“কেন? কেন আমাকে খেতে হবে?” মাহী কাঞ্চন কেমন জানি একটু ভয় পেয়ে যায়।
“আমার ডাইল পুরি দুনিয়ার মাঝে ফার্স্ট ক্লাশ। আমরিকার প্রেসিডেন্ট বারেক মিয়া যদি একবার খায়–”
ছোটাচ্চু বলল, “বারেক মিয়া না। বারাক ওবামা।”
“একই কথা। যদি খায় তাহলে আমারে নোবেল পুরস্কার দিব।”
ছোটাচ্চু বলল, “ঠিক আছে ঝুমু। তুমি যাও। আর আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নোবেল পুরস্কার দেয় না। ডাল পুরি বানানোর জন্যে নোবেল পুরস্কার নাই।”
ঝুমু খালা বলল, “একই কথা।” তারপর তেজি ভঙ্গিতে ঘর থেকে বের হয়ে গেল।
মাহী কাঞ্চন একটা বড় নিঃশ্বাস ফেলে বলল, “আপনাদের পরিবারের মানুষজন একটু অন্য রকম।”
অন্য রকম মানে ভালো না খারাপ ছোটাচ্চু বুঝতে পারল না বলে কোনো কথা বলল না।
মাহী কাঞ্চন বলল, “আপনাকে বলি আমি কেন এসেছি।”
“বলেন।”
মাহী কাঞ্চন এদিক-সেদিক তাকাল তারপর গলা নামিয়ে বলল, “কেউ একজন আমাকে কিডন্যাপ করার চেষ্টা করছে।”
ছোটাচ্চু চমকে উঠে বলল, “কিডন্যাপ? আপনাকে?”
“হ্যাঁ।”
“আপনি কেমন করে জানেন?”
“আমি যেখানেই যাই–আমার মনে হয়–”
“কী মনে হয়?”
“মনে হয় একটা সাদা গাড়ি আমার পিছু পিছু যায়।”
“আপনি আপনার ফ্যামিলির লোকজনকে বলেননি?”
মাহী কাঞ্চন কেমন যেন হতাশভাবে মাথা নেড়ে বলল, “বলেছি। লাভ হয় নাই। সে জন্যেই তো আপনার কাছে গোপনে আসতে হলো।”
ছোটাচ্চু বলল, “কিন্তু আপনার ফ্যামিলিকে বলে লাভ হলো না কেন?”
“তারা আমার কথাকে কোনো গুরুত্ব দেয় না।”
“আপনি এত বড় গায়ক। আপনাকে দেখলে একটা আস্ত জেনারেশান পাগল হয়ে যায়। আর আপনার ফ্যামিলি আপনাকে গুরুত্ব দেয় না এটা কেমন কথা! কেন গুরুত্ব দেয় না?”
মাহী কাঞ্চন কেমন যেন মাছের মতো চোখের পাতি না ফেলে ছোটাচ্চুর দিকে তাকিয়ে রইল, তারপর বলল, “কারণ আছে।”
“কী কারণ?”
“বলা যাবে না।”
ছোটাচ্চু থতমত খেয়ে বলল, “ও।”
.
ঘরের ভেতরে যখন ছোটাচ্চু আর মাহী কাঞ্চন কথা বলছে ঠিক তখন টুনি খুব সাবধানে দরজায় কান পেতে ভিতরে কী আলাপ হচ্ছে শোনার চেষ্টা করছিল। পরিষ্কার শোনা না গেলেও টুনি দরকারি কথাগুলো শুনে ফেলল, মাহী কাঞ্চনকে একটা সাদা গাড়ি অনুসরণ করে, সেই সাদা গাড়ির লোকজন মাহী কাঞ্চনকে কিডন্যাপ করবে। টুনির সারা শরীর শিউরে উঠল, কারণ তারা সবাই যখন জানালায় মুখ লাগিয়ে মাহী কাঞ্চনের গাড়ির জন্যে অপেক্ষা করছিল তখন সে দেখেছে একটা সাদা গাড়ি এসে তাদের বাসার সামনে থেমেছে। সেই গাড়ি থেকে কেউ নামেনি, গাড়িতে অপেক্ষা করছে। মনে হয় তারা মাহী কাঞ্চনকে কিডন্যাপ করবে। আজকে। এখানে। একটু পরে। টুনির গলা শুকিয়ে গেল। সে এখন কী করবে? ছোটাচ্চুকে বলবে? ছোটাচ্চু কি তার কথা বিশ্বাস করবে?
ঠিক তখন শান্ত এদিক দিয়ে হেঁটে আসছিল, টুনিকে দেখে থেমে গেল। বলল, “তোর কী হয়েছে?।”
“সর্বনাশ হয়েছে।”
শান্ত ভয় পাওয়া গলায় জিজ্ঞেস করল, “কী সর্বনাশ হয়েছে?”
“মাহী কাঞ্চন কেন এসেছে জানো?”
“কেন?”
“তাকে কিডন্যাপ করে নিবে, সেটা ছোটাচ্চুকে বলার জন্যে।”
“কে কিডন্যাপ করে নিবে?”
“একটা সাদা গাড়িতে করে এসে অনেকগুলো ক্রিমিনাল।”
শান্ত ভুরু কুঁচকে বলল, “তুই কেমন করে জানিস?”
“আমি দরজার মাঝে কান লাগিয়ে কথা শুনছিলাম।”
শান্ত হাল ছেড়ে দেবার মতো ভঙ্গি করে মাথা নাড়ল, তারপর বলল, “পুলিশকে বলে না কেন? তাহলেই তো পুলিশ পাহারা দিবে। মাহী কাঞ্চনের ভয় কী? সে কত বিখ্যাত জানিস?”
“জানি।”
“তুই না ডিটেকটিভ! এই একটা কথা শুনে তুই এত ভয় পাচ্ছিস কেন?”
টুনি বলল, “আমি কেন ভয় পেয়েছি শুনবে?”
“কেন?”
“মাহী কাঞ্চন যে সাদা গাড়িটার কথা বলেছে সেই সাদা গাড়িটা এখন আমাদের বাসার সামনে দাঁড়িয়ে আছে!”
শান্ত চোখ কপালে তুলে বলল, “কী বললি?”
“মনে নাই একটা গাড়ি এসে থামল-”
“কিন্তু–”
টুনি বলল, “কলিংবেলের শব্দ শুনে তোমরা সবাই চলে গেলে, আমি একটু পরে গিয়েছি, আমি দেখেছি কেউ নামে নাই গাড়ি থেকে। সবাই গাড়িতে বসে আছে।”
“সত্যি?”
টুনি বলল, “হ্যাঁ সত্যি। আমার কথা বিশ্বাস না করলে জানালার সামনে দাঁড়িয়ে দেখো।”
শান্ত টুনির সাথে শোয়ার ঘরের জানালার সামনে দাঁড়িয়ে দেখল সত্যি সত্যি বাসার সামনে একটা সাদা গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। অন্ধকারে পুরো দেখা যায় না কিন্তু বোঝা যায় গাড়ির ভিতরে কয়েকজন চুপ করে বসে আছে। মাহী কাঞ্চন বের হলেই মনে হয় তাকে জাপটে ধরে গাড়িতে তুলে নেবে।
টুনি বলল, “বিশ্বাস হলো?”
শান্ত বলল, “দাঁড়া, দেখাচ্ছি মজা।”
টুনি ভয় পাওয়া গলায় বলল, “কী করবে শান্ত ভাইয়া?”
শান্ত বলল, “মজা বোঝাচ্ছি আমি কিডন্যাপারদের। তুই দাঁড়া এখানে।”
শান্ত কী করবে টুনি জানে না কিন্তু সেটা যে খুব ভালো কাজ হবে না, সেটা বুঝতে টুনির দেরি হলো না। সে খানিকটা ভয় নিয়ে জানালার কাছে দাঁড়িয়ে রইল। দেখল শান্ত খুব সাবধানে পা টিপে টিপে গাড়ির পিছনে নিচু হয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। তারপর মনে হলো চিৎ হয়ে শুয়ে গাড়ির নিচে ঢুকে গেল। টুনির বুক ধকধক করতে থাকে, যদি শান্ত ধরা পড়ে যায় তখন কী হবে?
শান্ত ধরা পড়ল না, কিছুক্ষণের মাঝেই সে ফিরে এলো। তাকে অবশ্যি শান্ত হিসেবে চেনা যায় না। গাড়ির নিচে যত ময়লা ছিল সবকিছু তার পিছনে লেগে আছে। শুধু তা-ই নয়, তার কপালে গ্রিজ এবং নাকের উপর কালি। টুনি জিজ্ঞেস করল, “কী করেছ শান্ত ভাইয়া?”
