তার চিৎকার শেষ পর্যন্ত কাজে লাগল, ছাত্রছাত্রীরা একটু শান্ত হয়ে জিজ্ঞেস করল, “বারো নম্বর কী?”
“তোরা কি বারো নম্বর প্রশ্নটা দেখেছিস?”
ছাত্রছাত্রীরা প্রশ্নটা হাতে পেয়েই ক্ষেপে উঠেছিল, পুরোটা পড়ে দেখার সময় পায় নাই। এবারে তারা বারো নম্বর প্রশ্নটা দেখতে চেষ্টা করল, কিন্তু তাদের কারো হাতেই প্রশ্ন নেই, সবাই প্রশ্নটা গোল্লা বানিয়ে তারা ফাক্কু স্যারের দিকে ছুঁড়ে মারতে চেষ্টা করেছিল। শাপলা বলল, “আমার কাছে প্রশ্নটা আছে। তোদের পড়ে শোনাই?”
ছাত্রছাত্রীরা এবারে পুরোপুরি শান্ত হয়ে বারো নম্বর প্রশ্নটা শোনার জন্যে শাপলার দিকে তাকিয়ে থাকে। শাপলা তখন টুনির নিজের থেকে লেখা বারো নম্বর প্রশ্নটা পড়ে শোনাতে শুরু করে। সে বলল, “এই প্রশ্নটা সোজা, তোরা সবাই এর উত্তর দিতে পারবি। প্রশ্নটা হচ্ছে এরকম : জনৈক দুর্নীতিবাজ শিক্ষক তার কাছে প্রাইভেট না পড়লে ছাত্রছাত্রীদের পরীক্ষায় ফেল করিয়ে দেয়। ফাইনাল পরীক্ষার প্রশ্ন বলে দেয়ার জন্যে এই শিক্ষক প্রতি ছাত্রছাত্রীর কাছ থেকে এক হাজার করে টাকা নিয়েছে, ক্লাশে সর্বমোট একশ’ পঞ্চাশ জন ছাত্রছাত্রী থাকলে ফাইনাল পরীক্ষা উপলক্ষে এই দুর্নীতিবাজ শিক্ষকের কত টাকা উপার্জন হয়েছে?”
হলঘরের সব ছাত্রছাত্রী আবার একসাথে চিৎকার করে উঠল। শাপলা হাত তুলে তাদের থামানোর চেষ্টা করতে থাকে, এবারে ছাত্রছাত্রীরা বেশ সহজেই থেমে গেল। শাপলা বলল, “তোরা যদি সবাই মিলে চিৎকার করিস তাহলে কোনো লাভ হবে না। যদি স্যার ম্যাডামদের সাথে কথা বলতে চাস, একজন দাঁড়িয়ে কথা বল। একজন। সবাই না। শুধু একজন।”
মোটাসোটা একটা মেয়ে বলল, “তুই-ই বল আমাদের হয়ে।”
শাপলা বলল, “আমি অংক স্যারের কাছে প্রাইভেট পড়ি না, সেই জন্যে আমি কিছু জানি না। এই প্রশ্নটা তো আমার কাছে ভালোই লাগছে। বারো নম্বরটা তো মুখে মুখে করা যায়। দুর্নীতিবাজ শিক্ষকের এক লক্ষ পঞ্চাশ হাজার টাকা উপার্জন হয়েছে।”
হলঘরের সব ছেলে-মেয়ে একসাথে হেসে উঠল, ভয়ঙ্কর এক ধরনের হাসি, শুনলে আত্মশুকিয়ে যায়। শাপলা হাত তুলতেই আবার সবাই থেমে গেল। শাপলা বলল, “ভিতরের ব্যাপার আমি কিছু জানি না, জানলে আমি বলতাম। তোরা কেউ একজন বল।”
তখন চশমা পরা একটা ছেলে দাঁড়িয়ে বলল, “ঠিক আছে আমি বলব।”
শাপলা বলল, “ভেরি গুড।” তারপর টেবিল থেকে নিচে নেমে প্রিন্সিপ্যাল ম্যাডামকে বলল, “ম্যাডাম, আপনি এখন এদের মুখ থেকে শুনেন।”
সবাই শান্ত হয়েছে, হইচই, দাপাদাপি, চিৎকার-চেঁচামেচি থেমেছে, তাই প্রিন্সিপাল ম্যাডামের একটু সাহস ফিরে এলো। দুই পা এগিয়ে গিয়ে বলল, “বলো ছেলে কী বলবে।”
চশমা পরা ছেলেটা গলা পরিষ্কার করে বলল, “আমরা সবাই ঠিকভাবে লেখাপড়া করতে চাই। আমরা টাকা দিয়ে প্রশ্ন কিনে পরীক্ষা দিতে চাই না। প্রশ্ন মুখস্থ করে পরীক্ষায় ভালো নম্বর পেতে চাই না। কিন্তু আমাদের অংক স্যার আমাদের সেটা করতে বাধ্য করেছেন। ক্লাশের সবাইকে তার কাছে প্রাইভেট পড়তে হয়। যারা তার কাছে প্রাইভেট পড়ে না, স্যার তাদেরকে ফেল করিয়ে দেন। আমাদের ক্লাশে শুধু শাপলা অংক স্যারের কাছে প্রাইভেট পড়ে না–শুধু শাপলার সাহস আছে আমাদের নাই। আমাদের আব্দু-আম্মুরা ভয় পায়। প্রাইভেট পড়ে না বলে শাপলার কত যন্ত্রণা হয় আপনারা সেইটা জানেন না। ক্লাশে স্যার সব সময় শাপলাকে অপমান করেন, শাস্তি দেন। শাপলা আমাদের ক্লাশে সবচেয়ে ভালো গণিত জানে, গণিত অলিম্পিয়াডে মেডেল পায়–ক্লাশের পরীক্ষায় স্যার সব সময় তাকে গোল্লা দেন। শাপলা সেটা সহ্য করে। কাউকে কিছু বলে না।”
ছেলেটা একটু দম নিয়ে বলল, “প্রত্যেক পরীক্ষার আগে স্যারকে সাজেশনের জন্যে টাকা দিতে হয়। নামে সাজেশন, আসলে স্যার পুরো প্রশ্নটা বলে দেন। আমরা সেই প্রশ্ন মুখস্থ করে পরীক্ষা দেই। পরীক্ষায় সবাই এ প্লাস পাই। কেউ কোনো গণিত শিখি না।
“এইবারও ফাইনাল পরীক্ষার আগে স্যার সবার কাছে এক হাজার করে টাকা চেয়েছেন, আমরা টাকা দিয়েছি। যাদের টাকা-পয়সার টানাটানি তাদের আব্দু-আম্মু ধার-কর্জ করে টাকা দিয়েছে। সেই টাকা নিয়ে স্যার অংক পরীক্ষার সাজেশন দিয়েছেন। আমরা সবাই সেই সাজেশন মুখস্থ করে এসেছি। এসে দেখি অন্য প্রশ্ন! সেটা দেখে সবার মাথা গরম হয়ে গেছে।”
হলঘরের অন্যান্যরাও তখন একসাথে কথা বলতে শুরু করল, আগের মতো হইচই করে নয়, শান্তভাবে। প্রিন্সিপাল ম্যাডাম তখন হাত তুলে তাদের শান্ত করে একজন একজন করে সবার কথা শুনল। সবার বক্তব্য মোটামুটি একরকম। কথা বলতে বলতে কয়েকজনের গলা ভেঙে গেল। কয়েকজন হাউমাউ করে কাঁদতে লাগল।
প্রিন্সিপাল ম্যাডাম তাদের মাথায় হাত বুলিয়ে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করল, তারপর হলঘরের সামনে দাঁড়িয়ে বলল, “আমি দেখছি কী করা যায়। তোমরা আজকে বাসায় যাও। আজকের পরীক্ষাটা অন্য একদিন নেওয়া হবে।”
ছাত্রছাত্রীরা বের হবার সময় লক্ষ করল, টেলিভিশনের ক্যামেরা নিয়ে সাংবাদিকেরা চলে এসেছে। এত তাড়াতাড়ি তারা কেমন করে খবর পেল?
.
এক সপ্তাহ পর দেখা গেল স্কুলের কোনায় গাছের ছায়ায় ঢাকা সিঁড়িতে শাপলা আর টুনি বসে বসে সিগারেট খাচ্ছে। আজকাল টুনিও শাপলার মতো কায়দা করে সিগারেট খাওয়া শিখে গেছে। সিগারেট খেতে খেতে দুইজন হেসে কুটি কুটি হচ্ছে, শাপলা টুনির পিঠে থাবা দিয়ে বলল, বুঝলি টুনি, তোকে একটা গোল্ড মেডেল দিব ঠিক
