এবারে মনে হলো ভিতরে একটু খুটখাট শব্দ, একটু ফিসফিস কথাবার্তা শোনা গেল। টুনি বলল, শুনেন, “আমরা সবকিছু জানি। মেইন সুইচে আমি হাজার পাওয়ার রঙের গুড়া লাগিয়ে এসেছি, আপনারা যখন সেটা অফ করেছেন তখন হাতে রং লেগেছে, যতই থোয়ার চেষ্টা করেন সেই রং আর উঠবে না!”
ঝুমু খালা বলল, “হুঁ হুঁ! মজাটা টের পাবে তখন।”
শান্ত তার ব্যাটটা দিয়ে মাটিতে দুই-চারবার ঘা দিল।
টুনি বলল, “দরজাটা খুলেন। আমরা আপনাদের কিছু বলব না, শুধু একনজর দেখতে চাই। উপর থেকে আমি বেসিনে লাল রং ঢেলে দিয়েছি, আপনাদের যিনি পাইপে মুখ লাগিয়ে কাঁদছিলেন তার মুখে লাল রং লেগে গেছে। আমরা জানি! যতই সাবান দিয়ে ধোয়ার চেষ্টা করেন এই রং আর উঠবে না!”
ঝুমু খালা বলল, “উঠবে না। সোড়া দিয়ে সিদ্ধ করলেও উঠবে না।”
টুনি বলতেই থাকল, “কাপড় শুকানোর দড়ি টেনে কীভাবে গাছের ডাল নাড়িয়েছেন সেটাও আমরা জানি। জানালার কপাটে দড়ি লাগিয়ে কীভাবে নিচে থেকে এটা খুলেছেন আর বন্ধ করেছেন সেইটাও আমরা জানি। কাজ শেষ করে আপনারা দড়িটা টেনে সরাতে পারেন নাই, তার কারণ দড়িটা আমি ওপরে পেঁচিয়ে রেখেছি।”
ছোটাচ্চু অবাক হয়ে টুনির মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। ঝুমু খালা দরজায় লাথি দিয়ে বলল, “এখন দরজা খুলেন। এই দড়ি আপনাদের কোমরে বেঁধে থানায় নিয়ে যাব। পাইছেনটা কী?”
টুনি বলল, “শুধু শুধু ঘরের ভেতরে থেকে লাভ নাই, বের হয়ে আসেন। মনে করবেন না আমরা কিছু বুঝি না। আমরা সব বুঝি। মোমবাতিটা এখনো পরীক্ষা করি নাই, কিন্তু পরীক্ষা না করেই বলতে পারি মোমবাতির সুতাটা কেটে ছোট করে রেখেছেন, যেন একটুক্ষণ পরেই নিভে যায়!”
ঝুমু খালা হুংকার দিল, “আপনারা কি আমাদের বেকুব ভাবছেন? আপনাদের বুদ্ধি যদি থাকে মাথার ভিতরে আমাদের বুদ্ধি তখন থাকে রগে রগে।”
ছোটাচ্চু বলল, “আমরা দশ পর্যন্ত শুনব, এর মাঝে দরজা না খুললে পুলিশে ফোন করে দিব।”
ঝুমু খালা বলল, “শুধু পুলিশ না, মিলিটারি বিজিবি র্যাব সবাইরে ফোন করে দিব। আপনাদের ধরে নিয়ে সাথে সাথে ক্রস ফায়ার!”
ছোটাচ্চু বলল, “আমি গুনতে শুরু করলাম, এক।”
কয়েক সেকেন্ড পর টুনি বলল, “দুই।”
ঝুমু খালা হুংকার দিল, “তিন।”
টুম্পা আস্তে আস্তে বলল, “চার।”
শান্ত গর্জন করল, “পাঁচ।”
ছয়’ বলার আগেই খুট করে দরজা খুলে গেল। সবার সামনে ফুটফুটে একটা বউ, সারা মুখে লাল রং। দুই হাত দিয়ে মুখটা ঢেকে রাখার চেষ্টা করছে কিন্তু ঢাকতে পারছে না। তার পিছনে রমজান আলী, হাতটা লুকিয়ে রাখার চেষ্টা করছে কিন্তু দেখা যাচ্ছে ডান হাতের আঙুলগুলো টকটকে লাল। তাদের পিছনে বিশ-বাইশ বছরের একটা ছেলে, গায়ে কালো টি-শার্ট, শুধু তার শরীরের কোথাও কোনো রং নেই। তিনজন মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল আর ছোটাচ্চু কোমরে হাত দিয়ে হুংকার দিয়ে বলল, “আপনাদের এত বড় সাহস। আমাদের
ভূতের ভয় দেখান–আপনাদের আমি পুলিশে দেব।”
রমজান আলী মাথা নিচু করে বলল, “ভুল হয়ে গেছে। মাফ করে দেন।”
“মাফ? মাফ করা এত সোজা? এক্ষুনি আমি পুলিশকে ফোন করব–“
টুনি ছোটাচ্চুর শার্টটা টেনে বলল, “ছোটাচ্চু, মনে আছে, নানির রাজাকার টাইপ ভাইটা যখন আমাদের বাসায় এসেছিল তখন তুমি আমাদেরকে নিয়ে তাকে ভূতের ভয় দেখিয়েছিলে?”
“হ্যাঁ।”
“সেই বুড়ো রাজাকার ভয়ে কাপড়ে বাথরুম করে দিয়েছিল মনে আছে?”
“হ্যাঁ, মনে আছে।”
“তখন তোমাকে তো আমরা পুলিশে দেই নাই। দিয়েছিলাম?”
“কিন্তু—”
“তাই এদেরকেও তুমি পুলিশে দিতে পারবে না।”
টুম্পা এবং শান্ত টুনির কথার সাথে সাথে জোরে জোরে মাথা নাড়ল, বলল, “পারবে না। কিছুতেই পারবে না। নিয়ম নাই।”
“তাহলে তোরা বলতে চাস এদের কোনো শাস্তি হবে না?”
টুনি বলল, “অপরাধ করলে শাস্তি হয়। মজা করলে শাস্তি হয়।”
টুম্পা আর শান্ত মাথা নাড়ল, “হয় না। মজা করলে শাস্তি হয় না। সবাই মজা করতে পারে।”
টুনি বলল, “আর তুমি যদি মনে করো একটা শাস্তি দিতেই হবে তাহলে একটা শাস্তি দেওয়া যায়।”
ছোটাচ্চু গম্ভীর গলায় বলল, “কী শাস্তি?”
“যা খিদে পেয়েছে। রমজান চাচি যদি কোনো একটা নাস্তা বানিয়ে খাওয়ায়–সাথে পায়েসের মতো ঐ মসলা চা!”
শান্ত জোরে জোরে মাথা নাড়ল, বলল, “গুড আইডিয়া। আমারও খুব খিদে লেগেছে। ভয় পেলে মনে হয় বেশি খিদে লাগে।”
“এই শাস্তি?”
টুনি, টুম্পা আর শান্ত বলল, “হ্যাঁ।”
ফুটফুটে বউটা এই প্রথম মুখ ফুটে কথা বলল, “লুচি ভেজে দেই? সাথে বেগুন ভাজি আর ডিম ভুনা? রসমালাই আছে একটু, দিব?”
কেউ কিছু বলার আগে শান্ত হাতে কিল দিয়ে বলল, “ফ্যান্টাস্টিক আইডিয়া।”
ঝুমু খালা বউটিকে বলল, “আমি যখনই লুচি ভাজি কেমন জানি কড়কড়া হয়ে যায়, নরম হয় না। তুমি আমাকে শিখাবা কেমন করে নরম লুচি ভাজতে হয়?
বউটি ফিক করে একটু হেসে বলল, “আসেন।”
ছোটাচ্চু, টুনি, টুম্পা আর শান্ত যখন রমজান আলীর বাড়ি থেকে বাগানবাড়িতে ফিরে যাচ্ছে তখন ছোটাচ্চু বিড়বিড় করে বলল, “সবকিছু বুঝলাম। একটা জিনিস শুধু বুঝতে পারলাম না।”
টুনি জিজ্ঞেস করল, “কী বুঝতে পারলে না?”
“কেন এরা সবাইকে ভূতের ভয় দেখায়?”
.
মিনিট ত্রিশেক পর যখন লুচি, বেগুন ভাজা, ডিম ভুনা, রসমালাই আর পায়েসের মতো মসলা চা সবাই মিলে খাচ্ছে তখন একটু একটু করে সবাইকে ভূতের ভয় দেখানোর কারণটা জানা গেল। রমজান আলী আর তার বউয়ের এই বাগানবাড়ি ছাড়া থাকার কোনো জায়গা নেই। খবর পেয়েছে মালিক এটা বিক্রি করার চিন্তা করছে, তাই তারা ভেবেছে যদি এই বাগানবাড়িটাকে ভূতের বাড়ি হিসেবে দাঁড় করানো যায় তাহলে হয়তো আর কেউ কিনতে রাজি হবে না! সে জন্যে যখনই কেউ আসে তারা একবার ভূতের ভয় দেখিয়ে দেয়।
