ছোটাচ্চু মনে হলো এই প্রশ্নটা শুনে একটু বিরক্ত হলো, মুখ ভোঁতা করে বলল, “কত টাকা সেটা ইম্পরট্যান্ট না। ইম্পরট্যান্ট হচ্ছে পার্টি এখন আমার আলটিমেট ডিটেকটিভ এজেন্সিকে এডভান্স টাকা দেয়। সেটাই হচ্ছে ইম্পরট্যান্ট।”
শান্ত রাজি হলো না, “মাথা নেড়ে বলল, “উঁহু। কত টাকা দিয়েছে সেইটা ইম্পরট্যান্ট।”
ছোটাচ্চু আরো বিরক্ত হয়ে বলল, “সেটা মোটেও ইম্পরট্যান্ট না।”
শান্ত বলল, “বুঝেছি। তোমাকে আসলে খুবই কম টাকা দিয়েছে সেই জন্যে আমাদের বলতে চাইছ না।”
ছোটাচ্চু ধমক দিয়ে বলল, “সবসময় শুধু টাকা টাকা করবি না।”
শান্ত বলল, “ঠিক আছে। এখন থেকে ডলারে কথা বলব। তোমাকে কত ডলার দিয়েছে ছোটাচ্চু?”
ছোটাচ্চু একটা বাজখাই ধমক দিতে যাচ্ছিল কিন্তু তার আগেই টুনি জিজ্ঞেস করল, “তোমার প্রজেক্টটা কী ছোটাচ্চু?”
সবচেয়ে শান্তশিষ্ট মেয়েটি বলল, “ডাইনি বুড়িকে মার্ডার করতে হবে মনে হয়। কেমন করে মার্ডার করবে ছোটাচ্চু?”
আরেকজন উৎসাহ নিয়ে বলল, “রিভলবার দিয়ে গুলি করবে, তাই না ছোটাচ্চু?”
আরেকজন আরো বেশি উৎসাহ নিয়ে বলল, “না-না-না। ডাইনি বুড়িদের গুলি করলে কিছু হয় না। তাদের গলা টিপে মারতে হয়। তুমি গলা টিপে মারবে, তাই না ছোটাচ্চু?”
একজন সাবধান করে দিল, “তুমি কিন্তু খুব সাবধান থেকো। ডাইনি বুড়ি ইচ্ছা করলেই মন্ত্র দিয়ে তোমাকে ভেড়া বানিয়ে দেবে।”
আরেকজন সেটা ব্যাখ্যা করল, “তারপর কচ করে তোমার মাথাটা কামড় দিয়ে খেয়ে ফেলবে। তোমার কোনো মাথাই থাকবে না।”
শান্ত বলল, “তুমি নিজে নিজে ডাইনি বুড়িকে মার্ডার করতে যেয়ে। পুলিশ-র্যাব তোমাকে ধরে ফেলবে। একটা হিটম্যান ভাড়া করো। আজকাল রেট অনেক কম। দুই হাজার টাকা দিলে যে কাউকে মার্ডার করে দিবে।”
ছোটাচ্চু বাচ্চাদের কথা শুনে খুবই বিরক্ত হলো। বলল, “তোরা এমন ভায়োলেন্ট হলি কেমন করে? ছোট ছোট বাচ্চারা কত সুইট হয়, কত সুন্দর করে কথা বলে, আর তোরা শুধু মার্ডার নিয়ে কথা বলিস। খুন-জখম নিয়ে কথা বলিস। তোদের সমস্যাটা কী?”
একজন বলল, “আমরা খুন-জখম নিয়ে কথা বলি তোমার জন্যে। তুমি খুন-জখম-মার্ডার করোরা সেই জন্যে আমরা খুন-জখম-মার্ডার নিয়ে কথা বলি।”
ছোটাচ্চু চোখ কপালে তুলে বলল, “আমি কোনোদিন খুন, জখম, মার্ডার করেছি?”
“আমরা বইয়ে পড়েছি। সিনেমায় দেখেছি। ডিটেকটিভরা সব সময় খুন-জখম-মার্ডার করে। তুমিও করবে। তাই না রে?”
সব বাচ্চা মাথা নাড়ল, বলল, “হ্যাঁ। হ্যাঁ। ছোটাচ্চুও খুন-জখম মার্ডার করবে।”
ছোটাচ্চু গলা উঁচিয়ে বলল, “কোনোদিনও আমি খুন-জখম-মার্ডার করব না। গল্প বইয়ের ডিটেকটিভ আর বাস্তবের ডিটেকটিভ এক না। বাস্তবের ডিটেকটিভের কাজ হচ্ছে বুদ্ধির কাজ। মগজের কাজ।”
ছোট একজন বলল, “কিন্তু তোমার তো মগজও কম। বুদ্ধিও কম।”
ছোটাচ্চু চোখ লাল করে বলল, “কে বলেছে?”
“সবাই বলে।”
ছোটাচ্চু রেগে কী একটা বলতে যাচ্ছিল টুনি থামিয়ে দিয়ে বলল, “ছোটাচ্চু তুমি এখনো বলো নাই, ডাইনি বুড়ি নিয়ে তোমার কাজটা কী?”
ছোটাচ্চু গজগজ করে বলল, “আমি তো বলতে যাচ্ছিলাম, তোদের যন্ত্রণায় কি কথা বলা যায়?”
“ঠিক আছে। এখন বলো।”
ছোটাচ্চু বলল, “আমি যে ডাইনি বুড়ির কথা বলছি তার ছয় ছেলে মেয়ে। দুইজন থাকে আমেরিকা, একজন থাকে দুবাই, বাকি তিনজন দেশে থাকে। এখন ছুটিতে সবাই দেশে এসেছে, এসে পড়েছে মহা মুশকিলে।”
একজন জিজ্ঞেস করল, “কী মুশকিল?”
“ডাইনি বুড়ির হাজব্যান্ড যখন বেঁচে ছিল তখন নাকি ডাইনি বুড়ি ভালোই ছিল, ছেলে-মেয়েদের আদর করত। এখন ছেলে-মেয়েদের দুই চোখে দেখতে পারে না। দেখা হলে দূর দূর করে তাড়িয়ে দেয়।”
টুনি জিজ্ঞেস করল, “কেন?”
“সেটাই তো কেউ জানে না। ছেলে-মেয়ের ধারণা তার মায়ের একটু মাথা খারাপের মতো হয়েছে।”
“কেন? কী করে?”
“যেমন মনে কর, তার যা কিছু আছে সেগুলো এখন সেখানে ফেলে দেয়। নষ্ট করে ফেলে!”
“আর কী করে?”
“তার হাজব্যান্ড এই ডাইনি বুড়ির নামে জমি লিখে দিয়েছিল, ডাইনি বুড়ি এখন এই জমিটা নাকি নষ্ট করবে।”
শান্ত ভুরু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল, “জমি কীভাবে নষ্ট করে?”
ছোট একজন বলল, “ফ্রিজের বাইরে গোশত রাখলে গোশত নষ্ট হয়ে যায় না? মনে হয় সেইরকম, তাই না ছোটাচ্চু?”
ছোটাচ্চু বলল, “ধুর গাধা! জমি কি কেউ ফ্রিজে রাখে নাকি? জমি নষ্ট করা মানে হচ্ছে জমিটা পাগল-ছাগলকে দান করে দেওয়া। অপদার্থ মানুষদের দিয়ে দেওয়া। ক্রিমিনালদের দিয়ে দেওয়া।”
বাচ্চারা কেউ কিছু বুঝতে পারল না কিন্তু তারা সেটা নিয়ে মাথা ঘামাল না। জমি কাউকে দিয়ে দিলে দিবে, না দিলে দিবে না। এটা নিশ্চয়ই ভেজাল ডাইনি বুড়ি। সত্যিকারের ডাইনি বুড়ি নিশ্চয়ই জমি নষ্ট করে না। তারা ছোট বাচ্চাদের ধরে ধরে কচমচ করে খায়! সেই রকম ডাইনি বুড়ি হলে একটা কথা ছিল। একটা ভেজাল ডাইনি বুড়ি যে তার জমি ছেলেমেয়েদের না দিয়ে আলতু-ফালতু মানুষদের দিয়ে দিচ্ছে তাকে নিয়ে কারো কোনো কৌতূহল নাই। বাচ্চারা আবার তাদের রাজাকার-মুক্তিযোদ্ধা খেলায় ফিরে গেল।
.
রাত্রিবেলা টুনি ছোটাচ্চুর ঘরে গিয়ে হাজির হলো। ছোটাচ্চু তার বিছানায় হেলান দিয়ে বসে আছে, কোলে একটা খাতা এবং হাতে একটা বল পয়েন্ট কলম, কলমটা গভীর মনোযোগ দিয়ে চিবুচ্ছে। টুনি ডাকল, “ছোটাচ্চু।”
