ছোটাচ্চু বলল, “উঁ।”
টুনি বলল, “ছোটাচ্চু আমি তোমার ডাইনি বুড়ির কেসের একটা জিনিস বুঝতে পারছি না।”
“কী জিনিস?”
“তোমাকে কী করতে হবে?”
“আমাকে ডাইনি বুড়ির কাছ থেকে জমির দলিলটা উদ্ধার করে দিতে হবে।”
টুনি বলল, “ও।” যদিও সে কিছুই বুঝতে পারল না।
ছোটাচ্চু বলল, “ডাইনি বুড়ি জমির দলিলটা তার ঘরে কোথাও লুকিয়ে রেখেছে। পুরো ঘরটা আঁতিপাঁতি করে সবাই মিলে খুঁজেছে কিন্তু কেউ খুঁজে পায় নাই। আমাকে সেটা খুঁজে বের করে দিতে হবে।”
টুনি আবার বলল, “ও।”
ছোটাচ্চু বলল, “দলিলটা খুঁজে পেলে জমিটা উদ্ধার করা যাবে। তা না হলে ডাইনি বুড়ি যাকে জমিটা দিয়েছে সে যদি মামলা করে দেয় তাহলে সমস্যা হয়ে যাবে। এখনো তো নামজারি হয় নাই, তাই একটা সুযোগ আছে। জমি যখন বিক্রি হয় তখন প্রথমে জমি রেজিস্ট্রি করতে হয়। তারপর…” ছোটাচ্চু তখন কেমন করে জমি বিক্রি করতে হয় তার নিয়ম-কানুনগুলো টুনিকে খুব উৎসাহ নিয়ে বোঝাতে লাগল, টুনি কিছুই বুঝতে পারল না। ছোটাচ্চু অনেকক্ষণ কথা বলে শেষ পর্যন্ত কেমন জানি ক্লান্ত হয়ে থেমে গেল। টুনি আবার জমি বিক্রি নিয়ে নতুন আরেকটা বক্তৃতা না শুরু করে দেয় সেই ভয়ে তাড়াতাড়ি ঘর থেকে বের হয়ে যেতে চেষ্টা করল, দরজার কাছাকাছি গিয়ে থেমে গিয়ে আবার ফিরে এসে ছোটাচ্চুকে জিজ্ঞেস করল, “আচ্ছা ছোটাচ্চু, তুমি কি ডাইনি বুড়িকে দেখেছ?”
ছোটাচ্চু বলল, “না, এখনো দেখি নাই।”
“তাহলে তুমি কেমন করে জানো বুড়িটা ডাইনি বুড়ি?”
ছোটাচ্চু সোজা হয়ে বলল, “আমি কি শুধু শুধু একটা বুড়িকে ডাইনি বুড়ি বলব? তার ছেলে-মেয়েরা বলেছে বলেই তো আমি বলি।”
টুনি তার বড় বড় চশমার ফাঁক দিয়ে ছোটাচ্চুর দিকে তাকিয়ে বলল, “ছেলে-মেয়েরা তার নিজের মাকে ডাইনি বুড়ি ডাকে?”
“হ্যাঁ।”
টুনি কিছুক্ষণ চোখ বড় বড় করে ছোটাচ্চুর দিকে তাকিয়ে রইল তারপর একটা লম্বা নিঃশ্বাস ফেলে বলল, “আচ্ছা ছোটাচ্চু, এমন কি হতে পারে যে মা’টা ঠিকই আছে, ছেলে-মেয়েগুলো ডাইনি বুড়া আর ডাইনি বুড়ি?”
ছোটাচ্চু ভুরু কুঁচকে কিছুক্ষণ টুনির দিকে তাকিয়ে থেকে বলল, “ডাইনি বুড়া আর ডাইনি বুড়ি?”
“হ্যাঁ, মেয়েরা যদি ডাইনি বুড়ি হতে পারে তাহলে ছেলেরা কেন ডাইনি বুড়া হতে পারবে না?
ছোটাচ্চু কেমন যেন ভ্যাবাচেকা খেয়ে গেল, তারপর বলল, “ডাইনি বুড়া? তুই বলছিস মেয়েরা যদি ডাইনি বুড়ি হয় তাহলে ছেলেরা হবে ডাইনি বুড়া?”
“হ্যাঁ। যদি বয়স কম হয়, বুড়া-বুড়ি বলতে না চাও তাহলে বলতে পারো বেটা-বেটি। ডাইনি বেটা ডাইনি বেটি।”
ছোটাচ্চু মাথা চুলকাতে লাগল, তারপর নিজেও একটা বিশাল নিঃশ্বাস ফেলল। টুনি তখন ছোটাচ্চুকে আরো ভালো করে মাথা চুলকানোর সুযোগ করে দিয়ে ঘর থেকে বের হয়ে এলো। পরদিন ছোটাচ্চু যখন তার ঘর থেকে বের হচ্ছে ঠিক তখন টুনি সেখানে হাজির হলো। সেও বের হবার জন্যে সেজেগুঁজে ফিটফাট হয়ে এসেছে।
ছোটাচ্চু অবাক হয়ে বলল, “তুই কোথায় যাচ্ছিস?”
“তোমার সাথে।“
“ছোটাচ্চু আরো অবাক হয়ে বলল, “আমার সাথে?”
“হ্যাঁ। ডাইনি বুড়ি দেখতে।”
“ডা-ডাইনি বুড়ি দেখতে?”
“হ্যাঁ। তুমি এখন ডাইনি বুড়ির বাড়িতে যাচ্ছ না?”
ছোটাচ্চু আমতা আমতা করে বলল, “হ্যাঁ। কিন্তু তুই কেমন করে জানিস?”
ছোটাচ্চুর টেলিফোনে কথাবার্তা একটু মনোযোগ দিয়ে শুনলেই যে এগুলো জানা যায় টুনি সেটা আর বলল না। মুখ গম্ভীর করে বলল, “তুমি ডিটেকটিভ। আমি তোমার অ্যাসিস্ট্যান্ট মনে নাই? আমি সব জানি।”
ছোটাচ্চু বলল, “কিন্তু আমি এখন যাচ্ছি ফ্যামিলির সবার সাথে কথা বলতে, তুই বাচ্চা মানুষ গিয়ে কী করবি?”
“আমি কিছু করব না। শুধু ডাইনি বুড়িকে একনজর দেখব। আমি জীবনে ডাইনি বুড়ি দেখি নাই।”
“কিন্তু—”
“ছোটাচ্চু, তোমার কোনো কাজে আমি কোনোদিন ঝামেলা করেছি? করি নাই। বরং উল্টোটা হয়েছে–আমি তোমার কেস সলভ করে দিয়েছি।”
“কিন্তু–”
“আমি তোমাদের কোনো ঝামেলা করব না। তুমি ফ্যামিলির সাথে কথা বলবে, আমি তখন ডাইনি বুড়িকে একটু দেখে আসব। যদি ডাইনি বুড়ি কথা বলতে রাজি হয় তাহলে তার কথা শুনতে পারি। তার ঘরটা একটু দেখে আসতে পারি, তোমার কাজে লাগবে। মনে নাই”
ছোটাচ্চু বলল, “কিন্তু—”
টুনি বলল, “কোনো কিন্তু নাই ছোটাচ্চু। মনে নাই ভূতের বাড়িতে তুমি গলায় তাবিজ লাগিয়ে বিদেহী আত্মার কাছে কত কী বলেছিলে? আমাকে তুমি বলেছ সেই কথাটা যেন আমি কাউকে না বলি। আমি তোমার কথা শুনেছি। কাউকে বলি নাই। আর তুমি আমার এই ছোট একটা কথা শুনতে পারবে না?”
ছোটাচ্চুর মুখটা এবারে একটু আমসি মেরে গেল। এই মেয়েটি বাকি জীবন ভূতের বাড়ির সেই ঘটনাটা দিয়ে তাকে ব্ল্যাকমেইল করবে। যদি কোনোদিন ফারিহাকে বলে দেয় তাহলে বেইজ্জতির চূড়ান্ত হবে। ছোটাচ্চু ফোঁস করে একটা নিঃশ্বাস ফেলে মিনমিন করে বলল, “ঠিক আছে চল।”
টুনি ছোটাচ্চুকে জড়িয়ে ধরে বলল, “তুমি এত সুইট ছোটাচ্চু! এই জন্যেই তো আমরা তোমাকে এত পছন্দ করি।”
.
ডাইনি বুড়ির বাসায় ডাইনি বুড়ির ছেলে-মেয়েরা ছোটাচ্চুর সাথে টুনিকে দেখে বেশ অবাক এবং মনে হলো একটু বিরক্ত হলো। ছোটাচ্চু অবশ্যি খুব কায়দা করে ব্যাপারটা সামলে নিল। তাদেরকে বোঝাল এরকম কেসে সে ইচ্ছে করে টুনিকে নিয়ে যায়, বয়স্ক মানুষেরা বড় মানুষের কাছে মুখ খুলে না কিন্তু ছোট বাচ্চাদের সাথে একেবারে খোলামেলা কথা বলে ফেলে। টুনিকে পাঠানো হচ্ছে ডাইনি বুড়ির ভেতরের খবর বের করার জন্যে। ডাইনি বুড়ির ছেলে-মেয়েরা ছোটাচ্চুর কথা বিশ্বাস করে টুনিকে ডাইনি বুড়ির ঘরে পাঠিয়ে দিয়ে ছোটাচ্চুর সাথে কথা বলার জন্যে বাইরের ঘরে বসল। ডাইনি বুড়ির ছয় ছেলে-মেয়ে তাকে ঘিরে সোফায় বসে পড়ে। বড় ছেলের মাথায় টাক কিন্তু তাকে দেখে মনে হয় সেটা সে জানে না। একটু পরে পরে হাত দিয়ে সে তার মাথার’অদৃশ্য চুলে হাত বুলায়। সে-ই কথা শুরু করল, অনেক দিন থেকে সে আমেরিকায় আছে, তাই বাংলা কথা তার মুখে আসতেই চায় না। ইংরেজিটা খাঁটি আমেরিকান উচ্চারণ, বাংলাটাও ইংরেজির মতো শোনায়। সে ছোটাচ্চুকে বলল, “আপনি বুঝেছেন আপনাকে কী করতে হবে?”
