু বলল, “গাড়ি থামান। আমরা নেমে যাব।”
এবারে ড্রাইভার কথা বলল, “আমি থামাতে পারি। আপনি নামতে পারবেন?” তারপর হা হা করে হাসতে লাগল।
ক্যাবের ড্রাইভার কেন হাসছে ছোটাচ্চু সাথে সাথেই বুঝতে পারল, কারণ ক্যাবের ভেতর দরজা খোলার হ্যাঁন্ডেলগুলো নেই। ভেতর থেকে যেন কেউ খুলতে না পারে সে জন্যে খুলে রাখা হয়েছে। ছোটাচ্চু শুধু শুধু দরজায় কয়েকটা ধাক্কা দিল। কোনো লাভ হলো না, দরজা খুলল না। খুললেও কোনো লাভ হতো না, চলন্ত গাড়ি থেকে ছোটাচ্চু কিংবা মাহী কাঞ্চন কেউই নামতে পারত না।
ছোটাচ্চু মনে মনে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল, সে এই নিয়ে তৃতীয়বার ছিনতাই হতে যাচ্ছে। প্রথমবার খুব ভয় পেয়েছিল, দ্বিতীয়বার সেরকম ভয় পায়নি। এবারে ব্যাপারটা তার কাছে খুবই স্বাভাবিক মনে হতে থাকে। এরপর কী করা হবে ছোটাচ্চু সবকিছু জানে, কাজেই প্রস্তুতি নিতে শুরু করল। মানিব্যাগ থেকে কিছু টাকা বের করে জুতোর ভিতরে ঢুকিয়ে নিল–অন্য কিছু করে লাভ নেই, বিপদ হয়ে যেতে পারে। মোবাইল ফোনের সিমটা খুলে নিতে পারে কিন্তু সেটা সাধারণত ছিনতাইকারীরা নিজেরাই করে দেয়। তাদের জন্যেও কিছু কাজ রাখা দরকার।
