টুনি ইতস্তত করে বলল, “আমি আপনাকে সাবধান করতে এসেছি।”
মহিলা এবারে কৌতূহলী চোখে টুনির দিকে তাকালেন, বইটা বন্ধ করে বিছানায় রেখে টুনিকে ভালো করে লক্ষ করে একটু হেসে দিলেন। টুনি লক্ষ করল মহিলার সাদা চুল, মুখে বয়সের চিহ্ন, চেহারাটা একটু কঠিন কিন্তু হাসা মাত্রই সব কাঠিন্য দূর হয়ে সেখানে কেমন যেন কৌতুকের একটা ভাব চলে এলো। মহিলা বললেন, “তুমি আমাকে সাবধান করতে এসেছ?”
“জি।”
“কী নিয়ে সাবধান করতে এসেছ?”
টুনি কাছে গিয়ে বিছানার একটা কোনায় বসে বলল, “আমার ছোট চাচাকে নিয়ে।”
“তোমার ছোট চাচা? তোমার ছোট চাচা কী করেছেন?”
“আমার ছোট চাচা একজন ডিটেকটিভ–”
বয়স্কা মহিলা চোখ বড় বড় করে চশমার ফাঁক দিয়ে টুনির দিকে তাকালেন, “সত্যি সত্যি ডিটেকটিভ আছে নাকি? আমি ভেবেছিলাম ওগুলো শুধু গল্পে থাকে।”
“সত্যি সত্যি আছে। ছোট চাচার এজেন্সিটার নাম দি আলটিমেট ডিটেকটিভ এজেন্সি। কয়েকটা কেস সলভ করেছে।”
“বেশ। তোমার ছোট চাচাকে নিয়ে আমাকে সাবধান করতে এসেছ কেন?”
“আপনার ছেলে-মেয়েরা ছোট চাচাকে একটা কাজ করতে দিয়েছে। আপনার ঘর থেকে একটা দলিল খুঁজে বের করতে দিয়েছে।”
হঠাৎ করে বয়স্কা ভদ্রমহিলার চোখে-মুখে আবার সেই কাঠিন্য ফিরে এলো। কেমন যেন কঠিন চোখে টুনির দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন, তারপর শীতল গলায় বললেন, “তুমি কেন আমাকে এটা বলতে এসেছ?”
টুনি মাথা নিচু করে বলল, “আমার ছোট চাচা মানুষটা খারাপ না, কিন্তু একটু সহজ-সরল। আপনার ছেলে-মেয়েরা তাকে বুঝিয়েছে–টুনি কথা শেষ না করে থেমে গেল।
“কী বুঝিয়েছে?”
“বুঝিয়েছে যে আপনি আপনি–” টুনি আবার কথা না বলে থেমে গেল। এরকম একজন বয়স্ক মহিলার সামনে ডাইনি বুড়ি কথাটা সে বলতে পারল না।
বয়স্ক মহিলা নিজেই বললেন, “ডাইনি বুড়ি?”
টুনি মাথাটা নিচু করে অস্পষ্ট স্বরে বলল, “হ্যাঁ।”
“আর কী বুঝিয়েছে?”
“বুঝিয়েছে আপনি আপনার ছেলে-মেয়েকে আদর করেন না। আপনার সব সম্পত্তি আপনি নিজের ছেলে-মেয়েদের না দিয়ে নষ্ট করে ফেলছেন, আজেবাজে লোকদের দিয়ে দিচ্ছেন।”
ভদ্রমহিলা বললেন, “আর বলতে হবে না। আমি বুঝতে পারছি।”
“আমার ছোট চাচা আপনার ছেলে-মেয়েদের কথা বিশ্বাস করে দলিলটা খুঁজে বের করতে রাজি হয়েছে। কাজটা যে ঠিক না সেটা বুঝতে পারছে না।”
ভদ্রমহিলা কিছুক্ষণ টুনির দিকে তাকিয়ে রইলেন, একটা বড় নিঃশ্বাস ফেলে বললেন, “তুমি ছোট মানুষ, এই বড়দের ব্যাপারে কেন জড়িয়ে গেলে?”
টুনি লাজুক মুখে একটু হাসার চেষ্টা করে বলল, “আমি আমার ছোট চাচার অ্যাসিস্ট্যান্ট।”
“অ্যাসিস্ট্যান্ট?”
“হ্যাঁ। ছোট চাচা যতগুলো কেস সলভ করেছে সবগুলোতে আমি ছিলাম।”
“তুমি ছিলে?”
“হ্যাঁ।” টুনি বলল, “আমি সব সময়েই চাই ছোটাচ্চু”–টুনি একটু থেমে ব্যাখ্যা করল, “ছোট চাচাকে আমরা ছোটাচ্চু ডাকি। আমি চাই ছোটাচ্চু কেস সলভ করুক। শুধু এইবার আমি চাই ছোটাচ্চু যেন কেসটা সলভ করতে না পারে। কিছুতেই যেন আপনার দলিলটা বের করতে না পারে।”
“কেন?”
টুনি মাথা চুলকাল, বলল, “ঠিক জানি না। কিন্তু মনে হচ্ছে কাজটা ঠিক না।”
দ্রমহিলা কিছুক্ষণ টুনির দিকে তাকিয়ে থেকে বললেন, “তুমি ছোট মেয়ে কিন্তু তোমার কথাবার্তা, কাজকর্ম বড়দের মতো।”
টুনি মাথা নাড়ল, বলল, “আমার ক্লাশের মেয়েরা আমাকে খালাম্মা ডাকে।”
ভদ্রমহিলা হেসে ফেললেন, বললেন, “না। তুমি এখনো খালাম্মা হওনি।”
“কেউ কেউ নানুও ডাকে।”
“সেটা নিয়ে দুশ্চিন্তা কোরো না।” ভদ্রমহিলা বললেন, “তুমি আমাকে সাবধান করতে এসেছ–ঠিক কীভাবে আমাকে সাবধান থাকতে হবে।”
টুনি বলল, “আমার ছোটাচ্চু ঠিক কীভাবে দলিলটা খুঁজবে সেটা বলতে এসেছি।”
“কীভাবে খুঁজবে?”
“প্রথমে আপনি যখন এই ঘরে থাকবেন না তখন এই ঘরে খুব ভালো করে খুঁজবে।”
ভদ্রমহিলা হাসলেন, বললেন, “জন্মেও পাবে না।”
“তারপর ঘরে একদিন আগুন লাগানোর মতো একটা ব্যবস্থা করবে–আপনাকে বলবে তাড়াতাড়ি ঘর থেকে বের হয়ে যেতে–একটা ভিডিও ক্যামেরা দিয়ে আপনাকে লক্ষ করবে। আপনি জরুরি কাগজপত্র নিয়ে বের হবেন, সেই জরুরি কাগজপত্রের মাঝে দলিলটা থাকবে, সেখান থেকে বের করবে।”
ভদ্রমহিলা টুনির দিকে ভুরু কুঁচকে তাকালেন, জিজ্ঞেস করলেন, “তুমি কেমন করে জানো?”
“ছোটাচ্চুর একটা হলুদ বই আছে। সেই বইয়ে লেখা আছে কোন কাজের জন্যে কী করতে হয়। যদি ঘরে আগুন লাগিয়ে বের করতে না পারে তাহলে আপনার পুরো ঘর ভেঙেচুরে ঠিক করবে। দেখবে আপনি কী করেন। তাও যদি না পারে তাহলে ডাক্তারি ওষুধ দিয়ে চেষ্টা করবে। আমিও ছোটাচ্চুর বইটা পড়েছি”
ভদ্রমহিলা কোনো কথা না বলে টুনির দিকে তাকিয়ে থাকলেন। তারপর আবার ফিক করে হেসে ফেললেন, বললেন, “তোমার মতো অ্যাসিস্ট্যান্ট থাকলে তোমার ছোটাচ্চু কোনোদিন ডিটেকটিভগিরি করতে পারবে না।”
টুনি কোনো কথা বলল না। ভদ্রমহিলা জিজ্ঞেস করলেন, “তোমার নাম কী মেয়ে?”
“কঠিন একটা নাম আছে, এমনিতে সবাই টুনি ডাকে।”
“টুনিই ভালো।”
“দাদু, আমি তাহলে যাই?”
“যাবে? যাও। আমাকে সাবধান করে দিয়েছ সেই জন্যে তোমাকে তো আমার কিছু একটা দেওয়া দরকার। একটা চকোলেটের প্যাকেট কিংবা অন্য কিছু।”
“না না কিছু লাগবে না দাদু।”
