শান্ত বলল, “তেনারা কারা?”
ঝুমু খালা বলল, “রাত্রি বেলা তেনাদের নাম নেওয়া ঠিক না।”
“তাহলে কী করব?”
“আয়াতুল কুরসি পড়ো।”
“আমার তো মুখস্থ নাই।”
ছোটাচ্চু বলল, “আমার মোবাইলে রেকর্ড করা আছে।”
ঝুমু খালা বলল, “দেরি কইরেন না, চালান। তাড়াতাড়ি চালান।”
ছোটাচ্চু অন্ধকারে হাতড়ে হাতড়ে তার মোবাইল ফোন বের করে সেখানে রেকর্ড করে রাখা আয়াতুল কুরসিটা চালানোর চেষ্টা করল। কোথায় রেকর্ড করেছে মনে নেই, এখন ভয় আর উত্তেজনায় সেটা খুঁজে পাচ্ছে না, কিছু একটা টিপতেই বিকট সুরে হেভি মেটাল গান শুরু হয়ে গেল।
ঝুমু খালা বলল, “মনে হয় এই গান শুনলেও তেনারা ধারে-কাছে। আসবে না। কিন্তু আয়াতুল কুরসি নাই?”
“আছে আছে। খুঁজে পাচ্ছি না।” ছোটাচ্চু যখন তার মোবাইলে রেকর্ড করে রাখা আয়াতুল কুরসি খুঁজছে তখন হঠাৎ করে গাছের ঝাঁকুনিটা থেমে গেল। চারিদিকে একটা সুনসান নীরবতা, সেটা মনে হয় আরো বেশি ভয়ের। সবাই যখন নিঃশ্বাস বন্ধ করে বসে আছে তখন হঠাৎ দপদপ করে কয়েকবার জ্বলে উঠে একটা মোমবাতি নিভে গেল। ছোটাচ্চু চিৎকার করে বলল, “কী হলো? মোমবাতি নিভে গেল কেন?”
ঝুমু খালা বলল, “নিশানা ভালো না। দোয়া-দরুদ পড়েন।”
ঠিক তখন দ্বিতীয় মোমবাতিটাও দপদপ করে কয়েকবার জ্বলে ওঠে, তারপর মোমবাতির শিখাটা কমতে কমতে হঠাৎ করে পুরোপুরি নিভে যায়। পুরো ঘরটা অন্ধকার, শুধুমাত্র ভোলা জানালা দিয়ে বাইরের একটু আলো ঘরের ভেতর এসে মনে হয় ঘরের ভেতরের অন্ধকারটা আরো বাড়িয়ে দিচ্ছে। ঝুমু খালা ভয় পাওয়া গলায় বলল, “সাবধান। তেনারা কিন্তু ঘরের মাঝে ঢুকে গেছে।”
ছোটাচ্চু ভাঙা গলায় বলল, “কোন দিক দিয়ে ঢুকল?”
ছোটাচ্চুর প্রশ্নের উত্তর দেবার জন্যেই মনে হয় হঠাৎ করে জানালার একটা কপাট দড়াম করে নিজে নিজে বন্ধ হয়ে গেল। সবাই তখন একসাথে চিৎকার করে ওঠে। আর সাথে সাথে জানালার অন্য কপাটটা দড়াম করে বন্ধ হয়ে গেল। সবাই তখন ভয়ে আবার চিৎকার করে ওঠে।
তাদেরকে ভয় দেখানোর জন্যেই মনে হয় জানালাটা বন্ধ হয়ে আবার হঠাৎ খুলে গেল। টুনি ঠিক তখন হঠাৎ উঠে দাঁড়িয়েছে। ছোটাচ্চু আতঙ্কে চিৎকার করে উঠল, বলল, “কী হয়েছে টুনি? তুই উঠছিস কেন?”
“জানালাটা একটু দেখে আসি।”
ছোটাচ্চু চিৎকার করে বলল, তোর সাহস বেশি হয়েছে? চুপ করে বসে থাক।”
ও ঝুমু খালা বলল, “হ্যাঁ টুনি। চুপচাপ বসে থাকো। তুমি বুঝতে পারছ না তেনারা এখন এই ঘরে আছেন? একটা গন্ধ পাচ্ছ না?”
সত্যি সত্যি ঘরের ভেতরে কোথা থেকে জানি একটা পোড়া মাংসের গন্ধ হাজির হয়েছে। তার সাথে ধূপের মতো একটা গন্ধ। ঝুমু খালা ফিসফিস করে বলল, “মড়া পোড়ার গন্ধ। শ্মশানে এরকম গন্ধ হয়। ইয়া মাবুদ! এখন কী হবে?”
ছোটাচ্চু তখন ভাঙা গলায় বলল, “আমার মনে হয় ভালো করে রিকোয়েস্ট করলে চলে যাবে!”
শান্ত জিজ্ঞেস করল, “কাকে রিকোয়েস্ট করলে?”
“যিনি ঘরে এসেছেন।”
শান্ত বলল, “তাহলে রিকোয়েস্ট করো। দেরি করছ কেন?”
ছোটাচ্চু কেশে একটু গলা পরিষ্কার করে বলল, “হে বিদেহী আত্মা। আমরা না বুঝে আপনাদের আবাসস্থলে চলে এসেছি। আপনাদের শান্তিপূর্ণ জীবনে আমরা বিরক্তির সৃষ্টি করছি। সে জন্যে আমরা আন্তরিকভাবে দুঃখিত এবং লজ্জিত। আমরা আপনাদের কথা দিচ্ছি ভোরের আলো ফোঁটার সাথে সাথে আমরা আপনাদের এই আশ্রয়স্থল ছেড়ে চলে যাব। আপনারা আমাদের ক্ষমা করুন। আমাদের মার্জনা করুন। আমরা আর কখনোই আপনাদের জীবনে অনুপ্রবেশ করব না। আপনারা অনুগ্রহ করে আমাদের আর ভয়-ভীতি দেখাবেন না। আমাদের প্রতি ক্রোধ প্রকাশ করবেন না। আমাদের প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করবেন না। প্লিজ।”
ছোটাচ্চু নিঃশ্বাস নেবার জন্যে একটু থামল, ঠিক তখন সবাই একটা কান্নার শব্দ শুনতে পেল। ইনিয়ে-বিনিয়ে কাঁদছে, সেই কান্নার শব্দ বাইরে থেকে আসছে না, এই ঘরের ভেতর থেকে আসছে। মনে হচ্ছে ঘরের এক কোনায় একটি কমবয়সী মেয়ে বসে আকুল হয়ে কাঁদছে।
ঘরের সবাই পাথরের মতো স্থির হয়ে গেল। কান্নার শব্দটা একটু থেমে যায় তারপর আবার শুরু হয়ে যায় ইনিয়ে-বিনিয়ে করুণ একটা কান্না, সেটি শুনলে বুকের মাঝে কেন যেন ফাঁকা ফাঁকা লাগতে থাকে। ছোটাচ্চু কাঁপা কাঁপা গলায় আবার তার করুণ আবেদন শুরু করল, “হে বিদেহিনী। হে মহাত্মন। হে অশরীরী আত্মা। আপনার কান্নার সুর আমাদের হৃদয়কে বিদীর্ণ করে দিচ্ছে। আমাদের বুককে ভেঙে দিচ্ছে। যখন আপনি বেঁচে ছিলেন তখন হয়তো আপনার একটি দুঃখময়-বেদনাময় জীবন ছিল, হয়তো পৃথিবীর নির্মম মানুষের কেউ আপনার জীবনকে ছিনিয়ে নিয়েছে। আপনি হয়তো আমাদেরকে সেটি জানাতে চান। হে অশরীরী, হে বিদেহিনী…”
ছোটাচ্চু যখন করুণ স্বরে ভূতের কাছে তার আবেদন করে যাচ্ছে। তখন টুনি টুম্পাকে ফিসফিস করে বলল, “টুম্পা, তোর ভয় লাগছে?”
টুম্পা ফিসফিস করে উত্তর দিল, “হ্যাঁ।”
“কতটুকু?”
“অনেক।”
“ভয় পাবি না। ভয়ের কিছু নাই।”
“কেন?”
“আমি এখন এই ভূতটাকে ধরব।”
“ধরবে!” টুম্পা অবাক হয়ে বলল, “কীভাবে ধরবে?”
“প্রথমে খুঁজে বের করতে হবে কোথা থেকে কান্নার শব্দ আসছে। আয় আমার সাথে।”
“আমার ভয় করছে টুনি আপু।”
“ভয়ের কিছু নাই। আয়।”
