“করতে হবে” শব্দ দুটো অবশ্যি শোনা গেল “কড়টে হবে” তবে ছোটাচ্চু সেজন্যে কিছু মনে করল না। একজন মানুষকে সারা জীবন দেশের বাইরে থাকতে হলে এরকম কিছু একটা হতেই পারে। ছোটাচ্চু বলল, “হ্যাঁ। আমি বুঝতে পেরেছি আমাকে কী করতে হবে। একটা জমির দলিল আপনার মা তার ঘরে লুকিয়ে রেখেছেন, সেটা খুঁজে বের করতে হবে।”
বড় ভাই মাথা নাড়ল, বলল, “ইয়েস।”
ছোটাচ্চু বলল, “এটা কীসের দলিল, কেন আপনার মা সেটা আপনাদের কাছ থেকে লুকিয়ে রাখতে চান, কেন আপনারা তার পরও সেটা খুঁজে বের করতে চান সেটা কি আমাকে একটু বলবেন?”
বড় ভাই বলার চেষ্টা করল, ইংরেজি-বাংলা মিশিয়ে কিছু একটা বলতে শুরু করল, তখন বড় বোন তাকে ঝটকা মেরে থামিয়ে দিল। বড় বোন মোটাসোটা এবং নাদুসনুদুস। দেখে মনে হয় নিঃশ্বাস আটকে যাচ্ছে, সব সময়ই কেমন যেন হাঁসফাঁস করতে থাকে। হাঁসফাঁস করতে করতে বলল, “আমার মা এইরকম করছেন তার একটাই কারণ! তার কারণ আমার মা আসলে একটা ডাইনি বুড়ি! সবার মা থাকে, তারা তাদের বাচ্চাদের কত আদর করে আর আমার মা আমাদের দূর দূর করে তাড়িয়ে দেয় বড় বোন কথা শেষ না করে হেঁচকির মতো শব্দ করে কাঁদতে শুরু করল।
ছোটাচ্চু খুব অপ্রস্তুত হয়ে পড়ল, ছোট বাচ্চারা কাঁদলে তাদের মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করে সান্ত্বনা দেওয়া যায়। কিন্তু বড় মানুষ বিশেষ করে মোটাসোটা নাদুসনুদুস মানুষ হেঁচকি তোলার মতো শব্দ করে কাঁদতে শুরু করলে তাকে কীভাবে সান্ত্বনা দেওয়া যায় ছোটাচ্চু বুঝতে পারল না। কাঠির মতো শুকনো ছোট একজন বোন তাকে সান্ত্বনা দিল, বলল, “তুমি খামোখা কাঁদছ কেন বড় আপু? বুড়ির কাছে তোমার চোখের পানির কোনো দাম আছে?”
বড় বোন তখন হেঁচকি তোলা থামিয়ে কান্না বন্ধ করল। বড় ভাই তখন ছোটাচ্চুকে জিজ্ঞেস করল, “আপনি কীভাবে কাজ শুরু করবেন?” (বড় ভাই অবশ্যি শুরু করবেন বলল না, বলল ‘শুড় কড়বেন)।
ছোটাচ্চু গম্ভীর গলায় বলল, “আপনারা নিজেরা যেহেতু অনেক খুঁজেও দলিলটা পাননি, কাজেই ধরে নিচ্ছি আপনার মা সেটা বেশ ভালোভাবেই লুকিয়ে রেখেছেন, কাজেই সাধারণভাবে খুঁজে এটা পাওয়া যাবে না। তারপরেও আমি সাধারণভাবে একবার খুঁজে দেখতে চাই। কিন্তু ঘরে আপনার মা থাকলে সেটা সম্ভব হবে না।”
নাদুসনুদুস বড় বোন হাঁসফাঁস করতে করতে বলল, “সেটা কোনো সমস্যা না। বুড়ি বই পড়তে খুব পছন্দ করে, তাকে বইয়ের দোকানে নিয়ে যাওয়ার কথা বললেই সে বই কিনতে চলে যায়।”
ছোটাচ্চু জিজ্ঞেস করল, “ঘরে তালা দিয়ে যান?”
কাঠির মতো শুকনো লিকলিকে বোন বলল, “তাতে সমস্যা নাই। আমরা তালা-চাবিওয়ালা ডেকে তালার চাবি বানিয়ে রেখেছি। বুড়ি বাইরে গেলেই ঘরে ঢুকি।”
ছোটাচ্চু বলল, “গুড। যদি এমনি খুঁজে পেয়ে যাই তাহলে ভালো। যদি পাওয়া না যায় তাহলে একদিন একটা ইমার্জেন্সি সিচুয়েশান তৈরি করতে হবে।”
বড় ভাই তার মাথার অদৃশ্য চুলে হাত বুলাতে বুলাতে বলল, “ইমার্জেন্সি সিচুয়েশান?”
“হ্যাঁ। ঘরে ইলেকট্রিক শর্ট সার্কিট দিয়ে আগুন লেগে গেছে এরকম একটা সিচুয়েশান। আপনার মা তখন ঘর থেকে তাড়াতাড়ি বের হতে চেষ্টা করবেন–তখন মূল্যবান কাগজপত্র সাথে নিয়ে বের হওয়ার চেষ্টা করবেন। ঘরে ভিডিও ক্যামেরা থাকবে, সেটা দিয়ে মনিটর করা হবে, ঠিক কী নিচ্ছেন, সেখান থেকে বোঝা যাবে।”
বড় ভাই মাথা নাড়ল, বলল, “গুড আইডিয়া।”
ছোটাচ্চু বলল, “সেটাও যদি কাজ না করে তাহলে আমরা প্ল্যান ‘সি’তে যেতে পারি।”
শুকনো কাঠি বোন জিজ্ঞেস করল, “প্ল্যান সি?”
“হ্যাঁ। স্বাভাবিক খোঁজাখুঁজি হচ্ছে প্ল্যান এ, ইমার্জেন্সি সিচুয়েশান হচ্ছে প্ল্যান বি। আর প্ল্যান সি হবে ঘর রিনোভেশান।”
“ঘর রিনোভেশান?”
“হ্যাঁ। আপনার মায়ের ঘরে উপর থেকে পানি ঢালতে হবে, বোঝাতে হবে ছাদে ফাটল হয়ে পানি ঢুকছে, পুরো ঘর ভেঙেচুরে ঠিক করতে হবে। তখন গোপন ভিডিও ক্যামেরা দিয়ে আপনার মা’কে মনিটর করতে হবে। গোপন দলিল যেন হাতছাড়া না হয়ে যায় সে জন্যে আপনার মা সেটা খুঁজে বের করবেন।”
হাঁসফাঁস করতে করতে বড় বোন বলল, “বাসাটা এমনিতেই পুরানো হয়ে গেছে, ঠিক করতে হবে। আর বুড়ি একলা মানুষ তার এত বড় রুমের দরকার কী? কোনার ছোট রুমে ট্রান্সফার করে দিলেই তো বের হয়ে যাবে!”
বড় ভাই আর বোন সেটা নিয়ে আলোচনা শুরু করে দেয়। অন্য ভাই-বোনগুলো সারাক্ষণ চুপ করে ছিল, এবারেও চুপ করে মাছের মতো তাদের দিকে তাকিয়ে থাকে।
ছোটাচ্চু বলল, “যদি প্ল্যান সি কাজ না করে তাহলে রয়েছে প্ল্যান ডি। আমি অবশ্যি এটা করতে চাই না, কারণ এটা করতে হলে আমার ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে।”
বড় ভাই জিজ্ঞেস করল, “প্ল্যানটা কী শুনি?”
ছোটাচ্চু তখন বেশ আজগুবি প্ল্যান-ডিটা ব্যাখ্যা করতে থাকে।
.
এদিকে টুনি ডাইনি বুড়ির ঘর খুঁজে বের করে দরজা একটু ফাঁক করে বলল, “দাদু, আসতে পারি?”
ঘরের ভেতর আবছা অন্ধকার। বিছানায় বসে দেওয়ালে হেলান দিয়ে একজন বেশ বয়সী মহিলা বই পড়ছিলেন। মাথা তুলে চশমার ফাঁক দিয়ে টুনির দিকে তাকিয়ে বললেন, “কে?”
টুনি ঘরে ঢুকে বলল, “আপনি আমাকে চিনবেন না।”
বয়সী মহিলা কিছুক্ষণ টুনির দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “তুমি আমার কাছে? কী মনে করে?”
