ছোটাচ্চু মুখ কাঁচুমাচু করে বলল, “ঠিকই বলেছিস। আমার মতো অপদার্থ একজন মানুষকে ঘর থেকে বেরই করে দেওয়া দরকার।”
টুনি মুখ গম্ভীর করে বলল, “ছোটাচ্চু তুমি দলিলটা খুঁজে বের করার চেষ্টা করেছিলে?”
“করেছিলাম।”
“পেয়েছ?”
“না।”
“কীভাবে খুঁজেছ?”
“প্রথমে মিসেস জাহানকে বইয়ের দোকানে পাঠানো হলো। ওই মাফিয়া বাহিনীর কাছে মিসেস জাহানের ঘরের তালার চাবি আছে। সেই চাবি দিয়ে দরজা খুলে ভিতরে ঢুকে তন্নতন্ন করে খুঁজেছি। ঘর ভর্তি বই, প্রত্যেকটা বইয়ের একটা একটা পৃষ্ঠা করে খুঁজেছি। তোষকের নিচে, ড্রয়ারে, আলমারিতে কোথাও বাকি রাখি নাই।”
টুনির খুবই ইচ্ছে করল একবার জিজ্ঞেস করে মলাট দেয়া বইগুলোর মলাট খুলে দেখেছে কি না–কিন্তু শেষ পর্যন্ত আর জিজ্ঞেস করল না। সরল মুখে ছোটাচ্চুর দিকে তাকিয়ে বলল, “তারপর?”
“এইভাবে খুঁজে না পেয়ে আমি আসল ডিটেকটিভগিরি শুরু করলাম।”
টুনি সবই জানে, তারপরও মুখ গম্ভীর করে জিজ্ঞেস করল, “কী করলে তখন?”
“ঘরের ভিতরে আমার কলমের মতো দেখতে ভিডিও ক্যামেরাটা রেখে ঘরে আগুন দিয়ে দিলাম।”
ঘরের ভিতর আগুন দেয়ার খবর শুনলে যে রকম অবাক হওয়ার কথা সেরকম অবাক হওয়ার ভঙ্গি করে বলল, “আগুন!”
“সত্যিকারের আগুন না, ভুয়া আগুন। কেমিক্যাল দিয়ে তৈরি করা যায়, কোনো আগুন বের হয় না খালি ধোঁয়া বের হয়। সেই ভুয়া আগুন দিয়ে মিসেস জাহানকে ভয় দেখানো হলো, মিসেস জাহান তাড়াতাড়ি তার বিছানার নিচ থেকে একটা খাম নিয়ে ঘর থেকে বের হয়ে এলেন।”
টুনি চোখ বড় বড় করে বলল, “তারপর?
“আমি তখন সিওর হয়ে গেলাম যে এই খামের ভিতর দলিলটা আছে। তখন অনেক কায়দা করে সেই খামটা উদ্ধার করা হলো। খামের ভিতর কী ছিল জানিস?
টুনি জিজ্ঞেস করল, “কী?”
ছোটাচ্চু আবার একটা বিশাল নিঃশ্বাস ফেলে বলল, “একটা সাদা কাগজ। কাগজে একটা কবিতা লেখা।”
“কবিতা?”
“হ্যাঁ।”
ছোটাচ্চু অবিশ্বাসের ভঙ্গিতে মাথা নাড়তে নাড়তে বলল, “কবিতাটা শুনতে চাস?”
“বলো।”
ছোটাচ্চু তখন কবিতাটা আবৃত্তি করল।
“আজকালকার পোলাপান।
বাপকে কয় তামুক আন।
মা হইল ডাইনি বুড়ি
টাকা-পয়সা সোনার চান।”
টুনি চোখ বড় বড় করে ছোটাচ্চুর দিকে তাকিয়ে রইল। ছোটাচ্চু বলল, “আমরা যখন ছোট ছিলাম তখন এই কবিতাটা অন্যভাবে শুনেছিলাম। মিসেস জাহান একটু বদলে ফেলেছেন। তার মানে বুঝেছিস?”
টুনি জানতে চাইল, “কী?”
“তার মানে মিসেস জাহান সবকিছু জানেন। তার ছেলে-মেয়েরা যে দুই নম্বরি সেটা জানেন। তারা যে মাফিয়া সেইটা জানেন। তাকে যে তারা ডাইনি বুড়ি ডাকে সেইটাও জানেন। এখন কী মনে হচ্ছে জানিস? আমরা যে আগুনের ভয় দেখিয়ে তাকে ঘর থেকে বের করব সেইটাও জানেন–আমাদের টিটকারি করার জন্যে কাগজে ঐ কবিতাটা লিখে রেখেছেন। কী রকম বেইজ্জতি হলাম দেখেছিস?”
টুনি মাথা নেড়ে স্বীকার করল যে ছোটাচ্চু যথেষ্ট বেইজ্জতি হয়েছে।
“এখন এই মাফিয়া পার্টি আমার ঘাড়ে সিন্দাবাদের বুড়ার মতো চেপে বসেছে, আমি দলিল বের না করলে আমাকে ছাড়বে না। কী বিপদে যে পড়েছি!”
“দলিল বের করে দাও।”
“দলিল বের করে দিব?”
ছোটাচ্চু অবাক হয়ে টুনির দিকে তাকিয়ে বলল, “তুই ভেবেছিস বের করতে পারব? আর যদি পারিও সেটা মাফিয়া পার্টিকে দিব?”
টুনি মাথা নাড়ল, বলল, “উঁহু, আমি সেইটা বলি নাই। আমি বলেছি দুই নম্বরি মানুষকে একটা দুই নম্বরি দলিল দাও, তাহলেই তো সব ঝামেলা মিটে যায়।”
ছোটাচ্চু খানিকক্ষণ হাঁ করে টুনির দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর বলল, “দুই নম্বরি দলিল? আমি দুই নম্বরি দলিল কোথায় পাব?”
টুনি চিন্তিতভাবে মাথা নাড়ল, বলল, “সেটা অবশ্যি ঠিকই বলেছ! দুই নম্বরি দলিল তো আর কিনতে পাওয়া যায় না।”
“দলিল দেখতে কেমন হয় সেইটাও আমি জানি না!” ছোটাচ্চু হতাশভাবে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বিছানায় লম্বা হয়ে শুয়ে পড়ল।
টুনি তখন ছোটাচ্চুর ঘর থেকে বের হয়ে শান্তকে খোঁজ করে বের করল, সে তার পড়ার টেবিলে বসে পড়ছে–যেটা খুবই বিচিত্র একটা দৃশ্য! শান্তকে কেউ কখনো পড়ার টেবিলে দেখে না। টুনি বলল, “ও, শান্ত ভাইয়া! তুমি লেখাপড়া করছ? তাহলে আমি পরে আসি।”
শান্ত বলল, “পরে আসতে হবে না। যা বলতে চাস এখনই বলে ফেল।”
টুনি বলল, “উঁহু। তুমি এখন পড়ালেখা করো।”
শান্ত গলা নামিয়ে বলল, “আমি পড়ালেখা করছি কে বলেছে? পড়ালেখার ভান করে একটা ফাটাফাটি উপন্যাস পড়ছি।” শান্ত তার পাঠ্য বইয়ের নিচ থেকে একটা রগরগে বই বের করে দেখিয়ে দাঁত বের করে হাসল।
টুনি বলল, “ঠিক আছে তাহলে।”সে শান্তর সামনে একটা চেয়ারে বসে বলল, “আমার একটা কাজ করে দিতে পারবে?”
শান্তর চোখ চকচক করে উঠল, বলল, “কত দিবি?”
টুনি বলল, “আমি কোনো টাকা-পয়সা দিতে পারব না। তোমাকে ফ্রি করে দিতে হবে।”
“ফ্রি! আমি?” শান্ত হা হা করে হাসতে লাগল।
“হাসছ কেন? মানুষ কখনো অন্যের জন্যে কাজ করে দেয় না? তুমি যদি করতে না চাও আমি আর কারো কাছে যেতে পারি। আমি তোমার কাছে এসেছিলাম তার কারণ কাজটা অসম্ভব গোপনীয়।”
এইবারে শান্তর চোখে-মুখে একটু কৌতূহল ফুটে উঠল। জিজ্ঞেস করল, “কী কাজ?”
“কাউকে বলবে না তো?”
“বলব না।”
“আমাকে ছুঁয়ে বলো।”
