টাক মাথায় অদৃশ্য চুল টেনে ছেঁড়ার ভঙ্গি করে বড় ছেলে চিৎকার করে বলল, “বুড়ি অরিজিনালটা গায়েব করে দিয়েছে? বাসার মাঝে জাল কপি লুকিয়ে রেখেছে? কত বড় ধুরন্ধর”
জমি রেজিস্ট্রি করার অফিসের লোক এইবারে আরো জোরে বেঁকিয়ে উঠল, বলল, “কাগজ পড়ে দেখবেন না, এইটা তো জাল দলিলও না–এইটা হচ্ছে তামাশা!”
“তামাশা?”
“হ্যাঁ, এই দেখেন কী লেখা”–মানুষই তখন পুরো কবিতাটা পড়ে শোনাল। কবিতার শেষ অংশ হচ্ছে :
গ্যান্দা ফুল হলুদকঙের জবা ফুল লাল
এইটা হলো ফটোকপি সেফ জায়গায় অরিজিনাল
এই দুই লাইন পড়ে লোকটা টেবিলে থাবা দিয়ে বলল, “এইখানে তো স্পষ্ট লেখা আছে এইটা ফটোকপি! চোখ দিয়ে দেখেন না? আপনাদের মাথার মাঝে কি গোবর?”
মোটাসোটা বড় মেয়ে হাঁসফাঁস করে বলল, “আমরা তাহলে কী করতে পারি?”
“আপনাদের আর কিছু করার নাই। এই বুড়ি অরিজিনালটা পাচার করে দিয়েছে। যাদেরকে জমিটা দিয়েছে তাদের হাতে অরিজিনাল! মামলা করলেই আপনারা জেলে!”
“জেলে?”
“হ্যাঁ। আর এই বুড়ি ডেঞ্জারাস। ঘরে বসে সে যদি আপনাদের মতো আধা ডজন মানুষকে ঘোল খাওয়ায় তার সাথে ঝামেলা করবেন না।”
“ঝামেলা করব না?”
“না।” লোকটা ভুরু কুঁচকে বলল, “এই বুড়ি আপনাদের কী হয়?”
বড় ছেলে টাক মাথায় হাত দিয়ে বলল, “আমাদের মা।”
লোকটা প্রথমে চোখ বড় বড় করে তাকাল, তারপর চিৎকার করে বলল, “আপনাদের মা নিজের মাকে বুড়ি বলে ডাকেন? আপনারা কী রকম মানুষ? দোজখেও তো আপনাদের জায়গা হবে না। আমি টাকা পয়সার জন্যে জালিয়াতি করি সেইটা এক কথা কিন্তু তাই বলে নিজের মায়েরে তো অপমান করি না। আপনারা বিদায় হন–আর কোনোদিন আমার কাছে আসবেন না। আসলে সোজা পুলিশে দিয়ে দিব।”
মাফিয়া বাহিনী মুখ কালো করে চলে এলো। তিন দিনের ভিতর আমেরিকার দুইজন আমেরিকা চলে গেল। দুবাইয়ের ছেলেটি দুবাই চলে গেল এক সপ্তাহ পর।
.
দিন দশেক পর একটা কফি হাউজে একজন বয়স্কা মহিলা আর একটা বাচ্চা মেয়েকে দেখা গেল। দুইজন মাথা খুব কাছাকাছি রেখে ফিসফিস করে ষড়যন্ত্রীদের মতো কথা বলছে। মাঝে মাঝেই দুইজন হি হি করে হাসছে।
বয়স্ক মহিলাটা মিসেস জাহান, বাচ্চা মেয়েটা টুনি।
৪. টিফিনের ছুটিতে সব ছেলে-মেয়েরা
টিফিনের ছুটিতে সব ছেলে-মেয়েরা ছুটোছুটি করে খেলছে, টুনি খানিকক্ষণ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখল। তারপর একটু হাঁটতেই চোখে পড়ল স্কুল বিল্ডিংয়ের শেষ মাথায় সিঁড়িতে কে যেন একা একা বসে আছে। জায়গাটা একটু নির্জন, কয়েকটা বড় বড় গাছ দিয়ে আবছা অন্ধকার, সাধারণত এখানে কেউ বসে না। মানুষটা কে হতে পারে দেখার জন্যে টুনি একটু এগিয়ে গেল, একটু কাছে যেতেই সে মানুষটাকে চিনতে পারল, তাদের স্কুলের শাপলা আপু।
শাপলা আপু টুনিদের স্কুলের সবচেয়ে তেজি মেয়ে, এই স্কুলে যা কিছু হয় সেখানে শাপলা আপু থাকে। সেই শাপলা আপু এখানে একা একা বসে আছে সেটা অবাক ব্যাপার। শাপলা আপু টুনিকে দেখে ডাকল, “এই টুনি, আয়, এদিকে আয়।”
টুনি এগিয়ে যেতেই শাপলা আপু একটু সরে টুনিকে বসার জায়গা দিয়ে বলল, “আয়। বস আমার সাথে।”
টুনি জিজ্ঞেস করল, “তুমি এখানে একা একা বসে আছ কেন শাপলা আপু।”
“মনটা খারাপ সেই জন্যে।”
“তোমার কেন মন খারাপ শাপলা আপু?”
“অংক পরীক্ষায় গোল্লা পেয়েছি।”
টুনি অবাক হয়ে শাপলা আপুর দিকে তাকাল, শাপলা আপু অন্য কিছুতে গোল্লা পেলে সে অবাক হতো না কিন্তু অংকে তার গোল্লা পাওয়ার কথা না। গত বছর শাপলা আপু গণিত অলিম্পিয়াডে মেডেল পেয়েছে।
শাপলা টুনির দিকে তাকিয়ে বলল, “আমার কথা বিশ্বাস হলো না?”
টুনি মাথা নাড়ল, তখন শাপলা তার হাতে ধরে রাখা খাতাটা খুলে দেখাল, বলল, “এই দেখ!”
টুনি দেখল খাতার ওপর বড় বড় করে লাল কালিতে দুইটা শূন্য দেওয়া আছে। খাতায় যেটুকু দেখা যাচ্ছে সেখানেও লাল কালিতে কাটাকাটি। দেখে মনে হয় রীতিমতো রক্তারক্তি ব্যাপার। টুনি কী বলবে বুঝতে পারল না, সান্ত্বনা দেওয়ার ভঙ্গি করে বলল, “শাপলা আপু, এইবার তোমার কিছু একটা গোলমাল হয়ে গেছে। তুমি অংকে এত ভালো, পরের বার দেখো–”
শাপলা টুনিকে কথা শেষ করতে দিল না, জোরে জোরে মাথা নেড়ে বলল, “না, না টুনি, তুই আসল ব্যাপারটাই বুঝতে পারিসনি।”
টুনি বলল, “আসল ব্যাপারটা কী?”
“আসল ব্যাপার হচ্ছে, আমার অংক একটাও ভুল হয় নাই।”
টুনি চোখ কপালে তুলে বলল, “তোমার একটা অংকও ভুল হয় নাই, তাহলে তোমাকে পোল্লা দিয়েছে কেন?”
শাপলা হাত তুলে পুরো ব্যাপারটা উড়িয়ে দেওয়ার মতো করে বলল, “বাদ দে! তুই ছোট মানুষ বুঝবি না।”
টুনি ব্যস্ত হয়ে বলল, “বুঝব শাপলা আপু। আমি বুঝব, তুমি বলো।”
শাপলা বলল, “এর চাইতে একটা সিগারেট খাই।”
টুনি আঁতকে উঠে বলল, “সিগারেট?”
শাপলা মাথা নাড়ল, বলল, “হ্যাঁ সিগারেট। আমার যখন মন খারাপ হয় তখন এইখানে বসে বসে আমি সিগারেট খাই।”
টুনি বলল, “কেউ দেখে নাই?”
“এখনো দেখে নাই।”
“যদি দেখে–”
“দেখলে দেখবে।” বলে শাপলা কোথায় জানি হাত ঢুকিয়ে একটা সিগারেটের প্যাকেট বের করে আনল। তারপর খুব সাবধানে প্যাকেটটা খুলে একটা সিগারেট বের করে মুখে দিয়ে দুই ঠোঁট দিয়ে চেপে ধরে একটা ম্যাচের কাঠি দিয়ে সিগারেটটা জ্বালিয়ে বুক ভরে একটা টান দিয়ে নাক দিয়ে মুখ দিয়ে ধোঁয়া ছাড়ল।
