ভদ্রমহিলা বিছানার উপর ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রাখা বইগুলো থেকে একটা বই তুলে নিয়ে টুনির দিকে এগিয়ে দিয়ে বললেন, “এই বইটা নাও। বই পড়তে ভালো লাগে তো? আজকালকার ছেলে-মেয়েরা তো বই পড়ে না। শুধু টেলিভিশন দেখে।”
“আমি বই পড়ি।”
“চমৎকার। এই বইটা তোমার ভালো লাগবে কি না জানি –কবিতার বই।”
টুনি বইটা হাতে নিল, ময়লা একটা কাগজ দিয়ে বইটার মলাট দিয়ে রেখেছেন। একটা বইয়ের প্রচ্ছদটাই সবচেয়ে সুন্দর, সেইটাই যদি ময়লা কাগজ দিয়ে ঢেকে রাখা হয় তাহলে লাভ কী? টুনি মলাটটা খুলে বইয়ের প্রচ্ছদটা দেখবে নাকি চিন্তা করছিল, মনে হলো ভদ্রমহিলা সেটা বুঝে ফেললেন, বললেন, “মলাটটা খুলে বইটার প্রচ্ছদটা দেখতে পারো। কিন্তু এখানে না। বাসায় গিয়ে।”
টুনি অবাক হয়ে বলল, “বাসায় গিয়ে?”
“হ্যাঁ।” ভদ্রমহিলা ফিক করে হাসলেন, বললেন, “আমি দলিলটা দিয়ে বইয়ের মলাটটা দিয়ে রেখেছি! এখন বুঝেছ কেন কেউ কোনোদিন দলিলটা খুঁজে পায় নাই?”
টুনির চোখ বড় বড় হয়ে উঠল, বলল, “এই মলাটটা সেই দলিল?”
“হ্যাঁ।”
“আমার কাছে দিচ্ছেন?”
“হ্যাঁ। তোমার থেকে বিশ্বাসী মানুষ মনে হয় পাব না।”
“আমি এটা এখন কী করব?”
“রেখে দাও তোমার কাছে। একটা ফটোকপি আমার ছেলে মেয়ের কাছে পাঠিয়ে দিও। তাহলে বুঝবে আসলটা পাচার হয়ে গেছে।”
“তারা মনে হয় খুব রেগে যাবে।”
“রাগুক। আমার ছেলে-মেয়েগুলো মানুষ হয় নাই। বড় ইঞ্জিনিয়ার, ডাক্তার, অফিসার হয়েছে। ইউনিভার্সিটির মাস্টারও হয়েছে কিন্তু মানুষ হয় নাই।”
টুনি চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। ভদ্রমহিলা বললেন, “তাদের বাবা এই জমিটা একটা স্কুলকে দান করতে চেয়েছিল। আমি সেই জন্যে স্কুলকে দান করেছি। ছেলে-মেয়ের সহ্য হলো না। শুধু হিসাব করে আর লাফঝাঁপ দেয়। কারো টাকার কোনো অভাব নাই কিন্তু এই জমিটা ছাড়বে না। জাল দলিল করবে সেই জন্যে অরিজিনালটা নষ্ট করতে চায়?”
টুনি এবারেও কিছু বলল না।
দ্রমহিলা একটা নিঃশ্বাস ফেলে বলল, “এবারে দেখি কী করে!”
টুনি ভদ্রমহিলার কাছে গিয়ে বলল, “আপনি চিন্তা করবেন না। দেখবেন স্কুলকে জমিটা লিখে দিতে পারবেন।”
“ছেলে-মেয়েগুলোকে একটা শিক্ষা দেয়া দরকার।”
টুনি কোনো কথা বলল না, কিন্তু কীভাবে তাদেরকে শিক্ষা দেওয়া যায় তার কয়েকটা পরিকল্পনা মাথায় খেলা করতে লাগল। টুনি তার কোনোটাই ভদ্রমহিলাকে বলল না, বলার দরকারও নেই। বইটা বুকে চেপে ধরে রেখে বলল, “আমি যাই?”
“যেতে নেই। বলো আসি।”
“আমি আসি তাহলে?”
“এসো টুনি।”
টুনি ঘর থেকে বের হয়ে গেল।
.
ঠিক দুই দিন পর টুনি ছোটাচ্চুর ঘরে গিয়ে দেখে ছোটাচ্চু তার বিছানায় পা তুলে বসে আছে, মুখটা খুবই বিমর্ষ, ছোটাচ্চু বিয়ে করেনি, ছেলে-মেয়ে নাই, যদি থাকত তাহলে যে কেউ দেখে বলত নিশ্চয়ই তার ছেলে কিংবা মেয়ে মার্ডার হয়ে গেছে, কিংবা কাউকে মার্ডার করে ফেলেছে। ছোটাচ্চু টুনিকে দেখে একটা বিশাল দীর্ঘশ্বাস ফেলল। টুনি জিজ্ঞেস করল, “কী হয়েছে ছোটাচ্চু?”
ছোটাচ্চু কথা না বলে আরেকটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। টুনি তখন আরেকবার জিজ্ঞেস করল, “কী হয়েছে ছোটাচ্চু?”
ছোটাচ্চু বলল, “আর বলিস না। সবকিছু আউলাঝাউলা হয়ে গেছে।”
“কী আউলাঝাউলা হয়ে গেছে?”
“তোর মিসেস জাহানের কেসটার কথা মনে আছে?”
টুনি অবাক হয়ে বলল, “মিসেস জাহান? সেটা আবার কে?”
“মনে নাই, যাকে প্রথম প্রথম আমি ডাইনি বুড়ি বলেছিলাম? ভদ্রমহিলা খুবই সুইট, খুবই সম্মানী মহিলা। তাকে ডাইনি বুড়ি ডাকাটা খুবই বেকুবির কাজ হয়েছে। যতই দিন যাচ্ছে ততই মনে হচ্ছে তোর কথাই ঠিক।”
“আমার কোন কথাই ঠিক?”
“ঐ ভদ্রমহিলা মোটেই ডাইনি বুড়ি না, ডাইনি বুড়া ডাইনি বুড়ি হচ্ছে তার ছেলে-মেয়েগুলো। আমার এই কেসটা নেওয়াই ঠিক হয় নাই।”
টুনি তার চশমার উপর দিয়ে ছোটাচ্চুর দিকে তাকাল, জিজ্ঞেস করল, “কেন ঠিক হয় নাই?”
“ছেলে-মেয়েগুলো দুই নম্বরি। আসল দলিলটা বের করতে চাচ্ছে কেন জানিস?”
টুনি সবকিছুই জানে কিন্তু তারপরেও ভান করল কিছু জানে না। সরল মুখ করে জিজ্ঞেস করল, “কেন?”
“একটা জাল দলিল বের করবে সেই জন্যে। ছেলে-মেয়ে সবগুলো ক্রিমিনাল। আমেরিকা থেকে যেটা এসেছে সেটা রীতিমতো মাফিয়া।”
টুনি মুখ গম্ভীর করে বলল, “তুমি তাহলে ওদের জন্যে কাজ করছ কেন? ছেড়ে দাও।”
“ছাড়তেই তো চাই, কিন্তু ছাড়তে পারছি না।”
“কেন ছাড়তে পারছ না?”
ছোটাচ্চু আবার বিশাল একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “মনে নাই, আমি ওদের কাছ থেকে এডভান্স নিয়েছিলাম?”
“এডভান্স ফিরিয়ে দাও।”
ছোটাচ্চু মুখ কাঁচুমাচু করে বলল, “কেমন করে ফিরিয়ে দেব? খরচ করে ফেলেছি যে! ফারিয়ার জন্মদিন ছিল–আমাকে আমার জন্মদিনে কত কিছু গিফট দেয়, আমি ভাবলাম আমিও এবারে একটা ভালো বার্থডে গিফট দিয়ে অবাক করে দেব!”
“দিয়েছ গিফট?”
“হ্যাঁ। কী যে খুশি হলো ফারিয়া! এখন ফারিয়াকে বলতে হবে গিফটটা যেন ফেরত দেয়–দোকানে গিফটটা ফেরত নিবে কি না জানি না। রিকোয়েস্ট করলে একটু ডেমারেজ দিয়ে মনে হয় নিতেও পারে। এখন মুশকিল হচ্ছে ফারিয়াকে বলি কেমন করে!”
টুনি মাথা নাড়ল, বলল, “না ছোটাচ্চু। এটা তুমি করতেই পারবে না। তুমি যদি এটা করো তাহলে আমরা সবাই মিলে তোমাকে বাসা থেকে বের করে দিব।”
