.
ফিরে গিয়ে ছোটাচ্চু তার ক্লায়েন্টকে রিপোর্ট দিল যে, এই বাগানবাড়িতে কোনো ভূত নেই, তবে বাড়িটা এমন একটা পরিবেশে আছে যে এটাকে ভূতের বাড়ি হিসেবে পরিচয় দিয়ে উৎসাহী দর্শকদের ভূত দেখার অভিজ্ঞতার জন্যে ভাড়া দেওয়া যেতে পারে। কেউ যেন নিরাশ না হয় খুব সহজেই ভূত দেখানোর ব্যবস্থাও করা যেতে পারে। আইডিয়াটা বাড়ির মালিকের বেশ পছন্দ হয়েছে, কীভাবে করা যায় সেটা নিয়ে ছোটাচ্চুর সাথে আলোচনা করেছে, ছোটাচ্চুর ধারণা রমজান আলী, তার বউ আর শালার একটা পাকাপাকি ব্যবস্থা করে দেয়া যাবে।
ভূতের বাড়ি দেখতে যাওয়া নিয়ে আর কারো কোনো লাভ হয়েছে কি না কেউ জানে না, শুধু টুনির বিশাল লাভ হয়েছে। ছোটাচ্চু যখনই কোনো কিছু নিয়ে গড়িমসি করে তখন টুনি বলে, “ছোটাচ্চু দেব সবাইকে বলে? তুমি কীভাবে তোমার তাবিজটা ধরে বলেছিলে, হে বিদেহী আত্মা হে অশরীরী…”
ছোটাচ্চু তখন লাফ দিয়ে এসে টুনির মুখ চেপে ধরে বলে, “বলিস, বলিস না প্লিজ! তোর কসম লাগে। তুই কী চাস বল!”
টুনির দিনকাল এখন ভালোই যাচ্ছে।
৩. ছোটাচ্চু বসার ঘরে
ছোটাচ্চু বসার ঘরে ঢুকে ডান হাতটা উপরে তুলে একটা ঝাঁকুনি দিয়ে বলল, “প্রজেক্ট ডাইনি বুড়ি।”
বাচ্চারা মেঝেতে বসে রাজাকার-মুক্তিযোদ্ধা খেলছিল, তারা খেলা নিয়ে এতই ব্যস্ত ছিল যে ছোটাচ্চুর কথা শুনতে পেল না। খেলাটার আসল নাম ছিল চোর-পুলিশ, বাসার সবচেয়ে ছোট বাচ্চা গুচ্ছ চোর পুলিশ ছাড়া আর কিছু খেলতে পারে না, তাই সে সবসময় চোর-পুলিশ লেখা কয়েকটা কাগজ নিয়ে সবার পিছনে পিছনে এটা খেলার জন্যে ঘুরে বেড়াত, কেউ খেলতে রাজি হতো না। তখন টুনি তাকে বুদ্ধি দিয়ে বলল, “তোর এই খেলা কেউ খেলবো, স্মার্ট ফোনে কত হাইফাই খেলা আছে দেখেছিস? তুই এই চোর-পুলিশ খেলাটাকে বদলে ফেল। চোর আর ডাকাতের বদলে নাম দে রাজাকার আর আলবদর। পুলিশ আর দারোগার বদলে নাম দে মুক্তিযোদ্ধা আর সেক্টর কমান্ডার। তাহলে দেখবি সবাই খেলবে।”
টুনির বুদ্ধি শুনে গুডু খেলার চরিত্রগুলোর নাম পাল্টে দিল, তখন সত্যি সত্যি সবাই এটা খেলতে লাগল। প্রথমে চারজন খেলত, খেলোয়াড়ের সংখ্যা বাড়তে থাকলে মুক্তিযোদ্ধাও বাড়াতে হলো, ছেলে মুক্তিযোদ্ধা, মেয়ে মুক্তিযোদ্ধা, শিশু মুক্তিযোদ্ধা, কিশোর মুক্তিযোদ্ধা তৈরি হলো। খেলোয়াড় আরো বেড়ে যাবার পর রাজাকার আলবদরের সাথে সাথে আলশামস, শান্তি বাহিনী, পাকিস্তানি মিলিটারি এই চরিত্রগুলো তৈরি করতে হলো। খেলার মাঝে সেক্টর কমান্ডার যখন মুক্তিযোদ্ধাদের রাজাকার, আলবদর, শান্তিবাহিনী কিংবা পাকিস্তান মিলিটারি ধরে আনতে বলে তখন তারা শুধু ধরে আনে না, ধরার পর রীতিমতো ধোলাই দিয়ে ছেড়ে দেয়! কাউকে ধোলাই দিলে সেটা এমনি এমনি কেউ সহ্য করত না, কিন্তু রাজাকার হিসেবে ভোলাই খেয়ে তারা গলা ফাটিয়ে আর্তনাদ করে কিন্তু কিছু মনে করে না। ধরেই নিয়েছে রাজাকার-আলবদর হলে একটু পিটুনি খেতেই হবে। কাজেই অত্যন্ত নিরীহ চোর-পুলিশ খেলাটা এখন প্রচণ্ড নাটকীয় এবং ভয়ঙ্কর উত্তেজনার একটা খেলা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাচ্চারা যখন এই খেলাটি খেলে তখন তাদের ধারে-কাছে কেউ শান্তিতে থাকতে পারে না। তাই বাচ্চারা কেউ যে ছোটাচ্চুর ঘোষণাটা শুনতে পায়নি তাতে অবাক হবার কিছু নেই। ছোটাচ্চু তখন গলা আরো উঁচিয়ে বলল, “প্রজেক্ট ডাইনি বুড়ি।”
এবারে বাচ্চারা মাথা ঘুরিয়ে ছোটাচ্চুর দিকে তাকাল। শান্ত এবারে রাজাকার হিসেবে ধরা পড়ে বেদম মার খাচ্ছিল, সবাই আপাতত মার থামিয়ে ছোটাচ্চুর কথা শোনার চেষ্টা করল। একজন জিজ্ঞেস করল, “প্রজেক্ট কী বুড়ি?”
ছোটাচ্চু মুখ গম্ভীর করে বলল, “ডাইনি বুড়ি।”
আরেকজন জিজ্ঞেস করল, “ডাইনি বুড়ি? সত্যি?”
ছোটাচ্চু মাথা নাড়ল বলল, “হ্যাঁ।“
“নাকের মাঝে আঁচল আছে? ঝাড়ুর মাঝে বাস, আকাশে উড়তে পারে।”
ছোটাচ্চু বলল, “ওইগুলো আমেরিকান ডাইনি বুড়ি। আমাদের বাংলাদেশের ডাইনি বুড়ি আকাশে ওড়ে না।”
তখন আরেকজন জিজ্ঞেস করল, “বাংলাদেশের ডাইনি বুড়িরা কী করে?”
“ছেলে-মেয়েদের যন্ত্রণা দেয়। তাদের জীবন অতিষ্ঠ করে দেয়।”
তখন একজন এদিক-সেদিক তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, “আমার আম্মুও তো আমাকে যন্ত্রণা দেয়, তাহলে আম্মু কি ডাইনি বুড়ি?”
ছোটাচ্চু বলল, “আরে ধুর! এই যন্ত্রণা সেই যন্ত্রণা না।”
“তাহলে কী রকম যন্ত্রণা।”
“মনে কর কোনো একটা বুড়ি নিজের ছেলে-মেয়েকে ভালোবাসে, আদর করে না, দূর দূর করে তাড়িয়ে দেয়। কিন্তু অন্যদের জন্যে দরদে বুক ভাসিয়ে দেয়।”
বাচ্চাদের আশা ভঙ্গ হলো। তারা ভেবেছিল ছোটাচ্চু আরো ভয়ঙ্কর কিছু বলবে, রাত্রি বেলা মানুষের ঘাড়ে কামড় দিয়ে রক্ত শুষে খায়, এরকম কিছু। ছেলে-মেয়েকে ভালোবাসে না, আদর করে না এটা আবার কী রকম ডাইনি বুড়ি? খুবই পানসে ম্যাড়ম্যাড়া ডাইনি বুড়ি।
বাচ্চারা আবার তাদের রাজাকার-মুক্তিযোদ্ধা খেলায় ফিরে গেল। এই রকম ডাইনি বুড়িতে তাদের খুব বেশি উৎসাহ নেই। ছোটাচ্চুর অবশ্যি অনেক উৎসাহ, বাচ্চাদের ডেকে বলল, “আমার এই প্রজেক্টের জন্যে এডভান্স টাকা দিয়েছে সেটা জানিস?”
সবাই প্রায় একসাথে জিজ্ঞেস করল, “কত টাকা?”
