করেছি। চব্বিশ ক্যারটের খাঁটি সোনা দিয়ে তৈরি দশ ভরি সোনার মেডেল।”
টুনি সিগারেটে একটা লম্বা টান দিয়ে বলল, “কখন দিবে শাপলা আপু?”
“এখনই দিব। সাথে নিয়ে এসেছি।যে ফাক্কু স্যারকে স্কুল থেকে বিদায় করতে পারে তাকে এর চাইতে বড় মেডেল দেওয়া দরকার।”
টুনি বলল, “দশ ভরি মেডেল, অনেক বড়। এর চাইতে বড় দরকার নেই শাপলা আপু।”
“ঠিক আছে।” বলে শাপলা তার পকেট থেকে চব্বিশ ক্যারটের দশ ভরি ওজনের সোনার মেডেলটা বের করে টুনির গলায় পরিয়ে দিল। টুনি মেডেলটা দেখে একেবারে হতবাক হয়ে গেল।
সিগারেটের মতো মেডেলটাও মিছিমিছি–তাতে কী আছে? আনন্দটা তো মিছিমিছি নয়। আনন্দটা একেবারে হান্ড্রেড পার্সেন্ট খাঁটি!
৫. ছোটাচ্চু সোফায় দুই পা তুলে
ছোটাচ্চু সোফায় দুই পা তুলে বসে একটা বই পড়ছে–কিংবা ঠিক করে বললে বলা উচিত একটা বই পড়ার চেষ্টা করছে। তার কাছাকাছি মেঝেতে বসে এই বাসার বাচ্চারা মিলে কিছু একটা খেলছে। খেলাটা লুডু হতে পারত কিন্তু লুডু খেলায় একজনের সাথে আরেকজনের হাতাহাতি হবার কথা না কিন্তু এখানে প্রচণ্ড হাতাহাতি হচ্ছে। মাঝে মাঝেই লুডুর বোর্ড কিংবা খুঁটি উড়ে যাচ্ছে কিন্তু সেজন্যে খেলার কোনো সমস্যা হচ্ছে বলে মনে হচ্ছে না। প্রত্যেকবার ছক্কা পড়ার পর সবাই মিলে যেভাবে চিষ্কার করছে সেটা শুনে মনে হতে পারে কেউ একজন ওয়ার্ল্ড কাপ খেলায় পেনাল্টি কিক করে গোল দিয়ে ফেলেছে।
ছোটাচ্চু বই পড়ায় খুব বেশিত্রগুতে পারছিল না, বাচ্চারা আবার একটা কান ফাটানো চিৎকার করার পর ছোটাচ্চু ধমক দিয়ে বলল, “তোরা কী শুরু করেছিস?
একজন বলল, “খেলছি ছোটাচ্চু।”
“এইটা খেলার নমুনা! এরকম ষাড়ের মতো চেঁচাচ্ছিস কেন?”
আরেকজন বলল, “ষাড় কখনো চেঁচায় না। ষাঁড় ডাকে।” তারপর ষাঁড় কেমন করে ডাকে সেটা দেখানোর চেষ্টা করল। সেটা শুনে সব বাচ্চারা হেসে গড়াগড়ি দিতে লাগল।
ঠিক তখন ছোটাছুর টেলিফোনটা বাজল, এই হট্টগোলে টেলিফোনে কথা বলা যাবে না জেনেও ছোটাচ্চু সেটা ধরল, “হ্যালো।”
“এটা কি ডিটেকটিভ অফিস?”
“জি এটা আলটিমেট ডিটেকটিভ এজেন্সির অফিস।” কথা ভালো করে শোনার জন্যে ছোটাচ্চু হাত দিয়ে সবাইকে থামানোর চেষ্টা করল, কোনো লাভ হলো না।
টেলিফোনের অন্য পাশ থেকে বলল, “আমি মাহী কাঞ্চন বলছি।”
ছোটাচ্চু বলল, “কী বললেন? মাহী কাঞ্চন?”
একমুহূর্তে বাচ্চাগুলো পুরোপুরি নিঃশব্দ হয়ে গেল। তাদের চোখ বড় হয়ে যায় এবং নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে যায়। ফিসফিস করে তারা উচ্চারণ করল, “মা—হী–কা—ঞ্চ–ন?” তারপর সবাই লাফ দিয়ে উঠে ছোটাচ্চুকে ঘিরে দাঁড়িয়ে গেল। ছোটাচ্চু এবং অন্য পাশ থেকে মাহী কাঞ্চন কী বলে শোনার জন্যে সবাই নিঃশ্বাস বন্ধ করে দাঁড়িয়ে রইল।
তাদেরকে দোষ দেওয়া যায় না। মাহী কাঞ্চন এই দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় গায়ক। তার গান শুনলে কম বয়সী মেয়েদের হৃৎস্পন্দন থেমে যায়। কয়েক মাস আগে তার একটা অটোগ্রাফের জন্যে ভক্তদের ভেতর এত মারামারি শুরু হয়ে গিয়েছিল যে পুলিশের লাঠিচার্জ করে থামাতে হয়েছিল। মাহী কাঞ্চনের কনসার্টের ঘোষণা হওয়ার দশ মিনিটের ভেতর সব টিকেট বিক্রি হয়ে যায়। জোছনা রাতে তার গান শুনে পুরোপুরি মাথা আউলে গিয়েছে এরকম অনেক মানুষ আছে। সেই মাহী কাঞ্চন নিজে ছোটাচ্চুকে ফোন করেছে। সেটা নিজের কানে শুনেও বাচ্চাদের বিশ্বাস হতে চায় না। মাহী কাঞ্চন ছোটাচ্চুকে কী বলছে সেটা শোনার জন্যে বাচ্চারা ছোটাচ্চুর কানের কাছে নিজেদের কান লাগানোর জন্যে নিঃশব্দে নিজেদের ভেতর ধাক্কাধাক্কি করতে লাগল।
টেলিফোনের অন্য পাশ থেকে মাহী কাঞ্চন বলল, “আমি গান গাই।”
ছোটাচ্চু বলল, “সেটা আপনাকে বলতে হবে না, আমরা সবাই জানি। মাহী কাঞ্চনকে দেশের সবাই চিনে।”
মাহী কাঞ্চন বলল, “আমি একটা বিশেষ দরকারে আপনাকে ফোন করেছি।”
“কী দরকার?”
“আপনার তো একটা ডিটেকটিভ এজেন্সি আছে, তাই না?”
“জি, আছে।”
“আপনার এজেন্সির সাথে আমার একটু কথা বলার দরকার।”
ছোটাচ্চুর চোখ বড় বড় হয়ে গেল, তার টেলিফোনের সাথে কান লাগিয়ে নিঃশ্বাস বন্ধ করে যারা মাহী কাঞ্চনের কথাগুলো শোনার চেষ্টা করছিল তাদের চোখও বড় বড় হয়ে গেল।
ছোটাচ্চু বলল, “আমার এজেন্সির সাথে দেখা করবেন?”
“হ্যাঁ। সত্যি কথা বলতে কী, আমি গোপনে দেখা করতে চাই।”
ছোটাচ্চু বলল, “সেটা নিয়ে আপনি চিন্তা করবেন না, আমরা সব রকম গোপনীয়তা বজায় রাখি। আমার ক্লায়েন্টদের কথা কেউ জানে না। পুরোপুরি গোপন।”
মাহী কাঞ্চন বলল, “আমার ব্যাপারটা একটু অন্য রকম। আমি ডিটেকটিভ এজেন্সির সাথে দেখা করেছি কথাটা জানাজানি হলে ফেসবুকে তুলকালাম হয়ে যাবে। সেখান থেকে পত্র-পত্রিকা, টিভি চ্যানেল সব জায়গায় হইচই শুরু হয়ে যাবে।”
ছোটাচ্চু বলল, “আমি জানি। আপনার মতো সেলিব্রেটিদের সবসময় খুব সাবধান থাকতে হয়।”
“মিডিয়া জান খেয়ে ফেলে। তাই খুব গোপনে আপনাদের সাথে কথা বলতে চাই।”
“ঠিক আছে। কীভাবে কথা বলতে চান?”
“টেলিফোনে বলা যাবে না। সামনাসামনি বলতে হবে। সবচেয়ে ভালো হয় আপনাদের অফিসে কথা না বলে গোপনে যদি আপনার বাসায় দেখা করতে পারি।”
মাহী কাঞ্চন বাসায় চলে আসতে চায় শুনে বাচ্চারা নিঃশব্দে আনন্দে চিৎকার করার ভঙ্গি করতে লাগল। এখনো তাদের বিশ্বাস হচ্ছে না মাহী কাঞ্চন নিজে ছোটাচ্চুর সাথে কথা বলছে!
