ছোটাচ্চু বলল, “কোনো সমস্যা নেই। আপনি কখন আমার বাসায় আসতে চান?” তার যে আসলে কোনো অফিস নেই, দেখা করতে হলে যে বাসাতেই দেখা করতে হবে সেই কথাটা আর বলল না।
মাহী কাঞ্চন বলল, “এখনই।”
ছোটাচ্চু অবাক হয়ে বলল, “এখনই?” সেটা শুনে সব বাচ্চার প্রায় হার্টফেল করার মতো অবস্থা হলো, তারা নিঃশব্দে দাপাদাপি করতে থাকে।
মাহী কাঞ্চন বলল, “হ্যাঁ, এখনই।”
“ঠিক আছে।”
“আমি একা আসব। কাউকে না জানিয়ে।”
“ঠিক আছে।”
“আমাকে সিকিউরিটি দেবার জন্যে লোকজন থাকে, খুব বিরক্ত করে। তাদেরকে না জানিয়ে গোপনে আসব।”
“ঠিক আছে।”
“আপনার বাসার ঠিকানাটা দেন।”
ছোটাচ্চু বাসার ঠিকানা দিয়ে টেলিফোনটা রাখার পর বাচ্চারা প্রথমবার তাদের বুকের ভিতর আটকে রাখা কথাগুলো গগনবিদারি চিৎকার হিসেবে বের করল। সেই ভয়াবহ চিৎকার শুনে তিনতলা থেকে বড় ভাই, দুইতলা থেকে দাদি এবং মেজ ভাবি, চারতলা থেকে ঝুমু খালা আর ছোট ভাবি ছুটতে ছুটতে চলে এলো। কোনো অঘটন ঘটেনি, মাহী কাঞ্চন ছোটাচ্চুর সাথে দেখা করতে এসেছে শোনার পর তারা শান্ত হলো, কিন্তু তারাও বাচ্চাদের থেকে কম অবাক হলো না।
ছোটাচ্চু তাড়াতাড়ি গিয়ে শেভ করল, একটা জিন্সের প্যান্ট আর টি-শার্ট পরল। বাচ্চারা তার ঘরটা পরিষ্কার করে দিল। মাহী কাঞ্চন কোথায় বসে ছোটাচ্চুর সাথে কথা বলবে কেউ জানে না, তাই তারা বাইরের ঘরটাও পরিষ্কার করে দিল। মেহমানকে কী খেতে দিবে সেটা ঝুমু খালা কয়েকবার জিজ্ঞেস করে জেনে নিল, তারপর ঝাঁটা নিয়ে বাইরে গিয়ে পুরো সিঁড়িটা ঝাড় দিয়ে দিল।
তারপর বাচ্চারা সবাই জানালায় মুখ লাগিয়ে বাইরে তাকিয়ে রইল। প্রত্যেকবার একটা গাড়ি রাস্তা দিয়ে আসে তারা তখন উত্তেজিত হয়ে ওঠে, গাড়িটা যখন বাসার সামনে না থেমে এগিয়ে যায় তখন সবাই একসাথে দীর্ঘশ্বাস ফেলে। ঘণ্টাখানেক পর বাচ্চারা যখন প্রায় হাল ছেড়ে দিচ্ছে তখন বাসার সামনে একটা স্কুটার এসে থামল। মাহী কাঞ্চনের মতো এত বড় একজন গায়ক তো আর স্কুটারে করে আসবে না তাই তারা স্কুটারটাকে কোনো গুরুত্ব দিল না, একটা গাড়ির জন্যে অপেক্ষা করতে থাকল। যদি গুরুত্ব দিত তাহলে দেখত স্কুটার থেকে মাহী কাঞ্চন নেমে এদিক-সেদিক তাকিয়ে তাদের বিল্ডিংয়ের ভেতর ঢুকে গেছে।
মাহী কাঞ্চন যখন সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠে আসছে তখন বাচ্চারা সবাই দেখল বড় একটা সাদা গাড়ি তাদের বাসার কাছাকাছি এসে থেমেছে। তারা মোটামুটি নিশ্চিত ছিল যে এটা নিশ্চয়ই মাহী কাঞ্চনের গাড়ি কিন্তু দেখল গাড়ি থেকে কেউ নামল না। দেখা যাচ্ছে গাড়ির ভেতরে কেউ বসে আছে কিন্তু কেউই সেখান থেকে নামছে না। বিষয়টা যথেষ্ট সন্দেহজনক কিন্তু ঠিক তখন তাদের কলিংবেল বেজে উঠল। বাচ্চারা সবাই একে অন্যের মুখের দিকে তাকাল, তারপর একজন আরেকজনকে ধাক্কা দিয়ে দরজার দিকে ছুটে যায়। সবাই মিলে একে অন্যকে ঠেলে দরজার ছিটকানি খুলে দিল। দেখল দরজার বাইরে মাহী কাঞ্চন দাঁড়িয়ে আছে।
বাচ্চারা ঠিক করে রেখেছিল তারা মাহী কাঞ্চনকে দেখে কোনো বাড়াবাড়ি করবে না, তাই কেউ বাড়াবাড়ি করল না, শুধু চোখ বড় বড় করে সবাই নিঃশব্দে মাহী কাঞ্চনের দিকে তাকিয়ে রইল, যেন তারা একটা জীন, পরী কিংবা ভূতের দিকে তাকিয়ে আছে। এভাবে কয়েক সেকেন্ড কেটে গেল কিন্তু শেষ পর্যন্ত প্রমি নিজেকে সামলাতে পারল না। সে হঠাৎ “ই-ই-ই-ই—” করে একটা চিৎকার করে উঠল এবং সেটা একটা চেইন রি-একশান শুরু করার মতো কাজ করল। তখন একসাথে সবাই “ই-ই-ই-ই-” করে চিৎকার করে ওঠে। সেই চিৎকার এত বিকট যে মনে হলো বাসার ছাদ ধসে পড়বে কিন্তু মাহী কাঞ্চন ঘাবড়ে গেল না, চোখ বড় বড় করে শান্ত মুখে তাদের দিকে তাকিয়ে রইল। তার মনে হয় আগেও অনেকবার এরকম অভিজ্ঞতা হয়েছে।
বাচ্চারা কতক্ষণ চিৎকার করত জানা নেই, ছোটাচ্চু তাদের ধমক দিয়ে থামানোর চেষ্টা করল, বলল, “এই তোরা থামবি? কী শুরু করেছিস পাগলের মতো।“ তারপর মাহী কাঞ্চনের দিকে তাকিয়ে বলল, “আসেন। আপনি ভিতরে আসেন।”
মাহী কাঞ্চন ভিতরে না ঢুকে ভুরু কুঁচকে ছোটাচ্চুর দিকে তাকিয়ে রইল, বলল, “আপনি ডিটেকটিভ?”
“জি।”
“আপনাকে দেখে মনে হয় ক্লাশ টেনে পড়েন।”
মাহী কাঞ্চনের কথা শুনে বাচ্চারা হি হি করে হেসে উঠল, ছোটাচ্চুর কান একটু লাল হয়ে উঠল, তারপরও মুখে জোর করে হাসি ফুটিয়ে বলল, “না আমি ক্লাশ টেনে পড়ি না। গত বছর মাস্টার্স পাস করেছি।”
মাহী কাঞ্চন বলল, “আমি ভেবেছিলাম প্রাইভেট ডিটেকটিভরা বুড়ো হয়। চোখে বাই ফোকাল চশমা পরে, চুরুট না হলে পাইপ খায়।”
শান্ত বলল, “ছোটাচ্চুর একটা জিরো পাওয়ারের চশমা আছে। যখন বয়স্ক দেখাতে চায় তখন সেটা চোখে দেয়।”
টুম্পা বলল, “একটা টাইও আছে। লাল রঙের।”
শান্ত বলল, “কিন্তু টাইয়ের নট বাঁধতে পারে না। তাই সেটা সব সময় নট বাঁধা থাকে। তাই না ছোটাচ্চু?”
ছোটাচ্চু দাঁত-মুখ খিঁচিয়ে বলল, “তোরা চুপ করবি?”
মাহী কাঞ্চন কিছুক্ষণ অবাক হয়ে বাচ্চাদের দিকে তাকিয়ে রইল, তারপর ছোটাচ্চুর দিকে তাকিয়ে বলল, “ছোটাচ্চু কে?”
ছোটাচ্চু একটু হাসার চেষ্টা করল, বলল, “আমি।”
“আপনার ছেলে-মেয়েরা আপনাকে বাবা না ডেকে ছোটাচ্চু ডাকে কেন?”
