প্রমি আপু কিছুক্ষণ টুনির দিকে তাকিয়ে থাকল, তারপর বলল, “কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন, ‘অন্যায় যে করে আর অন্যায় যে সহে তব ঘৃণা যেন তারে তৃণ সম দহে।’ তার অর্থ কী? তার অর্থ তুই যদি অন্যায়ের বিরুদ্ধে কাজ না করিস তোকে সবাই ঘৃণা করবে। কাজেই তোকে কিছু একটা করতেই হবে। কবিগুরু পরিষ্কার করে বলেন নাই তুই সে জন্যে আরেকটা অন্যায় করতে পারবি কি না–”
টুনি বলল, “আমি ঠিক কবিগুরুর মতামত জানতে চাচ্ছিলাম না, তোমার মতামত জানতে চাচ্ছিলাম।”
প্রমি মুখ শক্ত করে বলল, “আমার মতামত জানতে হলে তোকে সুনির্দিষ্টভাবে পুরো বিষয়টা বলতে হবে। প্রথম অন্যায়টা কী সেটা বলতে হবে। মানুষটা কে বলতে হবে, তাকে কী ধরনের শাস্তি দেওয়া হবে সেটা জানতে হবে, সেই শাস্তি দেওয়ার জন্যে কী অন্যায় করা হবে সেটাও জানতে হবে।”
টুনির পক্ষে এত কিছু বলা সম্ভব না, তাই প্রমির মতামত জানা হলো না। শান্তকে এই প্রশ্ন করে খুব একটা লাভ হবে না জেনেও টুনি একটু চেষ্টা করল, শান্ত পুরো প্রশ্নটা না শুনেই বলল, “পিটিয়ে তক্তা করে দে।” টুনি যখন টুম্পাকে এই প্রশ্নটা করল তখন টুম্পা তাকে পাল্টা প্রশ্ন করল, “তুমি কি রবিন হুডের কথা বলছ?” টুনি রবিন হুডের কথা জিজ্ঞেস করছিল না কিন্তু বুঝতে পারল টুম্পা ঠিকই বলছে, রবিন হুড ছিল ডাকাত কিন্তু কেউ তাকে খারাপ বলে না, কারণ সে অত্যাচারী বড়লোক থেকে টাকা ডাকাতি করে গরিবদের দিত! গল্পে সবই সম্ভব।
টুনি কারো কাছ থেকে পরিষ্কার উত্তর পাচ্ছিল না, শেষ পর্যন্ত পরিষ্কার করে উত্তর দিল ঝুমু খালা, রান্নাঘরে পরাটা ভাজতে ভাজতে বলল, “ধরা না পড়লে ঠিক আছে।”
কাজেই টুনি সিদ্ধান্ত নিল ফাক্কু স্যারকে একটু সাইজ করার চেষ্টা করবে। কাজটা শেষ পর্যন্ত করতে পারবে কি না জানে না, কিন্তু তাতে সমস্যা নেই, সে যে এটা করার চেষ্টা করছে সেটাও কেউ জানে না। ধরা পড়ার কোনো প্রশ্নই নাই।
পরদিন স্কুলে গিয়ে সে স্কুলের অফিসে হাজির হলো। তাদের স্কুলের অফিসে যে কয়েকজন কাজ করে তার একজন হচ্ছে রওশন খালা, মাঝবয়সী হাসি-খুশি মহিলা। টুনিকে দেখে রওশন খালা কাগজপত্র থেকে চোখ তুলে তাকলি। টুনি বলল, “আপনি কি খুব ব্যস্ত?”
রওশন খালা বলল, “আমি সব সময়েই খুব ব্যস্ত–তাতে সমস্যা নাই। কী বলবে বলো।”
“এই স্কুলে কি এডভান্স ছুটি নেওয়া যায়?”
রওশান খালা অবাক হয়ে বলল, “এডভান্স ছুটি? সেটা আবার কী?”
“আমরা যদি স্কুলে না আসি তাহলে আব্দু-আম্মুর চিঠি আনতে হয়। আগেই চিঠিটা এনে পরে স্কুলে না আসলে কি হবে?”
“স্কুলে আসতে চাও না কেন?”
“না–মানে–আল্লু সবাইকে নিয়ে বেড়াতে যেতে চায়।” কথাটা সত্যি নয় কিন্তু তথ্য বের করার জন্যে এরকম প্রশ্ন করা মনে হয় ঠিকই আছে।
রওশন খালা মুখটা গম্ভীর করে বলল, “পড়াশোনার ক্ষতি করে বেড়ানো ঠিক না। যখন ছুটি হয় তখন যাও।”
টুনি বলল, “আমিও তো তাই বলি। আব্ব বুঝতে চায় না।”
রওশন খালা মুখটা আরো গম্ভীর করে বলল, “না না, এটা না বুঝলে হবে না। এটা বুঝতে হবে। পড়ালেখা খুব গুরুত্বপূর্ণ…” এরপর রওশন খালা লেখাপড়ার গুরুত্বের ওপর উপদেশ দিতে শুরু করল। টুনিও গম্ভীর মুখে উপদেশটা শুনতে থাকে, মাঝে মাঝে মাথা নাড়ে। একজন বড় মানুষকে খুশি করার এইটা হচ্ছে সবচেয়ে সোজা উপায়, তাকে উপদেশ দেওয়ার একটা সুযোগ করে দেয়া। একজন বড় মানুষ ছোট একজন ছেলে-মেয়েকে যত বেশি উপদেশ দিতে পারবে সে তার উপর তত খুশি হয়ে উঠবে। কাজেই উপদেশ দেয়া শেষ করে রওশন খালা টুনির উপর খুব খুশি হয়ে উঠল।
টুনি উপদেশগুলো শুনে চলে যেতে যেতে থেমে গিয়ে বলল, “এখন আপনাদের অনেক বেশি পরিশ্রম তাই না রওশন খালা?”
রওশন খালা হেসে বলল, “আমাদের সব সময় পরিশ্রম।”
“কিন্তু এখন তো ফাইনাল পরীক্ষা আসছে, তাই অনেক বেশি পরিশ্রম। এতগুলো ক্লাশের এতগুলো প্রশ্ন ছাপাতে হবে।”
রওশন খালা মাথা নাড়ল, বলল, “না। প্রশ্ন আমাদের ছাপাতে হয় না। ওগুলো টিচারেরা ছাপেন। এগুলো স্কুলেও ছাপায় না, বাইরে থেকে ছাপিয়ে নেয়!”
টুনি ব্যাপারটা শুনে খুব খুশি হলো। ভান করে বলল, “যাক বাবা! আপনাদের এই ঝামেলা করতে হয় না!” কিন্তু এখন জানা দরকার কোথা থেকে প্রশ্নগুলো ছাপানো হয়। সরাসরি কিছুতেই সেটা জিজ্ঞেস করা যাবে না, তাই সে আজকের মতো এখানেই শেষ করে দিল।
পরের দিন টুনি আবার রওশন খালার কাছে হাজির হলো, বলল, “রওশন খালা, আপনাকে আমি প্রত্যেক দিন ডিস্টার্ব করছি, আপনি আমার উপরে রাগ হচ্ছেন না তো?”
রওশন খালা হেসে বলল, “না রাগ হচ্ছি না। বলো কী বলবে?”
“আমাদের ক্লাশ টিচার হচ্ছেন ফৌজিয়া ম্যাডাম। ফৌজিয়া ম্যাডাম খুবই সুইট।”
“হ্যাঁ, খুবই সুইট। খুবই এনার্জেটিক।”
“আমরা ম্যাডামের বার্থডেতে তাকে একটা সারপ্রাইজ দিতে চাই। সব ছেলে-মেয়ে সাইন করে একটা কার্ড বানিয়ে তার ই-মেইলে পাঠিয়ে দেব। ঠিক রাত বারোটা এক মিনিটে।”
“খুবই ভালো আইডিয়া।”
“ম্যাডামের ই-মেইলটা জানি না, আপনি কি দিতে পারবেন একটু কষ্ট করে? ম্যাডামকে জিজ্ঞেস করলে ম্যাডাম বুঝতে পারবে।”
রওশন খালা বলল, “অবশ্যই দিতে পারব।” তারপর উঠে কোথা থেকে একটা ফাইল এনে সেটা খুলে একটা লিস্ট বের করল। সেখানে স্কুলের সব টিচারদের ই-মেইল এড্রেস লেখা। রওশন খালা যখন ফৌজিয়া ম্যাডামের ই-মেইল এড্রেসটা একটা ছোট কাগজে লিখে দিচ্ছে তখন টুনি তার ঘাড়ের উপর দিয়ে উঁকি দিয়ে ফাকু স্যারের ই-মেইল এড্রেসটা দেখে নিল। তারা আসলেই ফৌজিয়া ম্যাডামের কাছে একটা বার্থডে কার্ড পাঠাবে কিন্তু এই মুহূর্তে তার ফাক্কু স্যারের ই-মেইল এড্রেসটা দরকার। কেন দরকার সে এখনো জানে না, কিন্তু দরকার।
