প্রিন্সিপাল আতঙ্কিত দৃষ্টিতে হলঘর বোঝাই চিৎকার করতে থাকা লাফাতে থাকা, জিনিসপত্র ছোঁড়াছুঁড়ি করতে থাকা, জানালার কাঁচ ভাঙতে থাকা ছেলে-মেয়ের দিকে তাকিয়ে থেকে ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করল, “কী হয়েছে? কী হয়েছে এখানে?”
একটু আগেই যে ছেলে-মেয়েরা শান্তশিষ্ট ছেলে-মেয়ে ছিল এখন তাদের ভিতর এড্রেনেলাইন হরমোন বের হতে শুরু করেছে, সবাই এখন ছোট ছোট একেকটি ইবলিশ। তারা প্রিন্সিপালের প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে চিৎকার করতে থাকল, চেঁচামেচি করতে থাকল, দাপাদাপি করতে থাকল।
প্রিন্সিপাল আর অন্যান্য স্যার দুই হাত তুলে সবাইকে থামানোর চেষ্টা করতে থাকল কিন্তু কোনো লাভ হলো না। ফাক্কু স্যার একটা প্রশ্ন হাতে নিয়ে সেটার উপর চোখ বুলিয়ে চমকে উঠল। ঠিক তখন পিছন থেকে একটা ছাত্র তার প্রশ্নটা পাকিয়ে গোল করে ফাক্কু স্যারের দিকে ছুঁড়ে দিল, সেটা পুরোপুরি লক্ষ্যভেদ করতে না পারলেও অন্যেরাও কিছুক্ষণের মাঝে তাদের প্রশ্ন গোল্লা পাকিয়ে ফাক্কু স্যারের দিকে ছুঁড়তে লাগল এবং কিছু কিছু একেবারে নিখুঁত লক্ষ্যভেদ করতে শুরু করল। বাড়াবাড়ি রকম রেগে যাওয়া একজন তার জ্যামিতি বাক্স ছুঁড়ে মারল, তখন অন্যেরাও উৎসাহ পেয়ে তাদের জ্যামিতি বাক্স ছুঁড়ে মারতে লাগল, তখন ঝনঝন শব্দে হলঘর কেঁপে উঠতে থাকে। ছেলে-মেয়েরা একটু পরেই তাদের বেঞ্চ থেকে উঠে দাঁড়িয়ে যায়, তারপর হলঘরের মাঝে ছোটাচ্চুটি করতে শুরু করে। স্যার-ম্যাডামেরা তখন ভয় পেয়ে এবারে ক্লাশ রুম থেকে বের হয়ে বাইরে গিয়ে দাঁড়াল। প্রিন্সিপাল ম্যাডাম ফ্যাকাসে মুখে জিজ্ঞেস করল, “কী হয়েছে? ব্যাপারটা কী? ছেলে-মেয়েগুলো এভাবে ক্ষেপে গেছে কেন?”
গার্ড দিতে আসা একজন স্যার বলল, “প্রশ্নটা পেয়েই ছেলে মেয়েগুলো ক্ষেপে গেল। বলতে লাগল এটা তাদের প্রশ্ন না। এটা ভুল প্রশ্ন।”
“অন্য সাবজেক্টের প্রশ্ন?”
“না না, এটা গণিতেরই প্রশ্ন।“
“অন্য ক্লাশের প্রশ্ন?”
“না। তাদের ক্লাশেরই প্রশ্ন।”
“তাহলে তারা বুঝল কেমন করে এটা ভুল প্রশ্ন?”
“সেইটাই তো বুঝতে পারছি না।”
কাছেই ফাক্কু স্যার একটা প্রশ্ন হাতে দাঁড়িয়ে ছিল, তার চোখ-মুখ ফ্যাকাসে। প্রশ্নটা হাতে নিয়ে একটু পর পর সেঁক গিলছে, প্রিন্সিপাল তার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, “আপনি এদের অংক টিচার না?”
ফাক্কু স্যার দুর্বলভাবে মাথা নাড়ল। প্রিন্সিপাল ম্যাডাম জিজ্ঞেস করল, “আপনি প্রশ্ন করেছেন না?”
“হ্যাঁ।”
“তাহলে সমস্যাটা কী?”
“এইটা আসলে আমার প্রশ্ন না।”
“আপনার প্রশ্ন না?”
“না।”
“তাহলে কার প্রশ্ন?”
“সেইটাই তো বুঝতে পারছি না।”
“কেমন করে হলো?”
“যাদেরকে প্রশ্ন ছাপাতে দিয়েছি তারা ভুল করে অন্য স্কুলের প্রশ্ন দিয়ে দিয়েছে।”
পাশে দাঁড়ানো একজন স্যার বলল, “প্রশ্নের উপর আমাদের স্কুলের নাম, ক্লাশ, পরীক্ষার তারিখ সব ঠিক আছে।”
প্রিন্সিপাল ম্যাডাম ভুরু কুঁচকে ফাক্কু স্যারের দিকে তাকিয়ে বলল, “কিন্তু আমার সমস্যা অন্য জায়গায়। ছাত্রছাত্রীরা কেমন করে জানল এটা ভুল প্রশ্ন! এটা অন্য প্রশ্ন?”
ফাক্কু স্যার তার মাথা চুলকাতে থাকে, কোনো উত্তর দেয় না। প্রিন্সিপাল ম্যাডাম সরু চোখে ফাক্কু স্যারের দিকে তাকিয়ে থেকে বলল, “ছেলে-মেয়েরা যদি বলত প্রশ্ন কঠিন হয়েছে, বুঝতে পারছে না তাহলে একটা কথা ছিল কিন্তু তা তো বলছে না ছেলে-মেয়েরা বলছে ভুল প্রশ্ন! তার মানে একটা শুদ্ধ প্রশ্ন আছে সেই শুদ্ধ প্রশ্নটার কথা তারা কেমন করে জানল?”
ফাক্কু স্যার ডাঙায় ভোলা মাছের মতো খাবি খেতে লাগল। এবারেও কোনো উত্তর দিল না।
হলঘরের ভেতর তখন তুলকালাম কাণ্ড ঘটছে এবং বাইরে থেকে ভয়ঙ্কর ভয়ঙ্কর শব্দ শোনা যেতে লাগল। কম বয়সী একজন শিক্ষক বলল, “মনে হয় পুলিশ ডাকতে হবে।”
আরেকজন বলল, “পুলিশে হবে না। মিলিটারি ডাকতে হবে।”
প্রিন্সিপাল ম্যাডাম বলল, “এটা চলতে দেওয়া যাবে না। এদের থামাতে হবে।”
কমবয়সী শিক্ষক বলল, “কেমন করে থামাব? উঁচু ক্লাশের ছেলে মেয়ে, বড় হয়ে গেছে। এরা এখন রীতিমতো মব। মব খুব ভয়ঙ্কর।”
প্রিন্সিপাল ম্যাডাম বলল, “জানি। কিন্তু এভাবে তো উচ্ছল হতে দেওয়া যাবে না। ভিতরে ঢুকতে হবে। আসেন সবাই আমার সাথে।”
সবাই তখন আবার হলঘরে গিয়ে ঢুকল এবং তাদের দেখে ছেলে মেয়েরা আরো উজ্জ্বল হয়ে উঠল। তাদের চিৎকার-হইচই এবারে আরো ভয়ঙ্কর হয়ে উঠল। প্রিন্সিপাল ম্যাডাম খামোখাই তাদের শান্ত করার চেষ্টা করতে লাগল, কোনো লাভ হলো না।
পুরো হলঘরে শুধুমাত্র শাপলা তার সিটে চুপচাপ বসে ছিল। শুধু যে বসে ছিল তা না, এই ভয়ঙ্কর হইচই-চেঁচামেচি-গোলমালের মাঝে একটা প্রশ্নের উত্তর পর্যন্ত লিখে ফেলেছে। এইবারে সে খাতা বন্ধ করে তার সিট থেকে উঠে হলঘরের প্রিন্সিপালের কাছে এসে দাঁড়াল, বলল, “ম্যাডাম আমি একটু চেষ্টা করে দেখব এদের শান্ত করা যায় কি না?”
“তুমি? পারবে?”
“চেষ্টা করে দেখি?”
“ঠিক আছে দেখো।”
শাপলা তখন লাফ দিয়ে হলঘরের সামনে রাখা টেবিলের উপর উঠে গেল, তারপর দুই হাত উপরে তুলে নাড়াতে শুরু করে।
ছেলে-মেয়েদের শান্ত হওয়ার কোনো লক্ষণ দেখা গেল না। এবারে তারা শাপলার দিকে হাতের কাছে যা পাওয়া গেল সেটা ছুঁড়তে শুরু করল। শাপলা সাবধানে নিজেকে রক্ষা করতে করতে চেঁচাতে লাগল, “বারো নম্বর, বারো নম্বর, বারো নম্বর!”
