সন্ধ্যেবেলা টুনি শান্তকে জিজ্ঞেস করল, “আচ্ছা শান্ত ভাইয়া, তুমি যদি একজন মানুষের ই-মেইল এড্রেস জানো তাহলে কি তার ই মেইলগুলো দেখতে পারবে?”
“অবশ্যই পারব। না পারার কী আছে!”
“কীভাবে?”
“দশ টাকা।”
অন্য যেকোনো মানুষ হলে শান্তর কথা শুনে থতমত খেয়ে যেত কিন্তু টুনি যেহেতু শান্তকে চিনে তাই সে থতমত খেলো না, বুঝতে পারল এই প্রশ্নের উত্তর শুনতে হলে দশ টাকা দিতে হবে। টুনি বলল, “দুই টাকা।”
“পাঁচ টাকার এক পয়সা কম না।”
টুনি তার ব্যাগ থেকে একটা পাঁচ টাকার নোট বের করে শান্তকে দিয়ে বলল, “নাও।”
শান্ত পাঁচ টাকার নোটটা ভালো করে দেখে পকেটে ঢুকিয়ে বলল, “কাজটা খুবই সোজা। প্রথমে মেইল আইডি লিখবি তারপর পাসওয়ার্ড লিখবি। তখন সব ই-মেইল দেখতে পাবি।”
টুনি চোখ বড় বড় করে বলল, “এইটা তো সবাই জানে। আমি কি এইটা জানতে চেয়েছি নাকি? আমি জানতে চাচ্ছি পাসওয়ার্ড না জানলে অন্যের ই-মেইলে ঢোকা যায় নাকি।”
“সেটা তুই আগে বলিসনি।”
টুনি বলল, “আমার টাকা ফেরত দাও।”
শান্ত দাঁত বের করে হেসে বলল, “টাকা হচ্ছে যৌবনের মতন, একবার বের হয়ে গেলে আর ফিরে আসে না।”
“এটা চোট্টামি।”
“আর তুই যেটা জিজ্ঞেস করেছিস সেটা হচ্ছে সাইবার ক্রাইম। আমি চোর হলে তুই ডাকাত।”
“টাকা ফেরত দাও শান্ত ভাইয়া।”
“টাকা ফেরত পাবি না কিন্তু তোর প্রশ্নের উত্তর দিতে পারি।”
শান্ত এখন কোন ধরনের চোট্টামি করবে জানা নেই, টুনি তাই কোনো কথা না বলে শান্তর দিকে তাকিয়ে রইল। শান্ত বলল, “অন্যের ই-মেইলে ঢোকা হচ্ছে হ্যাঁকিং। যারা ভালো হ্যাঁকার তারা করতে পারে। আমার পরিচিত একজন সুপারডুপার হ্যাঁকার আছে। আদনান ভাই, কলেজে পড়ে। ফার্স্ট ইয়ার। আদনান ভাই হ্যাঁক করে গভমেন্টের ওয়েবসাইটে স্টুকে মন্ত্রীদের নাম উল্টাপাল্টা করে দিয়েছিল।”
“সত্যি?”
“হ্যাঁ। সেইটা করে খুব বিপদে পড়েছে।”
“কী বিপদ?”
“পুলিশ আর র্যাব ধরে নিয়ে গেছে। জামিনে ছাড়া পেলে তোর কথা বলতে পারি। আগে থেকে বলে রাখছি, আদনান ভাইয়ের রেট কিন্তু খুব হাই।”
টুনি বলল, “থাক দরকার নাই।”
টুনি যখন চলে যাচ্ছিল তখন শান্ত বলল, “যে মানুষের ই-মেইল হ্যাঁক করবি সেই মানুষটা যদি গাধা টাইপের হয় তাহলে তুই নিজেও হ্যাঁক করার চেষ্টা করতে পারিস।”
“আমি নিজে?”
“হ্যাঁ। গাধা টাইপের মানুষদের পাসওয়ার্ড খুব সোজা হয়। বেশিরভাগ সময় নিজের বাচ্চার নাম দিয়ে পাসওয়ার্ড তৈরি করে। বাচ্চার নাম যদি ছোট হয় নামের শেষে ওয়ান টু থ্রি লিখে লম্বা করে। আট অক্ষরের পাসওয়ার্ড বানায়।
শান্ত ঠাট্টা করছে নাকি সত্যি বলছে টুনি বুঝতে পারল না। যদি সত্যি বলে থাকে তাহলে এইটুকু তথ্যের জন্যে পাঁচ টাকা খরচ করা যায়। কাজেই সে আর পাঁচ টাকা ফেরত দেওয়ার জন্যে চাপাচাপি করল না। করেও কোনো লাভ হতো না, শান্ত ঠিকই বলেছে, টাকা হচ্ছে যৌবনের মতো–একবার বের হয়ে গেলে আর ফিরে আসে না, বিশেষ করে সেটা যদি শান্তর কাছে যায়।
পরদিন স্কুলে গিয়ে টুনি শাপলাকে খুঁজে বের করল। শাপলাকে খুঁজে পাওয়া খুব কঠিন না, টিফিন ছুটিতে যেখানে সবচেয়ে বেশি হইচই হয় সেখানেই শাপলা থাকে। আজকে শাপলাকে পাওয়া গেল ক্লাশ সিক্সের ছেলে-মেয়েদের মাঝে, ক্রিকেট খেলা নিয়ে সেখানে প্রায় খুনোখুনি হয়ে যাচ্ছিল, শাপলা সেটা কোনোমতে সামলে নিয়েছে। আবার যখন খেলা শুরু হলো তখন টুনি শাপলার কাছে গিয়ে বলল, “শাপলা আপু।”
“কী হলো?”
“তুমি কি আমাকে একটা জিনিস বলতে পারবে? জিনিসটা সিক্রেট।”
“উহ। আমি কাকে বিয়ে করব আর কাকে মার্ডার করব সেই সিক্রেট জিনিসগুলো তোকে বলতে পারব না।”
টুনি হেসে ফেলল, বলল, “না। আমি এই দুইটা সিক্রেট জিনিস জানতে চাচ্ছি না।”
“তাহলে বল।”
টুনি ফিসফিস করে বলল, “ফাক্কু স্যারের বউ আর ছেলে-মেয়ের নামগুলো আমাকে বলতে পারবে?”
শাপলা অবাক হয়ে বলল, “কী করবি?”
“আমার একটা খুবই সিক্রেট প্রজেক্ট আছে, সেটার জন্যে দরকার।”
শাপলা মুখ সুচালো করে বলল, “আমার জানা নাই। কিন্তু আমাদের ক্লাশের সব ছেলে-মেয়ে এই স্যারের কাছে প্রাইভেট পড়ে, তারা প্রত্যেক দিন স্যারের বাসায় যায়। তারা নিশ্চয়ই জানে। শুনেছি বউটা ভালো। ছেলে-মেয়েগুলো ছোট ছোট কিন্তু দুইটাই পাজি। মেয়েটা মিচকি শয়তান আর ছেলেটা খুবই দুষ্ট। ফাক্কু স্যার ছেলেটাকে লাই দিয়ে দিয়ে মিনি সন্ত্রাসী বানিয়ে ফেলেছে।”
টুনি বলল, “আমার শুধু নামগুলো দরকার।”
“ভালো নাম, না ডাকনাম?”
“ডাকনাম বেশি দরকার।”
“ঠিক আছে, এখনই তোকে বলছি।”
টুনি ব্যস্ত হয়ে বলল, “তোমায় এখনই বলতে হবে না। এক-দুই দিন পরে হলেও হবে!”
শাপলা বলল, “আমি কোনো কাজ ফেলে রাখি না। ঝটপট করে ফেলি।”
কাজেই পাঁচ মিনিটের মাঝে শাপলা ফাক্কু স্যারের বউ-বাচ্চার নাম নিয়ে এলো। বউয়ের নাম নীলুফার, ফাক্কু স্যার শর্টকাট করে ডাকে নীলু। মেয়েটার নাম ফারজানা, ফাক্কু স্যার আদর করে ডাকে ফারু আর যখন রেগে যায় তখন ডাকে ফারজাইন্যা! ছেলেটা ছোট, নাম ফয়সল, ফাক্কু স্যার আদর করে ডাকে ফপু। শাপলার ক্লাশের যে ছেলে-মেয়েরা ফয়সলের যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ, তারা তাকে ডাকে ফয়জন–পয়জনের কাছাকাছি শোনায় সেই জন্যে।
