“গাড়ির নিচে ঢুকে চারটা চাকার হাওয়া ছেড়ে দিয়েছি।”
“ওরা বুঝতে পারেনি?”
“গাড়ি স্টার্ট না করা পর্যন্ত মনে হয় টের পাবে না।”
“ওদের কথা শুনেছ কিছু?”
“শুনেছি।“
“কী বলছে?”
“মাহী কাঞ্চনের উপর খুব বিরক্ত হচ্ছে। বলছে তার মাথায় কোনো বুদ্ধি-শুদ্ধি নাই!”
“তাই বলছে? কী আশ্চর্য!”
“হ্যাঁ, মাহী কাঞ্চনকে গালি দিচ্ছে।“
“কেন?”
“সময় নষ্ট করার জন্য।“
“কী আশ্চর্য!”
শান্ত এদিক-সেদিক তাকিয়ে বলল, “এই ঘরটার মাঝে এত পচা গন্ধ কেন? মনে হয় কেউ বাথরুম করে রেখেছে!”
টুনি ভয়ে ভয়ে বলল, “শান্ত ভাইয়া?”
“কী?”
“আসলে পচা গন্ধটা আসছে তোমার শরীর থেকে।”
“আমার শরীর থেকে?”
“হ্যাঁ! তোমার পিছনটা তো দেখতে পাচ্ছি না তাই জানো না। সেখানে অনেক কিছু আছে। তোমার এখনই গরম পানি আর সাবান দিয়ে গোসল করা উচিত।”
“কেন? কী আছে আমার পিছনে?”
“মনে হয় কুকুরের ইয়ে। মানুষেরও হতে পারে–”
শান্ত তখন একটা ভয়ের শব্দ করল, কাকে যেন খুব খারাপ ভাষায় গালি দিল। তারপর নাক-মুখ কুঁচকে ছুটল গোসল করতে। একটু পরেই উপর থেকে শান্ত ভাইয়ার আম্মুর চিৎকার শোনা যেতে থাকল। এটা অবশ্যি নূতন কোনো বিষয় না–শান্ত ভাইয়ের আম্মুকে অনেক চিৎকার করতে হয়।
.
কথাবার্তা শেষ করে মাহী কাঞ্চন যখন চলে যাবার জন্যে উঠে দাঁড়িয়েছে তখন বাচ্চারা আবার তাকে ঘিরে ধরল। তাদের সাথে মাহী কাঞ্চনের ছবি তুলতে হলো। প্রথমে গ্রুপ, তারপর আলাদা, শেষে সেলফি। তারপর সবাইকে অটোগ্রাফ দিতে হলো।
বাসার বড় মানুষেরাও মাহী কাঞ্চনকে একনজর দেখে গেল এবং একসাথে ছবি তুলে গেল। টুনির ভেতর অবশ্যি খুবই অশান্তি। সে মোটামুটি নিশ্চিত যে, ঘর থেকে বের হবার সাথে সাথে সাদা গাড়ি থেকে মানুষগুলো এসে মাহী কাঞ্চনকে টেনে গাড়িতে তুলে নেবে। তবে গাড়ি স্টার্ট করে বেশি দূর যেতে পারবে না, একটা হইচই চিৎকার শুরু হবে, তখন সবাই মিলে হয়তো মাহী কাঞ্চনকে উদ্ধার করবে। পুরো ব্যাপারটা হবে খুবই ভয়ঙ্কর, খুবই ভয়ের এবং খুবই বিপদের। ছোটাচ্চুকে একটু জানিয়ে রাখতে পারলে খুব ভালো হতো কিন্তু সে কোনো সুযোগই পেল না।
তখন হঠাৎ করে টুনির মাথায় একটা বুদ্ধি খেলে গেল। সব বাচ্চাদের সাথে নিয়ে গেলে কেমন হয়? মাহী কাঞ্চনকে সব বাচ্চারা ঘিরে থাকলে কিডন্যাপ করা নিশ্চয়ই এত সোজা হবে না! টুনি তাই হঠাৎ করে বাচ্চাদের দিকে তাকিয়ে বলল, “চলো আমরা মাহী কাঞ্চন চাচ্চুকে আগিয়ে দিই। স্কুটারে না হয় ক্যাবে তুলে দিই।”
সব বাচ্চারা হইহই করে এক কথায় রাজি হয়ে গেল। এরকম সুযোগ তারা আর কখন পাবে? ছোটাচ্চু ইতস্তত করে কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল কিন্তু সুযোগ পেল না, তার আগেই সব বাচ্চা মাহী কাঞ্চনকে ঘিরে তাকে নিয়ে নিচে নামতে শুরু করেছে। শুরুতে তাদের সাথে শান্ত ছিল না কিন্তু সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামতে নামতে সেও চলে এলো, গোসল করে জামা-কাপড় পাল্টে এসেছে।
বাসা থেকে বের হবার সময় টুনির বুক ধকধক করতে থাকে, এক্ষুনি নিশ্চয়ই গাড়িটা স্টার্ট করে পাশে এসে দাঁড়াবে, ঝপাং করে গাড়ির দরজা খুলে যাবে, কয়েকজন মুশকো জোয়ান বের হয়ে আসবে, তারপর বাচ্চাদের ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে মাহী কাঞ্চনকে ধরে টেনে নিয়ে যাবে। মানুষগুলোর হাতে কি বন্দুক-পিস্তল-ছোরা-চাকু কিছু থাকবে? যদি থাকে তাহলে কী হবে?
টুনি চোখের কোনা দিয়ে সাদা গাড়িটা দেখল, এখনো সেটা দাঁড়িয়ে আছে, স্টার্ট করেনি। কখন স্টার্ট করবে?
ছোটাচ্চু মাহী কাঞ্চনকে বলল, “আমরা একটু হেঁটে যাই। রাস্তার মোড়ে সিএনজি পাওয়া যায়। ভাগ্য ভালো থাকলে একটা ক্যাবও পাওয়া যেতে পারে।”
মাহী কাঞ্চন বলল, “চলেন যাই।”
“আপনাকে কেউ চিনে ফেললে সমস্যায় পড়ে যাব।”
“চিনবে না। যেখানে আমার থাকার কথা না সেখানে আমাকে কেউ চিনে না!”
বাচ্চারা মাহী কাঞ্চনকে ঘিরে এগুতে থাকে। অন্ধকারে টুনি আর শান্তর একটু চোখাচোখি হলো কিন্তু কেউ কোনো কথা বলল না। পুরো দলটা যখন আরো এগিয়ে গেল তখন হঠাৎ টুনি শুনতে পেল গাড়িটা স্টার্ট করেছে, হেড লাইট জ্বলেছে, তারপর খুব ধীরে ধীরে এগুতে শুরু করেছে। টুনির বুকটা ধকধক করতে থাকে, আড়চোখে তাকিয়ে দেখল শান্তর শরীরটাও শক্ত হয়ে গেছে। কিডন্যাপাররা সত্যি এসে গেলে অন্যেরা কেউ কিছু না করলেও শান্ত নিশ্চয়ই একটা মারপিট শুরু করে দেবে। কী ভয়ঙ্কর! কী সাংঘাতিক!
টুনি দেখল গাড়িটা গুঁড়ি মেরে খানিকটা এসে হঠাৎ করে থেমে গেল। গাড়ির দরজা খুলে ড্রাইভার নেমে গাড়ির চাকাগুলো পরীক্ষা করে মাথায় হাত দিল। চাপা গলায় কিছু একটা বলল কিন্তু এত দূর থেকে কথাগুলো শোনা গেল না। গাড়ি খুলে তখন আরো দুজন মানুষ নেমেছে, তারাও গাড়িটা ঘুরে দেখছে। হতাশভাবে মাথা নাড়ছে। যার অর্থ গাড়িটা অচল, কিডন্যাপাররা আর গাড়ি নিয়ে আসতে পারবে না। টুনি বুকের ভেতর আটকে থাকা একটা নিঃশ্বাস বের করে দিল।
মাহী কাঞ্চনকে নিয়ে পুরো দলটি তখন রাস্তার মোড়ে চলে এসেছে। সেখানে বেশ কয়েকটা সিএনজি আর একটা ক্যাব দাঁড়িয়ে আছে। ছোটাচ্চু বলল, “আপনাকে ক্যাবে তুলে দিই?”
মাহী কাঞ্চন মাথা নাড়ল। বলল, “ঠিক আছে।”
ছোটাচ্চু তখন ক্যাব ঠিক করতে এগিয়ে গেল, ক্যাবের ড্রাইভারের সাথে কথা বলে ফিরে এসে বলল, “আসেন।”
