প্রিয় দাদু,
এই প্রিন্টটা কোনোভাবে আমার ছোটাচ্চুকে
উদ্ধার করতে দিবেন!
টুনি
তারপর বইটা নিয়ে ছোটাচ্চুর ঘরে গেল। ছোটাচ্চু তখন কাপড় জামা পরে বের হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। টুনি জিজ্ঞেস করল, “কোথায় যাও?”
“আর কোথায়! মাফিয়া পার্টি ডেকে পাঠিয়েছে।”
“মিসেস জাহানের সাথে একটু দেখা করতে পারবে?”
“কেন?”
“আমাকে একটা বই পড়তে দিয়েছিলেন। বইটা পড়া শেষ হয়েছে, তুমি উনাকে ফেরত দিতে পারবে?”
“পারব। দে।” টুনি বইটা ছোটাচ্চুর হাতে দিয়ে বলল, “তার সাথে এইটা।”
“এইটা কী?”
“একটা রাবার।”
“রাবার দিয়ে কী হবে?”
টুনি বলল, “রাবার দিয়ে পেন্সিলের লেখা মোছে।”
ছোটাচ্চু বিরক্ত হয়ে বলল, “সেটা আমি জানি! মিসেস জাহানকে কেন দিতে হবে?”
“মিসেস জাহানের যদি কোনো পেন্সিলের লেখা মুছতে হয় সে জন্যে!”
“মিসেস জাহানের কেন পেন্সিলের লেখা মুছতে হবে?”
টুনি বলল, “সেটা তোমার জানার দরকার নাই ছোটাচ্চু!”
ছোটাচ্চু বিরক্ত হয়ে রাবারটা নিয়ে পকেটে ঢোকাল। তারপর আরো বিরক্ত হয়ে ঘর থেকে বের হয়ে গেল। টুনি পিছন থেকে বলল, “মিসেস জাহানকে বই আর রাবারটা দিতে ভুলো না যেন।”
ছোটচ্ছ আরো বেশি বিরক্ত হয়ে বলল, “ভুলব না।”
.
মিসেস জাহান তার বিছানায় বসে বই পড়ছিলেন। ছোটাচ্চু ভিতরে ঢুকে বলল, “চাচি, টুনি আপনাকে এই বইটা দিয়েছে। তার নাকি পড়া শেষ হয়ে গেছে।”
“তাই নাকি!” মিসেস জাহান বইটা হাতে নিলেন, উপরের মলাটটা দেখলেন এবং কিছু একটা অনুমান করলেন।
ছোটাচ্চু তখন পকেট থেকে রাবারটা বের করে মিসেস জাহানের হাতে দিয়ে বলল, “আপনাকে এই রাবারটাও দিতে বলেছে।”
“বলেছে নাকি? বলে থাকলে দাও। নিশ্চয়ই আমার কাজে লাগবে।”
মিসেস জাহান রাবারটা হাতে নিয়ে বললেন, “বাবা, এই বাসায় তোমার কাজ কি শেষ হয়েছে?”
ছোটাচ্চু মুখ কালো করে বলল, “উঁহু, শেষ হয় নাই।”
ভদ্রমহিলা ছোটাচ্চুকে ডেকে বললেন, “তোমাকে একটা কথা বলি বাবা?”
“জি বলেন।”
“আমার ছেলে-মেয়েগুলো মানুষ হয়নি। ওদের বুদ্ধি শুনে কাজ করতে আসাটা বুদ্ধিমানের কাজ হয় নাই। তোমাকে ভোগাবে।”
ছোটাচ্চু বলল, “জি। আমি বুঝতে পারছি।” তারপর বিশাল একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ঘর থেকে বের হয়ে গেল।
সাথে সাথে মিসেস জাহান মলাটটা খুললেন, ভেতর থেকে দলিলের প্রিন্টটা বের করলেন, পেন্সিলে টুনির লেখাটা পড়লেন, নিজের মতো করে একটু হাসলেন। দলিলের ভেতরের কবিতাটা চোখে পড়ল, সেটা পড়ে বাচ্চাদের মতো খিলখিল করে হাসতে লাগলেন। তারপর রাবারটা দিয়ে টুনির লেখাটা মুছে দলিলের প্রিন্ট কপিটা ভাজ করে একটা খামে ঢুকালেন, তারপর গুটি গুটি পায়ে বাইরের ঘরে এলেন। সেখানে ছোটাচ্চুকে ঘিরে ছয় ভাই-বোন বসে আছে, উত্তপ্ত একধরনের আলোচনা চলছে। মা’কে দেখে ছেলে-মেয়েরা চুপ করে গেল। মিসেস জাহান ছোটাচ্চুকে বললেন, “বাবা, তুমি যাওয়ার আগে আমার সাথে একটু দেখা করে যাবে?”
ছোটাচ্চু মাথা নাড়ল। মিসেস জাহান গুটি গুটি পায়ে হেঁটে আবার নিজের ঘরে ফিরে গেলেন।
কিছুক্ষণের মাঝে ছোটাচ্চু মিসেস জাহানের কাছে হাজির হলো। মিসেস জাহান বললেন, “তুমি একা এসেছ তো?”
“জি। আমি একা।
“এই যে রাবারটা, তুমি টুনিকে ফিরিয়ে দিও। দিয়ে বলো রাবারটার কাজ শেষ হয়েছে।”
ছোটাচ্চু বলল, “শুধু এইটুকু বলার জন্যে আমাকে ডেকেছেন?”
মিসেস জাহান মাথা নাড়লেন, বললেন, “না। আরো একটু কথা ছিল।”
“জি, বলেন।”
“আমার ঘরে তুমি কিছু একটা খুঁজে বেড়াচ্ছ, তাই না?”
ছোটাচ্চু লজ্জা পেয়ে গেল, ইতস্তত করে বলল, “না, মানে ইয়ে—আসলে–হয়েছে কী–”
মিসেস জাহান বললেন, “তোমার অপ্রস্তুত হওয়ার কোনো কারণ নেই। তুমি যেটা খুঁজছ সেটা খুঁজে না পাওয়া পর্যন্ত আমার ছেলে-মেয়ে তোমাকে ছাড়বে না।”
ছোটাচ্চু আরো অপ্রস্তুত হয়ে গেল। এবারে কোনো কথাই বলতে পারল না, শুধু কয়েকবার কথা বলার চেষ্টা করে হাল ছেড়ে দিল। মিসেস জাহান ছোটাচ্চুর দিকে দলিলের প্রিন্ট কপি ভরা খামটা এগিয়ে দিয়ে বললেন, “এই যে নাও। এইটা আমার ছেলে-মেয়েদের দিয়ে তাদের শান্ত করা যায় কি না দেখো।”
ছোটাচ্চু খামটা নিল, খুলে দলিলের প্রিন্ট কপিটা বের করে দেখে চমকে উঠল, বলল, “আ—আ–আপনি–আমাকে এটা দিয়ে দিচ্ছেন?”
“হ্যাঁ। আমার ছেলে-মেয়ের জন্যে।”
“থ্যাংকু চাচি, অনেক থ্যাংকু।”
“আমাকে থ্যাংকু দিতে হবে না, তোমার ভাতিজিকে থ্যাংকু দিও।”
“ভাতিজিকে? তার মানে টুনিকে? কেন?”
“আমাকে একটা রাবার ব্যবহার করতে দেওয়ার জন্য!” বলে মিসেস জাহান ছোটাচ্চুর দিকে তাকিয়ে চোখ টিপলেন। একজন বয়স্কা মহিলা যে চোখ টিপতে পারে সেটা ছোটাচ্চু আগে কখনো দেখেনি, দেখে খুবই অবাক হলো!
.
ছোটাচ্চু বাসায় আসল খুবই ফুরফুরে মেজাজে। তার পকেটে চেক এবং মুখে হাসি। মাফিয়া বাহিনী দলিলের প্রিন্ট কপি পেয়েই খুশি, তারা বুঝতে পারেনি এটা অরিজিনাল না। দলিলের ভেতরে পুরোটা পড়েনি তাই টুনটুনির কবিতার দুই লাইনও তাদের চোখে পড়েনি।
টুনটুনির কবিতা তাদের চোখে পড়ল দুই দিন পর, জমি রেজিস্ট্রি করার অফিসে। যে লোক অনেক টাকা খেয়ে জাল দলিল বের করবে বলে কথা দিয়েছিল সে এই প্রিন্ট কপি হাতে নিয়েই খেঁকিয়ে উঠল, “আপনি আমারে দিবেন অরিজিনাল আমি আপনারে দিব জাল জিনিস। আপনারা তো দেখি উল্টা কাজ করলেন–আমার জন্যে নিয়ে আসছেন জাল কপি-”
