“তোকে ছুঁয়ে বললে কী হবে?”
“কাউকে বললে আমি মরে যাব।”
“তুই মরে গেলে আমার সমস্যা কী?”
“আমি মরে গেলে তোমার অনেক সমস্যা। আমি ভূত হয়ে এসে তোমার ঘাড় মটকে দেব। তুমি যে ভূতকে ভয় পাও সেইটা আমি বাগানবাড়িতে দেখেছি। মনে আছে–”
শান্ত সেটা মনে করতে চায় না, তাই কথা ঘুরিয়ে বলল, “ঠিক আছে ঠিক আছে। কী করতে হবে তাড়াতাড়ি বল।”
টুনি এদিক-সেদিক তাকিয়ে গলা নামিয়ে বলল, “মনে আছে ছোটাচ্চু একটা ডাইনি বুড়ির কাছ থেকে জমির দলিল বের করতে চেয়েছিল?”
“হ্যাঁ। মনে হয় শুনেছিলাম।”
“আসলে সেই ভদ্রমহিলা মোটেও ডাইনি বুড়ি না। ভদ্রমহিলা খুবই সুইট। তার ছেলে-মেয়েগুলো হচ্ছে ডাইনি বুড়া আর ডাইনি বুড়ি।”
“তুই কীভাবে জানিস?”
“আমি কথা বলেছি। আমার কাছে এখন সেই দলিলটা আছে। পৃথিবীর কেউ জানে না–আমি আর তুমি ছাড়া।”
শান্ত টুনির দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল, আজকাল অবশ্যি টুনির কাজকর্ম দেখে সে খুব বেশি অবাক হয় না। টুনি বলল,
“তোমাকে এই দলিলটা স্ক্যান করে ইন্টারনেটে আপলোড করে দিতে হবে।”
শান্ত মাথা নেড়ে বলল, “এইটা তো সোজা কাজ। তোকে করে দিব। এখন টাকা-পয়সা না দিলি, পরে বিল করে দিব।”
টুনি বলল, “কাজ শেষ হয় নাই। আরো একটা কাজ বাকি আছে।”
“সেটা কী?”
“দলিলটার একটা প্রিন্ট দিতে হবে। রঙিন, যেন দেখে মনে হয় অরিজিনাল।”
“প্রমি আপুর কাছে স্ক্যানার আছে, স্ক্যান করে দিতে পারব। কিন্তু রঙিন প্রিন্ট কীভাবে করব?”
“সেই জন্যেই তো তোমার কাছে এসেছি।”
“তার মানে আমাকে বাইরে প্রিন্টারের দোকানে যেতে হবে।”
“দরকার হলে যাবে। আমি তোমার জন্য এত কিছু করি আর তুমি এই ছোট কাজটা করে দিতে পারবে না?”
“তুই আমার জন্যে কী করিস?
“বাগানবাড়িতে ভূতের ভয় পেয়ে তুমি আর ছোটাচ্চু ভূতের কাছে কত কান্নাকাটি করেছিলে মনে আছে? আমি কাউকে বলেছি?”
শান্ত আবার নরম হয়ে গেল। গজগজ করতে করতে বলল, “ঠিক আছে ঠিক আছে। দে দলিলটা।”
“আরো একটু কাজ করে দিতে হবে।”
“কী কাজ?”
“দলিলটার রঙিন প্রিন্টের মাঝখানে দুই লাইন কথা ঢুকিয়ে দিতে হবে। ভালো করে লক্ষ না করলে যেন কেউ ধরতে না পারে।”
“কী কথা?”
“একটা কবিতা।”
“কবিতা?”
“হ্যাঁ। কবিতাটা হচ্ছে—” টুনি কবিতাটা বলল,
“আজকালকার পোলাপান
বাপরে কয় তামুক আন
মা হইল ডাইনি বুড়ি
টাকা-পয়সা সোনার চান!”
শান্ত হা হা করে হেসে বলল, “এইটা আবার কী রকম কবিতা?”
টুনি বলল, “এখনো শেষ হয় নাই, শেষ দুই লাইন এই রকম :
গ্যান্দা ফুল হলুদ রঙের জবা ফুল লাল
এইটা হলো ফটোকপি সেফ জায়গায় অরিজিনাল।”
কবিতা শুনে শান্ত দুলে দুলে হাসল, তারপর বলল, “তোর ডিটেকটিভ না হয়ে কবি হওয়া উচিত ছিল।”
“সেটা না হয় হব। এখন আমার কাজ করে দাও।”
“ঠিক আছে দে। কখন দরকার?”
“কালকের ভিতরে। যদি সবকিছু ঠিক করে কাজ করো আমি তোমাকে একটু কমিশন জোগাড় করে দিতেও পারি।”
শান্তর চোখে-মুখে এবারে একটু উৎসাহ ফুটে উঠল। বলল, “ঠিক আছে।”
.
দুপুরবেলার ভিতরে শান্ত এসে টুনিকে তার কাগজপত্র বুঝিয়ে দিল। তার মুখে রাজ্য জয়ের হাসি। টুনিকে বলল, “কী হয়েছে জানিস?”
এ টুনি বলল, “কী হয়েছে?”
“আমি ভাবলাম তোর কাজ আউল-ফাউল জায়গায় না করে অরিজিনাল জায়গায় করি। কম্পিউটার স্ক্যান, ফটোকপি প্রিন্টিংয়ের জায়গায়। দুই নম্বরি কাজ করার মাঝে তারা এক নম্বর। তোর দলিলের প্রিন্ট একেবারে অরিজিনালের মতো করে দিল। ভিতরে তোর কবিতাটা না থাকলে কেউ বুঝতেই পারত না কোনটা অরিজিনাল কোনটা প্রিন্ট।”
“থ্যাংকু শান্ত ভাইয়া।”
“আমাকে তোর থ্যাংকস দিতে হবে না। তোকে থ্যাংকস।”
টুনি অবাক হয়ে বলল, “আমাকে থ্যাংকস কেন?”
“তোর জন্যেই তো এই ইন্টারেস্টিং স্ক্যানিং প্রিন্টিংয়ের দোকানটা খুঁজে পেলাম। আমার আর কোনো চিন্তা নাই।”
“কেন তোমার চিন্তা নাই?”
“এই দোকানে সবকিছু পাওয়া যায়। এস.এস.সি.র মার্কশিট, এইচ.এস.সি.র সার্টিফিকেট, ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রি, এম.বি.বি.এস, সার্টিফিকেট, মাস্টার্স, পি-এইচ.ডি সবকিছু। আমি আমার জন্যে একটা পি-এইচডি, সার্টিফিকেট কিনে এনেছি। হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটির।”
“সত্যি?”
“হ্যাঁ। এই দেখ।” শান্ত টুনিকে তার হার্ভার্ডের সার্টিফিকেট দেখাল। কম্পিউটার সায়েন্সে পি-এইচডি, সার্টিফিকেট, সেখানে বড় বড় করে শান্তর নাম লেখা। শান্ত তার পি-এইচডি, সার্টিফিকেট সরিয়ে আরেকটা সার্টিফিকেট বের করল। বলল, “সস্তায় পেয়ে আরো একটা সার্টিফিকেট কিনে এনেছি।”
টুনি জিজ্ঞেস করল, “কীসের সার্টিফিকেট?”
“ডেথ সার্টিফিকেট!”
টুনি চোখ কপালে তুলে বলল, “কার?”
“আমার। এই দেখ।” টুনি অবাক হয়ে দেখল, “সত্যি সত্যি শান্তর নামে ডেথ সার্টিফিকেট পরিষ্কার করে লেখা সে “কার্ডিয়াক এরেস্ট” করে মারা গেছে।
টুনি জিজ্ঞেস করল, “এইটা দিয়ে কী করবে?”
“কত কাজে লাগবে! স্কুলের পরীক্ষার সময় ব্যবহার করতে পারি। আম্মুকে ভয় দেখাতে পারি! বন্ধুদের সাথে বাজি ধরার কাজে ব্যবহার করতে পারি!”
শান্ত তার পি-এইচডি, আর ডেথ সার্টিফিকেট নিয়ে খুব খোশ মেজাজে অন্যদের দেখানোর জন্যে চলে গেল। টুনি গেল তার নিজের ঘরে। মিসেস জাহান তাকে যে কবিতার বইটা দিয়েছিলেন সেইটার উপরে দলিলের এই রঙিন প্রিন্টটা দিয়ে মলাট দিল। তারপরে ভেতরে একটা পৃষ্ঠায় পেন্সিল দিয়ে লিখল :
