টুনি আর টুম্পা যখন কান্নার শব্দ কোথা থেকে আসছে দেখার জন্যে পা টিপে টিপে এগিয়ে যাচ্ছে তখন ছোটাচ্চুর সাথে সাথে শান্তও ভূতের কাছে আবেদন করতে শুরু করেছে। সে অবশ্যি ছোটাচ্চুর মতো এত সুন্দর ভাষায় বলতে পারে না, তার কথাগুলো অনেক চাঁছাছোলা, কিন্তু ভূতের মনকে নরম করার জন্যে মনে হয় যথেষ্ট।
ঘরের কোনায় একটা বেসিন, টুনির মনে হলো এই বেসিনের কাছাকাছি কোনো জায়গা থেকে শব্দটা আসছে। বেসিনে কান পাততেই পুরো ব্যাপারটা পরিষ্কার হয়ে গেল। বেসিন থেকে পানি যাবার যে পাইপটা রয়েছে কান্নার শব্দটা সেখান থেকে আসছে। শুধু যে কান্নার শব্দ তা নয়, একটু আগে যে মাংস পোড়া গন্ধ পাওয়া যাচ্ছিল সেটাও এখান থেকে আসছে। অর্থাৎ এই পাইপটা নিচে যেখানে গিয়েছে সেখানে কেউ একটু আগে মাংস পুড়িয়েছে, সাথে ধূপের গন্ধের জন্যে একটু ধূপও দিয়েছে। এখন ভয় দেখানোর জন্যে মুখ লাগিয়ে কান্নার শব্দ করছে। মানুষটি কে হতে পারে সেটাও মোটামুটি অনুমান করা যায়, নিশ্চয়ই রমজান আলীর লাজুক বউ। এমনিতে লাজুক কিন্তু রাতের বেলা ভয় দেখানোর সময় তার লাজুক ভাবটা কেটে যায়।
টুনি টুম্পাকে ফিসফিস করে বলল, “নিচে থেকে এই পাইপে মুখ লাগিয়ে কেউ একজন কান্নার শব্দ করছে।”
“সত্যি?”
“হ্যাঁ, সত্যি। শুনতে পাচ্ছিস না?”
“শুনতে পাচ্ছি।”
টুনি বলল, “এখন তাকে ধরব।”
“কীভাবে ধরবে টুনি আপু?”
“এক্ষুনি দেখবি।”
টুনি তখন অন্ধকারের মাঝেই হাতড়ে হাতড়ে একটা বোতল বের করল। টুম্পার হাতে দিয়ে বলল, “নে এটা ধর।”
টুম্পা সাধারণত টুনিকে কিছু জিজ্ঞেস করে না, কিন্তু এবারে জিজ্ঞেস না করে পারল না, “এর ভিতরে কি টুনি আপু?”
“রং। হাজার পাওয়ার রং। যদি কারো গায়ে লাগায় সেটা পুরো এক সপ্তাহ থাকে।”
“সত্যি?”
“হ্যাঁ। টকটকে লাল।”
“কী করবে এটা দিয়ে?”
“এই পাইপ দিয়ে ঢালব, একটু একটু করে ঢাললে হবে না, একসাথে ঢালতে হবে। নিচে যেন হুড়হুড় করে একসাথে বের হয়। যে কান্নার শব্দ করছে তার মুখে যেন লাল রং লেগে যায়।”
‘কীভাবে একসাথে ঢালবে?”
টুনি একটু চিন্তা করে বলল, “একটা মগ্ন থাকলে হতো।”
“বাথরুমে মগ আছে।”
টুনি বলল, “তুই দাঁড়া আমি নিয়ে আসি।”
টুম্পা বলল, “না টুনি আপু। তুমি থাকো আমি নিয়ে আসি।”
“ভয় পাবি না তো?”
অন্ধকারে টুম্পা ফিক করে হাসল, বলল, “না টুনি আপু। এখন আর ভয় লাগছে না।”
ছোটাচ্চু আর শান্ত যখন করুণ গলায় তাদের ক্ষমা করার জন্যে প্রার্থনা করছে তখন টুম্পা অন্ধকারে পা টিপে টিপে বাথরুমে গিয়ে মগটা নিয়ে এলো। টুনি তখন সেই মগে হাজার পাওয়ারের সেই পাকা রংটা ঢেলে নিল। তারপর বেসিনের কাছে দাঁড়াল। যখন কান্নার শব্দটা খুব ভালোভাবে আসছে তখন টুনি হঠাৎ করে পুরো মগ ভর্তি রংটা ঢেলে দিল।
যতক্ষণ রংটা পাইপের ভেতর দিয়ে নিচে যাচ্ছিল ততক্ষণ কান্নার শব্দটা বন্ধ থাকল, কিন্তু নিচে হুড়হুড় করে বের হওয়ার পর আবার শব্দ শোনা গেল, তবে এবারে সম্পূর্ণ ভিন্ন শব্দ। কোনো একজন নারী কাতর কণ্ঠে আর্তনাদ করে উঠল, “হায় খোদা! এইটা কী? এইটা কী হলো? কী বের হয় এখান থেকে? আমার মুখে কী লাগল?”
টুনি তখন তার ব্যাগে হাত ঢুকিয়ে ছয় ব্যাটারির একটা বিশাল টর্চ লাইট বের করে সেটা জ্বালিয়ে দিতেই ছোটাচ্চু আর শান্তর করুণ আবেদন থেমে গেল। ঝুমু খালা বলল, “টর্চ লাইট!”
টুনি বলল, “হ্যাঁ।”
ছোটাচ্চু বলল, “তোর কাছে এত পাওয়ারফুল একটা টর্চ লাইট আছে আর তুই আমাদের বলছিস না কেন? আমরা অন্ধকারে বসে আছি।”
“ছোটাচ্চু, যদি ভূত ধরতে চাও তাহলে আমার সাথে চলো।”
ছোটাচ্চু বলল, “কী বলছিস তুই পাগলের মতো?”
“ছোটাচ্চু, তুমি নিচে গেলেই দেখবে। আমি যাচ্ছি তোমরা চাইলে আসো।”
টুম্পা কম কথা বলে, উত্তেজনায় সে পর্যন্ত কথা বলে ফেলল, “হ্যাঁ, ছোটাচ্চু। ভূতের মুখে রং লাগানো হয়েছে, এখন খালি ধরতে হবে!”
“তোরা কী বলছিস আমি কিছু বুঝতে পারছি না।”
“তোমাকে পরে বোঝাব। আমাদের হাতে সময় নাই। আমরা গেলাম। ঝুমু খালা তুমি যাবে?”
ঝুমু খালার সাহস ফিরে এলো, বলল, “একশ’বার যাব। ভূতের বাচ্চা ভূত, বান্দীর বাচ্চা বান্দীকে যদি আমি কিলিয়ে ভর্তা না বানাই।”
টুনি বলল, “তুমি শান্ত ভাইয়ার ব্যাটটা নিয়ে নাও। হাতে একটা অস্ত্র থাকা ভালো।”
যখন ছোটাচ্চু আর শান্ত দেখল সত্যি সত্যি অন্য সবাই ভূত ধরতে যাচ্ছে তখন তারাও পিছু পিছু নেমে এলো। দরজা খুলে বের হয়ে বিশাল টর্চ লাইটটা নিয়ে সবার আগে টুনি তার পিছনে টুম্পা তারপর ঝুমু খালা আর সবার পিছনে শান্ত আর ছোটাচ্চু প্রায় দৌড়াতে দৌড়াতে রমজান আলীর বাসার দিকে ছুটতে থাকে।
বাসাটা অন্ধকার, দেখে মনে হয় সবাই ঘুমিয়ে আছে। টুনি জানে সবাই এখন এখানেই আছে এবং খুব ভালোভাবেই জেগে আছে। টুনি দরজায় ধাক্কা দিয়ে বলল, “রমজান চাচা, দরজা খুলেন। তাড়াতাড়ি।”
ভেতরে কোনো শব্দ নাই। টুনি তখন আরো জোরে জোরে দরজা ধাক্কা দিল, বলল, “দরজা খুলেন।”
এবারেও কেউ দরজা খুলল না। ঝুমু খালা তখন হুংকার দিয়ে বলল, “দরজা খুলেন, তা না হলে কিন্তু খবর আছে।”
টুনি বলল, “পুলিশে খবর দিলে কিন্তু আপনার বিপদ আছে।”
ঝুমু খালা বলল, “বিপদ মানে মহাবিপদ। বাঘে ছুঁলে হয় আঠারো ঘা, পুলিশে ছুঁলে ছত্রিশ ঘা।”
