ছোটাচ্চু বলল, “গুড।”
রমজান আলী বলল, “যদি কারেন্ট চলে যায় আর মোমবাতি লাগে সেজন্যে মাঝখানের ঘরে টেলিভিশনের উপরে রেখে গেলাম। মোমবাতি আর দিয়াশলাই।“
ছোটাচ্চু জিজ্ঞেস করল, “মাঝখানের ঘরে কেন?”
রমজান আলী মুখ কাচুমাচু করে বলল, “কয়দিন আগে একজন মোমবাতি দিয়ে মশারিতে আগুন লাগিয়ে দিয়েছিল, সে জন্যে।”
ছোটাচ্চু বলল, “ঠিক আছে। আমরা এখন ঘুমিয়ে যাব। রাত্রে ভূত যদি উৎপাত না করে ঘুম থেকে ওঠার কোনো প্ল্যান নাই।”
মশারির ভেতর থেকে শান্ত বলল, “আমি আমার ব্যাট নিয়ে শুয়েছি। ভূত আসলে এমনি এমনি ছেড়ে দিব না।”
রমজান আলী বলল, “আপনাদের চিন্তার কোনো কারণ নাই। ভূত বলে কিছু নাই! যদি থাকে সেইটা হচ্ছে মানুষের মনে।”
ছোটাচ্চু বলল, “আমার মন নিয়ে কোনো সমস্যা নাই।”
রমজান আলী বলল, “আমি গেলাম, আপনারা ভিতর থেকে দরজায় ছিটকানি দিয়ে দেন।”
ঝুমু খালা নিচে নেমে দরজায় ছিটকানি দিয়ে প্রত্যেকটা দরজা জানালা পরীক্ষা করল। দরজাগুলো বন্ধ। জানালায় শক্ত লোহার শিক, ফাঁক দিয়ে ভূত চলে আসতে পারলেও চোর-ডাকাত আসতে পারবে না।
যখন সবার মনে হলো নিশুতি রাত হয়েছে তখন সবাই বিছানায় ঘুমাতে গেল। ছোটাচ্চু অবাক হয়ে দেখল ঘড়িতে মাত্র রাত দশটা বাজে। সারাদিন জার্নি করে এসেছে বলেই হোক, রাতের ভালো খাবারের জন্যেই হোক কিংবা ভূতের ভয়েই হোক, সবাই বেশ তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে গেল।
কতক্ষণ পর কেউ জানে না, সবার আগে ঘুম থেকে জেগে উঠল টুম্পা, ‘ধুম’ করে শব্দে মনে হলো বাড়িটা কেঁপে উঠেছে। টুম্পা লাফ দিয়ে উঠে বসে টুনিকে ধাক্কা দিল, “টুনি আপু!”
টুনি জেগে উঠে বলল, “কী হয়েছে?”
কী হয়েছে সেটা আর টুম্পাকে বলে দিতে হলো না, কারণ ঠিক তখন আবার ‘ধুম’ করে বিকট একটা শব্দ হলো।
শব্দের কারণটাও এবারে অনুমান করা গেল। বাড়িটায় টিনের ছাদ, সেই ছাদে কেউ ঢিল মারছে। তৃতীয় চিলটা পড়ার পর অন্য সবাই ঘুম থেকে জেগে উঠল। ঝুমু খালা মশারি থেকে বের হয়ে কোমরে শাড়ির আঁচলটা বেঁধে বলল, “কোন বান্দীর পুলা ঢেলা মারে?”
টুম্পা ভয়ে ভয়ে বলল, “ভূত?”
ঝুমু খালা বলল, “ভূতে কোনোদিন ঢেলা মারে না। ঢেলা মারে মানুষ।”
তখন চতুর্থ ঢিলটা এসে পড়ল, এটার সাইজ নিশ্চয়ই অনেক বড়, কারণ মনে হলো পুরো বাড়িটা কেঁপে উঠল। সেই বিকট শব্দের সাথে সাথে ছোটাচ্চু আর শান্তও সমান জোরে চিৎকার করে উঠল, তারপর দুপদাপ শব্দ করে টুনিদের ঘরে ছুটে এলো। শান্ত তার হাতে ব্যাটটা ধরে রেখেছে আর ছোটাচ্চু দুই হাত দিয়ে তার তাবিজটা ধরে রেখেছে।
ছোটাচ্চু ঘরে ঢুকে ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে বলল, “কোনো ভয় নাই। কোনো ভয় নাই।”
ঝুমু খালা বলল, “হ্যাঁ, কেউ ভয় পাবা না। এইটা ভূতের কাম না, এইটা হচ্ছে মানুষের কাম। বদ মানুষের কাম। ঢেলা মারতে মারতে যখন হাতে বেদনা হবে তখন ঢেলা মারা বন্ধ করে বাড়িতে যাবে।”
ঝুমু খালার কথা শেষ হবার সাথে সাথে দুইটা বড় বড় ঢিল ছাদে এসে পড়ল আর হঠাৎ করে ইলেকট্রিসিটি চলে গিয়ে চারিদিক অন্ধকার হয়ে গেল। শান্ত চিৎকার করে বলল, “কারেন্ট চলে গেছে।”
ছোটাচ্চু কাঁপা গলায় বলল, “জানি।”
শান্ত বলল, “অন্ধকার চারিদিক।”
ছোটাচ্চু বলল, “হ্যাঁ, দেখেছি।”
শান্ত ভয় পাওয়া গলায় বলল, “এখন কী করব?”
“লিভিং রুমে টেলিভিশনের উপরে মোমবাতি আছে।”
ঝুমু খালা বলল, “সবাই চলো। মাঝখানের ঘরে সবাই একসাথে থাকি।”
ছোটাচ্চু বলল, “হ্যাঁ। হ্যাঁ। সবাই একসাথে।”
সবাই হাতড়াতে হাতড়াতে এগুতে থাকে। এর মাঝে টুনি অন্ধকারের মাঝেই তার ব্যাগটা নিয়ে নেয়। এর মাঝে তার দরকারি জিনিসপত্র আছে।
মাঝখানের ঘরে গিয়ে সত্যি সত্যি টেলিভিশনের উপরে দুইটা মোমবাতি পাওয়া গেল। মোমবাতিরুপাশে একটা ম্যাচও রাখা আছে। ছোটাচ্চু মোমবাতি দুটো জ্বালিয়ে ঘরের মাঝখানে বসিয়ে দিল। অন্ধকারে একধরনের আতঙ্ক হচ্ছিল। মোমবাতির আবছা আলোতে সেই আতঙ্ক না কমে কেমন যেন আরো বেড়ে গেল। দেওয়ালে তাদের বড় বড় ছায়া পড়েছে। সেই ছায়াগুলো যখন হঠাৎ হঠাৎ করে নড়তে থাকে তখন নিজেরাই নিজের ছায়া দেখে চমকে চমকে ওঠে।
সবাই ঘরের মেঝেতে গোল হয়ে বসেছে। ছোটাচ্চু ডান হাত দিয়ে তার তাবিজটা ধরে রেখেছে। ঝুমু খালা যদিও বলছে এটা ভূতের কাজ নয়, কোনো পাজি মানুষ ভয় দেখানোর চেষ্টা করছে, তারপরও ছোটাচ্চু কোনো ঝুঁকি নিল না, শক্ত করে তাবিজটা ধরে রাখল।
এভাবে বেশ কিছুক্ষণ বসে থাকার পর হঠাৎ তারা শুনল একটা গাছের ডাল হঠাৎ করে নড়তে শুরু করেছে। খোলা জানালা দিয়ে আবছা আবছা দেখা যায় আশেপাশে সব গাছ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, শুধু একটা গাছের একটা ডাল ভীষণভাবে দুলছে। ঝুমু খালা বলল, “মনে হয় বান্দর।”
ছোটাচ্চু বলল, “বানর? বানর কোথা থেকে এসেছে?”
শান্ত ভয় পাওয়া গলায় বলল, “বানর না, এটা নিশ্চয়ই ভূত।”
গাছের ডালটা যেভাবে হঠাৎ করে নড়তে শুরু করেছিল ঠিক সেভাবে হঠাৎ করে থেমে গেল। যখন সবাই একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলার চেষ্টা করছে তখন হঠাৎ করে অন্য পাশের আরেকটা গাছের একটা ডাল দুলতে থাকে। একটু বাতাস নেই, একটা গাছের পাতাও নড়ছে না, তার মাঝে শুধু একটা গাছের একটা ডাল এভাবে নড়ছে, দেখে সবার বুক কেঁপে ওঠে। ঝুমু খালা পর্যন্ত নার্ভাস হয়ে গেল, কাঁপা গলায় বলল, “ইয়া মাবুদ! মনে হয় তেনারাই আসছেন!”
