ছোটাচ্চু লাল হয়ে বলল, “এরা আমার ছেলে-মেয়ে না। এরা আমার ভাই-বোনের ছেলে-মেয়ে।”
মাহী কাঞ্চন পুরো ব্যাপারটা বুঝতে পেরেছে সেরকমভাবে কয়েকবার মাথা নাড়ল, তারপর আবার তার ভুরু কুঁচকে উঠল। জিজ্ঞেস করল, “কিন্তু তাহলে তো আপনাকে চাচা কিংবা মামা ডাকবে। ছোটাচ্চু ডাকে কেন?”
প্রমি উত্তর দিল, বলল, “আমরা ছোট চাচ্চুকে শর্টকাট করে ছোটাচ্চু বলি।”
“আর যাদের ছোট মামা?”
“তারাও ছোটাচ্চু বলি।”
শান্ত ব্যাপারটা আরো পরিষ্কার করে দিল, বলল, “ছোটাচ্চুর যখন বিয়ে হবে আর যখন ছেলে-মেয়ে হবে তখন তারাও ছোটাচ্চুকে আব্দু না ডেকে ছোটাচ্চু ডাকবে। তাই না রে?”
বাচ্চারা সবাই মাথা নেড়ে সায় দিল। টুম্পা বলল, “আমরা সবাই একসাথে থাকি। তাই যে যেটা ডাকে আমরাও সেটা ডাকি। চাচাকে মামা ডাকি, দাদিকে নানি ডাকি, চাচিকে ভাবি ডাকি, খালাকে আপু ডাকি-”
মাহী কাঞ্চন এবারে পুরোপুরি বিভ্রান্ত হয়ে গেল, অবাক হয়ে বাচ্চাদের দিকে তাকিয়ে রইল। টুনি এই জটিল আলাপটা থামানোর
জন্যে বলল, “আপনি ভিতরে আসবেন না?”
“আসব?”
সব বাচ্চারা চিৎকার করে উঠল, “হ্যা”, তারপর দরজা থেকে সরে তাকে ভেতরে ঢোকার জায়গা করে দিল।
মাহী কাঞ্চন কেমন যেন একটু ভয়ে ভয়ে ভিতরে ঢুকল, ঢুকে এদিক-সেদিক তাকাতে লাগল কিন্তু সব সময়েই বাচ্চাদের দিকে একটা চোখ রাখল।
ছোটাচ্চু বলল, “বসেন।”
মাহী কাঞ্চন কেমন যেন ভয়ে ভয়ে বলল, “বসব?”
ছোটাচ্চু কিছু বলার আগেই বাচ্চারা চিৎকার করে বলল, “বসেন।”
মাহী কাঞ্চন সাবধানে একটা সোফায় বসল। বাচ্চারা তাকে ঘিরে এগিয়ে আসে, মাহী কাঞ্চন কেমন যেন ভয়ে ভয়ে তাদের দিকে তাকিয়ে রইল। ছোটাচ্চু তাদেরকে বলল, “তোরা এখন যা। আমাদের এখন জরুরি কথা আছে।”
টুম্পা বলল, “আমরা বসে থাকি? একটুও ডিস্টার্ব করব না।”
ছোটাচ্চু গলা উঁচিয়ে বলল, “না। ভাগ এখান থেকে। ভাগ।”
“একটু থাকি?”
“না। একটুও না। ভাগ।”
বাচ্চারা মনমরা হয়ে বের হতে থাকে। টুম্পা দরজার কাছাকাছি দাঁড়িয়ে মাহী কাঞ্চনের দিকে তাকিয়ে বলল, “আমি আপনাকে একটু ছুঁয়ে দেখি?”
মাহী কাঞ্চন কেমন যেন চমকে উঠল, বলল, “ছুঁয়ে দেখবে? আমাকে?”
“হ্যাঁ।”
“কেন?”
“গায়কেরা কী রকম হয় দেখতাম। টিপে দেখতাম।”
“টিপে দেখতে?”
ছোটাচ্চু বলল, “না টিপে দেখতে হবে না। একজন মানুষকে আবার টিপে দেখে কেমন করে? যা, ভাগ এখান থেকে।”
“তাহলে ছুঁয়ে দেখি!”
মাহী কাঞ্চন কিছু বলার আগেই ছোটাচ্চু বলল, “না ছুঁয়েও দেখতে হবে না। যা তোরা, আমাদের কথা বলতে দে।”
টুম্পা মুখ কাঁচুমাচু করে বলল, “এই একটুখানি। প্লিজ।”
মাহী কাঞ্চন ভয়ে ভয়ে তার ডান হাতটা টুম্পার দিকে বাড়িয়ে দিল, তখন টুম্পার সাথে সাথে অন্য সবাইও তার হাতটাকে খাবলে ধরল। ছোটাচ্চুকে রীতিমতো যুদ্ধ করে তাদের হাত থেকে মাহী কাঞ্চনের হাতকে ছুটিয়ে আনতে হলো। ছোটাচ্চু তারপর সবাইকে ঠেলে ঘর থেকে বের করে দিয়ে দরজা বন্ধ করে দিল। একটা নিঃশ্বাস ফেলে বলল, “ওহ! এই বাচ্চা-কাচ্চাদের যন্ত্রণায় জীবন শেষ। সবগুলো একটা করে ইবলিশ।”
মাহী কাঞ্চন ভয়ে ভয়ে তার মুক্ত করে আনা হাতটাকে পরীক্ষা করে বলল, “কাজটা ঠিক করলাম কি না বুঝতে পারছি না।”
“কোন কাজটা?”
“এই যে হঠাৎ করে চলে এসেছি। আমি ভেবেছিলাম মোটাসোটা বয়স্ক একজন ডিটেকটিভ হবে, কিন্তু আপনি এত বাচ্চা!”
ছোটাচ্চু মুখ গম্ভীর করে বলল, “বয়সটা নিয়ে দুশ্চিন্তা করবেন না। আমার বয়স কম হতে পারে কিন্তু আমার অভিজ্ঞতা অনেক। আমি অনেক কেস সলভ করেছি। টেলিভিশনে সেটা নিয়ে নিউজ পর্যন্ত করেছে। পুলিশ ডিপার্টমেন্ট থেকে একটা পুরস্কারও পেয়েছি।”
মাহী কাঞ্চন বলল, “জানি। সেই জন্যেই এসেছি। কিন্তু ভাবছিলাম আপনি আরো মোটা হবেন। মোটা আর বয়স্ক।”
ছোটাচ্চু এই প্রথম আরো মোটা না হওয়ার জন্যে একটুখানি হতাশা অনুভব করল কিন্তু কী বলবে বুঝতে পারল না। মাহী কাঞ্চন বলল, “কোনো মানুষের সাথে কথা বললেই আমার মাথায় তার একটা চেহারা ভেসে ওঠে, যদি সেই চেহারার সাথে তার আসল চেহারা না মিলে তখন খুব অস্থির লাগে।”
ছোটাচ্চু দেখল আসলেই মাহী কাঞ্চনকে বেশ অস্থির লাগছে। ভয়ে ভয়ে বলল, “ফ্যানটা ছেড়ে দেব?”
“না। ফ্যান ছাড়তে হবে না।” মাহী কাঞ্চন সোফায় হেলান দিয়ে চোখ বন্ধ করে কিছুক্ষণ বসে রইল। মনে হলো মাথার মাঝে বয়স্ক এবং মোটা ছোটাচ্চুর চেহারাটা সরিয়ে তার নূতন চেহারাটা ঢোকানোর চেষ্টা করছে। ছোটাচ্চু কী করবে বুঝতে না পেরে পাশে চুপচাপ বসে রইল। ঠিক তখন বন্ধ করে রাখা দরজাটায় শব্দ হলো এবং মাহী কাঞ্চন চমকে উঠে চোখ খুলে বলল, “কে? কী? কী হয়েছে?”
ছোটাচ্চু বলল, “কিছু না। মনে হয় আমাদের জন্যে চা এনেছে।” তারপর উঠে দাঁড়িয়ে দরজা খুলে দিল, সত্যি সত্যি ঝুমু খালা একটা ট্রেতে চা এবং তার সাথে নানা রকম খাবার নিয়ে এসেছে। ঝুমু খালা ভেতরে ঢুকে টেবিলে চা-নাস্তা সাজিয়ে রাখে, মাহী কাঞ্চন কেমন যেন ভয় পাওয়া চোখে সেদিকে তাকিয়ে থাকে। বিড়বিড় করে বলে, “চা নাস্তা কেন? আমি চা-নাস্তা খাই না।”
ঝুমু খালা কোমরে শাড়ি পেঁচিয়ে বলল, “আপনি খান না বললেই হবে নাকি? আপনাকে খেতে হবে।”
