সে কীভাবে এই সার্টিফিকেট পেয়েছে সেটা মোটামুটিভাবে সবাই এত দিনে জেনে গেছে, তাই কেউই বেশি অবাক হলো না। একজন সন্দেহপ্রবণ বাচ্চা জিজ্ঞেস করল কিন্তু তোমার তো এস.এস.সি. না হয় এইচ.এস.সি. সার্টিফিকেট নাই।”
“পি-এইচডি, সার্টিফিকেট থাকলে আর কিছু লাগে না। পি-এইচডি, হচ্ছে সব লেখাপড়ার বাবা।”
লেখাপড়া নিয়ে শান্তর কথাবার্তা নিয়ে কেউ কোনো প্রশ্ন করল না, শুধু টুনি জিজ্ঞেস করল, “তুমি সত্যি লেখাপড়া ছেড়ে দেবে?”
“হ্যাঁ। ছেড়ে দিতেই হবে। আমাদের একজন অংকের ম্যাডাম এসেছে, তার উৎপাতে আমাদের সবার লেখাপড়া ছেড়ে দিতে হবে।”
টুনি জিজ্ঞেস করল, “কেন? কী করেছে অংক ম্যাডাম?”
শান্ত বিশাল একটা নিঃশ্বাস ফেলে বলল, “কী করে নাই? প্রথম দিনেই এসে বলে কোনো কিছু মুখস্থ করা যাবে না। সবকিছু বুঝে বুঝে পড়তে হবে!”
টুনি দুর্বলভাবে বলল, “মনে হয়তো ঠিকই বলেছেন।”
শান্ত চিৎকার করে বলল, “কী বললি? ঠিকই বলেছেন? এর মাঝে কোন জিনিসটা তোর ঠিক মনে হচ্ছে?”
টুনি আমতা আমতা করে বলল, “বুঝে বুঝেই তো পড়তে হয়!”
শান্ত তার দুই বুড়ো আঙুল দেখিয়ে বলল, “কাঁচকলা! লেখাপড়া করতে করতেই জান শেষ আর এখন সেটা বুঝতেও হবে? আমার আর খেয়েদেয়ে কাজ নাই?”
শান্তর মেজাজ গরম দেখে একজন ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করল, “তাহলে কীভাবে লেখাপড়া করবে?”
“ঝাড়া মুখস্থ। কী পড়তে হবে বলে দেবে, সেটা ঝাড়া মুখস্থ করব। পরীক্ষার সময় লিখে দিয়ে আসব।”
টুনি জিজ্ঞেস করল, “অংকও মুখস্থ করবে?”
“একশ’বার। সবার আগে অংক মুখস্থ করব। দশটা অংক দেখিয়ে দেবে, সেগুলো ঝাড়া মুখস্থ করে রাখব। পরীক্ষায় সেই অংকগুলো দেবে আর আমরা সেগুলো লিখে দেব।”
শান্তর লেখাপড়ার পদ্ধতির বিরুদ্ধে কারো কথা বলার সাহস হলো। শান্ত নিজেই খানিকক্ষণ গজগজ করে বলল, “আর আমাদের অংক ম্যাডাম বলে সব বুঝে বুঝে পড়তে হবে! বুঝে বুঝে অংক করতে হবে! সপ্তাহে সপ্তাহে অংক পরীক্ষা। ফাইনাল পরীক্ষার আগে প্রশ্নটা কেমন হবে দেখানোর জন্যে আরেকটা পরীক্ষা নিয়েছে। সেই প্রশ্নটা একবার দেখবি?”
শান্তর প্রশ্ন দেখার কারো কৌতূহল ছিল না কিন্তু শান্ত তার ব্যাগ ঘেঁটেঘুঁটে একটা প্রশ্ন বের করে সবাইকে দেখানোর জন্যে এগিয়ে দিল। কেউ সেটা দেখার জন্যে নিচ্ছে না দেখে টুনি হাতে নিল।
শান্ত বলল, “তুই খালি একবার প্রশ্নটা দেখ! এটা কী রকম প্রশ্ন? এই প্রশ্ন করার জন্য অংক ম্যাডামের নামে মামলা করা দরকার ছিল।”
টুনি কিছু বলল না। শান্ত বলল, “আমি কি ঠিক করেছি জানিস?”
“কী?”
“আমাদের ক্লাশ থেকে আন্দোলন করব, প্রথমে মানববন্ধন তারপর গাড়ি ভাংচুর। কী কী স্লোগান দিব সেইটাও ঠিক করে ফেলেছি।”
স্লোগানের কথা শুনে অনেকেই উৎসাহী হলো, একজন জিজ্ঞেস করল, “কী স্লোগান?”
শান্ত মুখ সুচালো করে বলল, “একটা হচ্ছে :
মুখস্থ করতে চাই
নইলে কারো রক্ষা নাই।
আরেকটা হচ্ছে :
গাড়ির চাকা ঘুরবে না
বোঝাবুঝি চলবে না।
আরেকটা হচ্ছে :
হাইফাই ফিটফাট
পড়াশোনা শর্টকাট।”
বাচ্চা-কাচ্চা যারা ছিল তারা সবাই মাথা নেড়ে স্বীকার করল শ্লোগানগুলো বেশ ভালো হয়েছে। ভালো স্লোগান না হলে আন্দোলন করা যায় না।
টুনি ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করল, “তোমার ক্লাশের ছেলে-মেয়েরা সবাই আন্দোলন করতে রাজি হয়েছে?”
শান্ত মুখ ভেঁতা করে বলল, “সেইটাই হয়েছে মুশকিল। সবগুলো। ছেলে-মেয়ে ভ্যাবলা টাইপের, কারো ভেতর কোনো তেজ নাই। সহজে রাজি হতে চায় না। কিছু কিছু আছে দালাল, ম্যাডামকে খুশি করার জন্যে বলে, বুঝে বুঝে লেখাপজ করাই হচ্ছে আসল লেখাপড়া। এই ছেলে-মেয়েগুলো হচ্ছে বড় সমস্যা–এদের জন্যে দেশের কোনো উন্নতি হয় না!”
শান্ত কথা শেষ করে রেগেমেগে চলে গেল। টুনির হাতে তখনো শান্তর স্কুলের অংক ম্যাডামের প্রশ্ন, যেটা মুখস্থ করে পরীক্ষা দেয়া সম্ভব না। প্রশ্নটা কী করবে বুঝতে না পেরে টুনি সেটা আপাতত নিজের কাছেই রেখে দিল। সে তখনো জানত না এই প্রশ্নটা কয়দিনের মাঝেই তার কাজে লেগে যাবে।
সেদিন সন্ধ্যেবেলা টুনি ছোটাচ্চুকে জিজ্ঞেস করল, “আচ্ছা ছোটাচ্চু, একজন মানুষ যদি অন্যায় কাজ করে তাহলে তাকে শাস্তি দেওয়ার জন্যে কি আরেকটা অন্যায় কাজ করা যায়?”
ছোটাচ্চুর মনে হলো প্রশ্নটা খুব পছন্দ হয়েছে, প্রশ্নটা শুনেই তার মুখ একশ ওয়াট বাল্বের মতো জ্বলে উঠল, চোখগুলো উত্তেজনায় চকচক করতে লাগল। সোজা হয়ে বসে বলল, “তুই একটা মিলিয়ন ডলার প্রশ্ন করেছিস। তোর প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার আগে আমাদের আগে বুঝতে হবে আমরা অন্যায় বলতে কী বোঝাই। এটা কি মানুষের চোখে অন্যায় নাকি দেশের আইনের চোখে অন্যায়। তুই যদি বিষয়টা নিয়ে গবেষণা করিস তাহলে কি দেখবি জানিস? দেখবি শাসকগোষ্ঠী নিজেদের রক্ষা করার জন্যে কিছু কিছু কাজকে বলে অন্যায়। তাদের স্বার্থে যখন আঘাত করে—”
ছোটাচ্চু এই ভাষায় টানা পনেরো মিনিট কথা বলে গেল। টুনি প্রথম কয়েক মিনিট ছোটাচ্চুর কথা বোঝার চেষ্টা করল তারপর হাল ছেড়ে দিল। সে ছোটাচ্চুর মুখের দিকে তাকিয়ে রইল, কথা শোনার ভান করল, মাঝে মাঝে মাথা নাড়ল কিন্তু তার কোনো কথাই শুনল না।
বসার ঘরে প্রমির সাথে দেখা হলো, প্রমি এই বাসার বাচ্চাদের মাঝে মোটামুটি জ্ঞানী-গুণী মানুষ। টুনি তাকে একই প্রশ্ন করল, “আচ্ছা প্রমি আপু, একজন মানুষ যদি অন্যায় কাজ করে তাহলে তাকে শাস্তি দেওয়ার জন্যে কি আরেকটা অন্যায় কাজ করা যায়?”
