টুনি কাগজে নামগুলো লিখে নিল।
.
সেই রাতেই টুনি ছোটাচ্চুর ল্যাপটপ নিয়ে বসে গেল। ই-মেইল এড্রেসটা টাইপ করে সে পাসওয়ার্ডের জায়গাটার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে সেখানে ফাক্কু স্যারের ছেলে ফয়সলের নাম লিখে সেটাকে আট অক্ষর বানানোর জন্যে শেষে ওয়ান আর টু লিখে প্রথমবার চেষ্টা করে। টুনি ধরেই নিয়েছিল এখন লেখা হবে ভুল পাসওয়ার্ড, তখন সে আরেকটা কিছু লিখবে, তারপর আরেকটা, তারপর আরেকটা। শেষ পর্যন্ত কিছুই হবে না-কিন্তু সে নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারল না, যখন দেখল পাসওয়ার্ড সঠিক আর সে ফাকু স্যারের ই-মেইলের ভেতর ঢুকে গেছে। কী আশ্চর্য! কী আশ্চর্য!! তার মানে শান্ত ভাইয়া ঠিকই বলেছে। গাধা টাইপের মানুষেরা নিজের ছেলে-মেয়েদের নাম দিয়ে পাসওয়ার্ড তৈরি করে। টুনি দেখল তার সামনে ফাক্কু স্যারের কাছে পাঠানো সবগুলো ই-মেইল। কিছু কিছু ফাক্কু স্যার খুলে দেখেছে কিছু খুলে দেখেনি। অবিশ্বাস্য ব্যাপার! সে একবারে পাসওয়ার্ডটা আন্দাজ করে ফেলতে পারবে স্বপ্নেও ভাবেনি। উত্তেজনায় তার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে যাবার অবস্থা হলো। কিছুক্ষণ নিঃশব্দে সে ল্যাপটপের মনিটরের দিকে তাকিয়ে থাকে। নানান জায়গা থেকে নানা ধরনের ই-মেইল এসেছে, তার মাঝে হঠাৎ করে একটা ই-মেইলে তার দৃষ্টি আটকে গেল। ই মেইলের টাইটেল, ছাপানোর জন্যে গণিতের প্রশ্ন।
যার অর্থ স্কুল যাদের কাছ থেকে প্রশ্ন ছাপিয়ে আনে তাদের কেউ একজন ফাক্কু স্যারের কাছে কোনো কারণে একটা ই-মেইল পাঠিয়েছে। ফাক্কু স্যার প্রশ্নটা খুলে দেখেছে, কাজেই আরো একবার খুলে দেখলে কোনো ক্ষতি নেই। টুনি ই-মেইলটা খুলে পড়ল, প্রশ্ন টাইপ করতে গিয়ে কোনো একটা শব্দ পড়তে পারছে না, সেটা জিজ্ঞেস করে একটা ই-মেইল পাঠিয়েছে এবং সেটার দিকে তাকিয়ে থেকে হঠাৎ করে টুনির মাধাঁয় ফাক্কু স্যারকে সঠিক শাস্তি দেওয়ার জন্যে চমৎকার একটা আইডিয়া হাজির হলো। আইডিয়াটা কাজ করতেও পারে আবার শেষ মুহূর্তে কচলেও যেতে পারে, কিন্তু পদ্ধতিটা খুবই নিরাপদ। যদি এবারে কাজ না করে ভবিষ্যতে আরো একবার অন্যভাবে চেষ্টা করতে পারবে, একজন মানুষের ই-মেইলের পাসওয়ার্ড জানা থাকলে অনেক কিছু করা যেতে পারে!
পরের কয়েক দিনে টুনি অনেক কষ্ট করে শান্তর স্কুলের অংক ম্যাডামের প্রশ্নটি টাইপ করে ফেলল। শান্ত আর শাপলা একই ক্লাশে পড়ে, কাজেই এই প্রশ্নটি শান্তর ক্লাশের উপযোগী হলে নিশ্চয়ই শাপলাদের ক্লাশেরও উপযোগী হবে। প্রশ্নটির শেষে সে অবশ্য একটি বাড়তি প্রশ্ন জুড়ে দিল, সব মিলিয়ে এগারোটি প্রশ্ন ছিল, তারটি হলো বারো নম্বর প্রশ্ন। তারপর টাইপ করা এই প্রশ্নটা সে যারা স্কুলের জন্যে প্রশ্ন ছাপায় তাদের কাছে পাঠিয়ে দিল। সাথে লিখে দিল–
আপনাদের যেহেতু হাতে লেখা প্রশ্ন টাইপ করতে সমস্যা হচ্ছে কাজেই আমি পুরোটা নিজেই টাইপ করে পাঠিয়ে দিচ্ছি। আপনারা যদি এর মাঝে কোনো কিছু টাইপ করে ফেলে থাকেন তাহলে সেটা ব্যবহার না করে আমার টাইপ করা প্রশ্নটি ব্যবহার করুন। এখানে কোনো ভুল থাকবে না।
সহযোগিতার জন্যে
ধন্যবাদ
টুনি নিচে ফাক্কু স্যারের আসল নাম লিখে দিল।
যদি আসল ব্যাপারটা কেউ ধরতে না পারে তাহলে শাপলাদের অংক পরীক্ষার সময় ব্যাপারটা প্রথম ধরা পড়বে। তাদের ক্লাশের ছেলে-মেয়েরা সবাই অংক প্রশ্নের জন্যে এক হাজার করে টাকা দিয়ে রেখেছে, সে জন্যে তারা সাজেশন হিসেবে আসল প্রশ্নটা পেয়েও গেছে। সবাই সেগুলো মুখস্থ করে এসে পরীক্ষার হলে আবিষ্কার করবে সম্পূর্ণ নতুন প্রশ্ন। তখন ফাটাফাটি একটা মজা হলেও হতে পারে।
আর যদি আসল ব্যাপারটা ধরা পড়ে যায় তাহলে কিছু করার নেই, তখন নতুন করে একেবারে গোড়া থেকে আরেকবার শুরু করতে হবে। টুনির সময়ের অভাব নেই,মাথাতে বুদ্ধিরও অভাব নেই। আগে হোক পরে হোক ফাক্কু স্যারকে সে একদিন ধরবে। ধরবেই ধরবে।
দুই সপ্তাহ পর শাপলাদের ক্লাশে অংক পরীক্ষার দিন যা একটা ঘটনা ঘটল সেটা বলার মতো না। ছাত্রছাত্রীরা সবাই একধরনের ফুরফুরে মেজাজে পরীক্ষা দিতে বসেছে, অন্যান্য পরীক্ষায় পড়াশোনা করতে হয়–এই পরীক্ষায় কী আসবে সবাই জানে তাই বেশি লেখাপড়া করতে হয় না। ফাক্কু স্যারের বাসায় সবাই পরীক্ষার প্রশ্ন কয়েকবার প্র্যাকটিসও করে এসেছে।
প্রশ্নটা হাতে পাওয়ার পর সারা ক্লাশে প্রথমে একটা গুঞ্জন শুরু হলো তারপর দেখতে দেখতে হট্টগোল শুরু হলো। যেসব স্যার আর ম্যাডাম পরীক্ষায় গার্ড দিতে এসেছে তারা অবাক হয়ে গেল। জিজ্ঞেস করল, “কী হয়েছে?”
চুলে জেল দেয় এরকম গাট্টাগোট্টা একটা ছেলে–যে এর মাঝে শেভ করা শুরু করেছে–দাঁড়িয়ে বলল, “ভুল প্রশ্ন দিয়েছে। এই প্রশ্ন দেওয়ার কথা না!”
“ভুল প্রশ্ন? অন্য সাবজেক্টের?”
“না।”
“তাহলে অন্য ক্লাশের?”
“না।”
“তাহলে তোমরা কীভাবে জানো এটা ভুল প্রশ্ন?”
“আমরা জানি। এইটা ভুল প্রশ্ন।”
অন্য অনেকে তখন হইচই শুরু করল, টেবিলে থাবা দিতে লাগল, চিৎকার করতে লাগল। একজন মানুষ একা কখনো যে কাজটা করতে সাহস পায় না একসাথে অনেকে মিলে সেটা খুব সহজেই করে ফেলে। কাজেই সেকশানের প্রায় শ’ দেড়েক ছেলেমেয়ে হঠাৎ করে একসাথে চেঁচামেচি শুরু করল। তারা টেবিলে থাবা দিয়ে লাফাতে শুরু করল, কাগজপত্র ছুঁড়ে মারতে লাগল, একজন জানালার একটা কাঁচ ভেঙে ফেলার পর আরো অনেকে জানালার কাঁচ ভাঙতে শুরু করল। স্কুলের অন্য স্যার-ম্যাডামেরা ছুটে এলো এবং তাদের সাথে ফাক্কু স্যারও হাজির হয়ে গেল।
