“তার মানে আমাদের মেইন সুইচটা খুঁজে বের করতে হবে। ভূতকে প্রথমে মেইন সুইচ অফ করতে হবে। আয় এটা খুঁজে বের করি।”
টুনি টুম্পাকে নিয়ে বাড়িটার চারপাশে ঘুরে ঘুরে পিছন দিকে একটা ছোট ঘর খুঁজে বের করল, এর ভিতরে মিটার এবং তার পাশে কয়েকটা সার্কিট ব্রেকার। টুনি কিছুক্ষণ সেগুলোর দিকে তাকিয়ে থেকে টুম্পাকে বলল, “তুই বাইরে পাহারা দে। যদি দেখিস কেউ আসছে তাহলে শব্দ করে কাশবি।”
অন্য যে কেউ হলে জিজ্ঞেস করত টুনি ভিতরে কী করবে, টুম্পা জিজ্ঞেস করল না। সময় হলেই সে নিজের চোখে দেখবে। টুনি আপুর উপরে তার অনেক বিশ্বাস।
টুম্পাকে কাশতে হলো না, টুনি কিছুক্ষণের মাঝেই বের হয়ে এলো।
পুরো বাড়িটা চক্কর দিতে দিতে তারা বাড়ির পিছনে হাজির হলো। দুই পাশের দুটি গাছের ডালের সাথে একটা দড়ি বেঁধে সেখানে কাপড় শুকাতে দিয়েছে। একটা শাড়ি, একটা লুঙ্গি, দুইটা টি-শার্ট, একটা ব্লাউজ। টুনি বলল, “এই কাপড়গুলো দেখেই বুঝতে পারবি এই বাড়িতে কয়জন কী রকম মানুষ থাকে।”
“কীভাবে?”
শাড়ি-ব্লাউজ দেখে বোঝা যাচ্ছে একজন মহিলা আছে। শাড়িটা রঙিন, তার মানে কমবয়সী মহিলা। আমাদের কেয়ারটেকার রমজান আলীর বউ। লুঙ্গিটা নিশ্চয়ই রমজান আলীর। টি-শার্ট দেখেই বোঝা যাচ্ছে স্কুল-কলেজের ছেলে আছে। এটা হচ্ছে রমজান আলীর শালী। কোনো ছোট ছেলে-মেয়ের জামা-কাপড় নাই, তার মানে বাচ্চা-কাচ্চা নাই।”
টুম্পা চমৎকৃত হলো, বলল, “টুনি আপু, তুমি জিনিয়াস!”
“এইটা জিনিয়াস না। যদি ভূতকে ধরতে পারি তাহলে বলিস জিনিয়াস।”
“ভূতকে ধরে কী করবে?”
“সেটা নির্ভর করে ভূতের সাইজের উপর। ছোটখাটো হলে বোতলে ভরে নিয়ে যাব।”
টুম্পা কথা বলে কম, হাসে আরো কম। এবারে টুনির কথা শুনে সে হি হি করে হেসে উঠল।
আরেকটু হাঁটতেই টুনি আর টুম্পা কেয়ারটেকার রমজান আলীর বাড়িটা দেখতে পেল। তকতকে একটা বাসা, বাসার সামনে সবজির বাগান। তারা আরেকটু এগিয়ে যায়, একটা জানালা দিয়ে একটা বউ বাইরে তাকিয়ে ছিল, টুনি আর টুম্পাকে দেখে সরে গেল।
টুনি বলল, “আয় যাই। এই বউটা লাজুক, আমাদের সাথে কথা বলতে চায় না।”
দুজনে আবার বাগানবাড়িটা ঘুরে ঘুরে দেখে। টুম্পার চোখে এটা পুরানো একটা বাড়ি ছাড়া আর কিছু না। কিন্তু টুনির চোখে মনে হয় আরো অনেক কিছু ধরা পড়েছে, সে মাঝে মাঝেই কিছু একটা দেখে সবকিছু বুঝে ফেলার মতো মাথা নাড়তে থাকে। কী দেখে মাথা নাড়ছে টুম্পা জানার চেষ্টা করে না–তাকে জানানোর মতো কিছু হলে টুনি নিজেই তাকে জানিয়ে দেবে।
.
সন্ধ্যে হওয়ার পর শান্ত বলল, “শুধু শুধু এখানে এসে সময় নষ্ট। এখানে কিছুই করার নাই।”
ছোটাচ্চু জিজ্ঞেস করল, “তুই কী করতে চাচ্ছিস?”
“সেটা জানি না। তুমি বলেছিলে এখানে ভূত আছে। এখন রমজান চাচা বলছে ভূত নাই। ভূত যদি না থাকে তাহলে এসে লাভ কী?”
টুনি বলল, “ভূত তো আর রমজান চাচার পোষা ভূত না।”
“মানে?”
“রমজান চাচা না বললেই ভূত থাকবে না কে বলেছে? থাকতেও তো পারে।”
শান্ত ভুরু কুঁচকে বলল, “তোর কী মনে হয়? ভূত আছে?”
টুনি উত্তর দেবার আগেই ঝুমু খালা বলল, “আছে।”
“আছে?” শান্ত চমকে উঠে বলল, “তুমি কেমন করে জানো?”
“বাতাসটা টের পাও না?” “বাতাস? ভূতের বাতাস আছে নাকি?”
“হ্যাঁ।”
“সেটা কী রকম?”
“ঠাণ্ডা ঠাণ্ডা। দেখবা হঠাৎ একটু ঠাণ্ডা বাতাস গায়ে লাগবে। তখন বুঝবা তেনারা আছে আশেপাশে।”
“তুমি টের পাচ্ছ?”
ঝুমু খালা বলল, “বাড়িটাতে ঢুকেই আমার মনে হয়েছে এইখানে কিছু একটা আছে।”
শান্ত হঠাৎ করে শান্ত হয়ে গেল। অল্পতেই চমকে উঠতে লাগল। যেখানে সবাই বসে আছে সেখান থেকে নড়ল না।
.
রাতের খাওয়াটা খুব ভালো হলো। রমজান আলী ভুল বলেনি, তার বউ আসলেই খুব ভালো রান্না করে। টুনি ভেবেছিল নানা রকম আলোচনার পর তাদের সেই পুরাতন ভাত-মাছ-ডালই খেতে হবে। কিন্তু দেখা গেল খাবার মেন্য খুবই চমকপ্রদ-পরাটা এবং শিক কাবাব। পাশাপাশি সবজি এবং ঘন ডাল, তার সাথে দই এবং মিষ্টি। পরাটাগুলো খুবই ভালো, মোটেও তাদের বাসার তৈরি পরাটার মতো না। খাওয়া শেষে চা এবং কফি। চা মোটেও সাধারণ চা নয়, মসলা দেয়া একধরনের পায়েসের মতো চা। খেয়ে টুম্পা পর্যন্ত মুগ্ধ হয়ে গেল। ঝুমু খালা খাওয়া শেষে রমজান আলীকে বলল, “আপনার বউয়ের রান্নার হাত খুব ভালো। এই সব বড়লোকি রান্না সবাই জানে না। কোথায় শিখেছে?”
কেয়ারটেকার রমজান আলী বলল, “এই তো!”
“বউয়ের সাথে ভালো ব্যবহার করবেন। আপনার বউ চলে গেলে এইখানে আপনার চাকরিও নট হয়ে যাবে!”
রমজান আলী কিছু বলল না।
.
খাওয়ার পর সবাই আবিষ্কার করল কারো কিছু করার নেই। শুধু বুদ্ধিমান টুম্পার কাছে মোটা একটা গল্পের বই। সে মশারির ভেতর ঢুকে সেটা মন দিয়ে পড়ছে। অন্যেরা ঘরের ভেতরে এদিক-সেদিক একটু হাঁটাহাঁটি করল, টেলিভিশনটা চালু করার চেষ্টা করল। খুবই আবছাভাবে বিটিভির চাষবাসসংক্রান্ত একটা অনুষ্ঠান মাঝে মাঝে শোনা গেল, কিন্তু সেটা দেখে সময় কাটানো সম্ভব না। শান্ত কিছুক্ষণ গজগজ করল তারপর বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়ল।
রমজান আলী সবার ঘরে পানির বোতল আর গ্লাস দিয়ে চলে যাবার সময় ছোটাচ্চুকে বলে গেল, “এখানে লোডশেডিং হয় দিনের বেলা। রাত্রে কারেন্ট যায় না।”
