টুনি মুগ্ধ হয়ে শাপলা আপুর দিকে তাকিয়ে রইল, কারণ আসলে তার কাছে কোনো সিগারেটের প্যাকেট, সিগারেট, ম্যাচ কিছু নেই। পুরোটা মিছিমিছি। শাপলা আপু তার অদৃশ্য সিগারেটে আরেকটা টান দিয়ে টুনির দিকে তাকিয়ে বলল, “তুই খাবি একটা?”
টুনি বলল, “আমি তোমার মতো করে খেতে পারব না।”
“চেষ্টা করে দেখ। লজ্জার কী আছে?” শাপলা তার অদৃশ্য সিগারেটের প্যাকেট থেকে একটা অদৃশ্য সিগারেট বের করে টুনিকে দিল। টুনি একটু লজ্জা পাচ্ছিল, তারপরেও শাপলার দেখাদেখি কাল্পনিক সিগারেটটা ঠোঁটে লাগিয়ে টান দেওয়ার ভান করল।
শাপলা বলল, “বুঝলি টুনি, যখন আমার মন খারাপ হয় তখন এখানে বসে বসে সিগারেট টানি। কোনো কোনোদিন আস্ত একটা প্যাকেট শেষ করে ফেলি।”
টুনি বলল, “এত সিগারেট খাওয়া ভালো না শাপলা আপু।”
“জানি।” শাপলা আপু বলল, “কী করব বল। মনটা ভালো নাই।”
“তোমার সব অংক শুদ্ধ তার পরেও তোমাকে গোল্লা কেন দিল?”
“তুই শুনে কী করবি? তোর মন খারাপ হবে।”
“হবে না। তুমি বলো।
শাপলা তার কাল্পনিক সিগারেটে একটা লম্বা টান দিয়ে বলল, “আমাদের অংক করান ফাক্কু স্যার।”
ফাক্কু স্যারের নিশ্চয়ই অন্য কোনো নাম আছে, তার বাবা-মা নিশ্চয়ই তার ছেলের নাম ফাক্কু রাখেননি কিন্তু সেই নামটা স্কুলের কোনো ছাত্রছাত্রী জানে বলে মনে হয় না।
শাপলা বলল, “ফাক্কু স্যার আমাকে চ্যালেঞ্জও দিয়েছে যে আমি কোনোদিন তার পরীক্ষায় পাস করতে পারব না।”
“কেন?”
“আমি ফাক্কু স্যারের কাছে প্রাইভেট পড়ি না সেই জন্যে।”
“তুমি কার কাছে প্রাইভেট পড়ো?”
“আমি কারো কাছে প্রাইভেট পড়ি না।”
“অ।”
“ফাক্কু স্যারের কাছে প্রাইভেট না পড়লে অংকে ফেল। আমার বেলা শাস্তিটা একটু বেশি কঠিন। পুরোপুরি গোল্লা
“তুমি কাউকে বলো নাই?”
“কাকে বলব? ফাক্কু স্যার হচ্ছে স্কুল কমিটির প্রেসিডেন্টের আপন শালা। আমাদের প্রিন্সিপাল ম্যাডাম পর্যন্ত ফাক্কু স্যারকে ভয় পায়।”
“তোমার আব্বকে বলো না কেন?”
“লাভ নাই। আবু দেখে আর হাসে।”
টুনি অবাক হয়ে বলল, “হাসে? হাসে কেন?”
“আব্দুর ধারণা এই রকম মানুষের সাথে পরিচয় হওয়া ভালো। তাদের সাথে ধাক্কাধাক্কি করলে নাকি মানসিক শক্তি হয়।”
“মানসিক শক্তি?”
“হ্যাঁ। মানসিক শক্তি। চারিত্রিক গুণ। আত্মবিশ্বাস। বাস্তবতাবোধ।”
“এত কিছু?”
“আরো আছে। সবগুলো মনে নাই।“
টুনি খানিকক্ষণ চিন্তা করে বলল, তাহলে তোমার আম্মুকে বলল কেন?”
“বলেছি। প্রত্যেক রাত্রে ঘুমানোর সময় বলি।”
“তোমার আম্মু কিছু করবেন না?”
“করলে তো ভালো।”
“কী করবেন?”
শাপলা আপু মুখ গম্ভীর করে বলল, “বলেছি কোনো একটা অমাবস্যার রাতে ফাক্কু স্যারের ঘাড়টা মটকে দিতে।”
“ঘাড় মটকে দিতে?”
“হ্যাঁ। আমার আম্মু তো মরে গেছে। মানুষ মরে গেলে ভূত হয়–আমার আম্মু নিশ্চয়ই ভূত হয়ে আছে। ইচ্ছা করলেই ঘাড় মটকাতে পারে। কেন যে ফাক্কু স্যারের ঘাড় মটকাচ্ছে না!”
টুনি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে আস্তে করে শাপলা আপুর হাতটা ছুঁয়ে বলল, “আপু, আমার খুব খারাপ লাগছে। আমি জানতাম না তোমার আম্মু মারা গেছেন।”
“কেমন করে জানবি? আমি কি সবাইকে বলে বেড়াই নাকি?”
টুনি কিছু বলল না, শাপলা আপু তখন আরেকটা সিগারেট ধরাল। লম্বা টান দিয়ে বলল, “বার্ষিক পরীক্ষা আসছে তো, এইটা হচ্ছে ফাক্কু স্যারের সিজন।”
“সিজন?”
“হ্যাঁ, যারা ফাক্কু স্যারের কাছে প্রাইভেট পড়ে তাদের সবাইকে বাড়তি এক হাজার টাকা দিতে হবে।”
“এক হাজার টাকা?”
“হ্যাঁ।”
“কেন?”
“অংক পরীক্ষার সাজেশন।”
টুনি অবাক হয়ে বলল, “সাজেশনের জন্য এক হাজার টাকা?”
“মুখে বলে সাজেশন আসলে ফাক্কু স্যার পুরো প্রশ্নটা বলে দেয়, একেবারে দাড়ি-কমাসহ।”
“সত্যি?”
“সত্যি না তো মিথ্যা নাকি?”
“কাজটা ঠিক হচ্ছে না।”
টুনি বলল, “একেবারেই ঠিক হচ্ছে।”
“আমি কি ঠিক করেছি জানিস?”
“কী?”
“বোমা মেরে ফাক্কু স্যারের বাড়িটা উড়িয়ে দেব।”
টুনি শাপলা আপুর দিকে তাকাল, এটাও নিশ্চয়ই তার সিগারেট খাওয়ার মতো ব্যাপার। শাপলা মুখটা গম্ভীর করে বলল, “দশ কেজি প্লস্টিক এক্সপ্লোসিভ অর্ডার দিয়েছি।”
টুনি হাসি চেপে বলল, “কোথা থেকে অর্ডার দিয়েছ?”
“একেবারে সরাসরি সি.আই.এ.র কাছে।”
“সি.আই.এ. তোমাকে পাস্টিক এক্সপ্লেসিভ দিল?”
“প্রথমে দিতে চায় নাই, তারপর যখন নিউক্লিয়ার বোমার একটা ডিজাইন দিলাম তখন দিয়ে দিল।
টুনি শাপলার মুখের দিকে তাকিয়ে হি হি করে হেসে ফেলল, বলল, “তুমি কখন ফাক্কু স্যারের বাড়িটা ওড়াবে?”
“এখনো ঠিক করি নাই, সমস্যাটা কি জানিস?”
“কী?”
“ফাকু স্যারের বউ-বাচ্চা। তারা তো কোনো দোষ করে নাই, ফাক্কু স্যারের দোষের জন্যে বউ-বাচ্চাকে কষ্ট দেওয়া কি ঠিক হবে?” শাপলা খুব চিন্তিত মুখে সিগারেট টানতে থাকে, টুনি মুগ্ধ চোখে শাপলার দিকে তাকিয়ে থাকে। স্কুলের সবাই জানে শাপলা আপু খুব মজার মেয়ে কিন্তু এত মজার মেয়ে টুনি জানত না। নিজের কষ্ট নিয়েও মজা করতে পারে–এরকম মানুষ কয়জন আছে?
.
সেদিন রাত্রি বেলা শান্ত ঘোষণা দিল সে লেখাপড়া ছেড়ে দেবে। একজন জিজ্ঞেস করল, “কেন লেখাপড়া ছেড়ে দিবে?”
“মানুষ লেখাপড়া করে সার্টিফিকেটের জন্যে। আমি এর মাঝে সার্টিফিকেট পেয়ে গেছি। হার্ভার্ড থেকে পিএইচডি.।”
