“এর আগে কারা এসেছিল, রাতে নাকি তারা ভূতের ভয় পেয়েছে?”
মানুষটা মুখ গম্ভীর করে বলল, “সেটা আমি জানি না, আমাকে কিছু বলে নাই। কোনো পার্টি মনে হয় বাড়ি কিনতে এসেছিল, কম দামে কিনতে চায় তাই এই কথা ছড়িয়েছে। ভেবেছে ভূতের কথা বললে বাড়ি সস্তায় দিবে।”
বাড়িটাতে আসলে ভূতের কোনো উৎপাত নেই শুনে ছোটাচ্চু খুব খুশি হয়ে উঠল। বলল, “যদি ভূতের কোনো সমস্যা না থাকে তাহলে আমাকে খামাখা কেন টেনে আনল?”
“এসেছেন যখন দুই-এক দিন থেকে বেড়িয়ে যান! ভালো লাগবে!”
“সেইটা অবশ্যি ঠিকই বলেছেন। এরকম সুন্দর জায়গায় দুই-এক দিন থাকলে আসলেই খুব ভালো লাগবে। কিন্তু সেই কপাল তো নাই। আমলের বাধার মতো, আলমারিরনে সুন্দর সোফায়
সবাই ব্যস্ত, আজকের রাতটা শুধু থাকতে পারব, কালকেই চলে যেতে হবে।”
“ঠিক আছে, এক দিনই না হয় থাকলেন। আপনাদের ব্যাগগুলো দেন, ভিতরে নিয়ে যাই।”
ছোটাচ্চু বলল, “আমাদের এমন কিছু ব্যাগ-স্যুটকেস নাই, নিজেরাই নিতে পারব।”
তারপরও কেয়ারটেকার মানুষটা টুম্পা আর টুনির ব্যাগ দুটো দুই হাতে করে ভিতরে নিয়ে গেল।
বাইরে যেরকম গা ছমছমে ভাব আছে, ভিতরে সেরকম নেই। মাঝখানে একটা ড্রইংরুমের মতো, সেখানে সুন্দর সোফা। এক পাশে একটা লাইব্রেরির মতো, আলমারির ভেতরে অনেক বই, পুরানো আমলের বাঁধাই। মোটা মোটা বইয়ের গায়ে সোনালি রং দিয়ে বইয়ের নাম লেখা, বেশিরভাগই ইংরেজি। অন্যপাশে ডাইনিং রুম। বড় ডাইনিং টেবিল ঘিরে পুরানো আমলের কাঠের চেয়ার।
ঘরের মাঝখান দিয়ে চওড়া সিঁড়ি, ওপরে উঠে গেছে। দোতলায় দুই পাশে দুটি বেডরুম, প্রত্যেকটা বেডরুমে দুটি করে পরিপাটি বিছানা। বেডরুমের সাথে লাগানো বাথরুম। বাথরুমে পরিষ্কার টাওয়েল, নতুন সাবান। দুই বেডরুমের মাঝখানে একটা লিভিং রুম। সেখানে বসার জন্য সোফা, কফি টেবিল। কফি টেবিলের উপর কিছু পুরানো ম্যাগাজিন। লিভিং রুমের এক পাশে একটা বেসিন। ট্যাপ খোলার পর ঘর্ঘর একটু শব্দ করে পানি বের হয়ে এলো। ঘরের অন্য কোনায় একটা পুরানো টেলিভিশন।
শান্ত প্রথমেই ডান দিকের বেডরুমের জানালার কাছে সবচেয়ে ভালো বিছানাটা দখল করে নিল। অন্যটাতে ছোটাচ্চু। বাম দিকের বেডরুমের একটাতে ঝুমু খালা অন্যটাতে টুনি আর টুম্পা। সবাই হাত মুখ ধুয়ে নিচে নেমে আসে, ডাইনিং টেবিলে চা-নাস্তা দেয়া হয়েছে। ড্রাইভার তাড়াতাড়ি করে কিছু খেয়ে মাইক্রোবাস নিয়ে ফিরে চলে গেল। পরের দিন সকালবেলা তাদের নিয়ে যেতে আসবে। তাবিজ হারানোর পর থেকে তার মুখের দিকে তাকানো যায় না।
ডাইনিং টেবিলে বসে খেতে খেতে কেয়ারটেকারের সাথে কথাবার্তা হলো। তার নাম রমজান আলী। এই বাগানবাড়ির পিছনেই একটা ছোট দোচালায় সে তার বউকে নিয়ে থাকে। তাদের বাচ্চা-কাচ্চা নেই, ছোট শালা তাদের সাথে থাকে। ছোট শালা কলেজে পড়ে, বি.এ. পরীক্ষা দিবে। ডাইনিং টেবিলে যে নাস্তা দেয়া হয়েছে সেগুলো তার বউ তৈরি করেছে। বউ ভালো রান্না করতে পারে, এই বাগানবাড়িতে যখন কেউ আসে তখন তার বউ রান্না করে। স্বামী-স্ত্রী এই দুজনে মিলে তারা বাগানবাড়িটা দেখে-শুনে রাখে। কেউ বেড়াতে না এলে তাদের আলাদা কাজ নেই কিন্তু এই বড় বাড়িটা দেখে-শুনে রাখাই অনেক কাজ।
খাওয়া শেষে রমজান আলী ডাইনিং টেবিল থেকে কাপ-পিরিচ বাটি-প্লেট তুলে নিতে নিতে জিজ্ঞেস করল, “রাত্রে কী খাবেন?”
শান্ত বলল, “পিতজা। আপনার বউ পিতজা বানাতে পারে?”
রমজান আলী থতমত খেয়ে বলল, “জে না। এটার তো নামও শুনে নাই।”
শান্ত হতাশ হয়ে বলল, “তাহলে আর লাভ কী হলো?”
রমজান আলী বলল, “এখানে ভালো মাছ পাওয়া যায়—”
শান্ত বলল, “নো মাছ। বাসায় আম্মু জোর করে মাছ খাওয়ায়। এখানে মাছ খাব না।”
“তাহলে মুরগির মাংস?”
শান্ত বলল, “দেশি মুরগি? অরিজিনাল বাংলাদেশি পাসপোর্ট?”
খাওয়ার মেন্যু নিয়ে আলোচনা যখন আরো জটিল হয়ে উঠল তখন টুনি উঠে পড়ল, তার দেখাদেখি টুম্পা। খাওয়া নিয়ে তার মাথাব্যথা নেই, যত আলোচনা হোক শেষ পর্যন্ত খেতে হবে ভাত, সবজি, ডাল সাথে মাছ না হয় মাংস! এর মাঝে এত আলোচনার কী আছে?
টুনিকে উঠতে দেখে ছোটাচ্চু জিজ্ঞেস করল, “কই যাস?”
টুনি বলল, “যাই একটু ঘুরে দেখি।” দিনের আলো থাকতে থাকতে সে পুরো এলাকাটা দেখতে চায় সেটা আর বলল না।
ছোটাচ্চু বলল, “অপরিচিত জায়গা, বেশি দূর যাবি না।”
টুনি মাথা নাড়ল, সে শুধু শুধু বেশি দূর কেন যাবে? এটি হচ্ছে বড় মানুষদের অর্থহীন অপ্রয়োজনীয় উপদেশ।
বাগানবাড়ি থেকে বের হয়ে টুনি পুরো বাড়িটা একবার ভালো করে দেখে। টুম্পা জিজ্ঞেস করল, “কী দেখো টুনি আপু?”
“এই বাড়িটাতে ইলেকট্রিসিটি আছে। যে বাড়িতে ইলেকট্রিসিটি থাকে সেখানে ভূত কীভাবে আসবে? ভূতকে আসতে হয় অন্ধকারে। কোনোদিন শুনেছিস দিনের বেলা ভূত এসেছে? শুনেছিস যখন অনেক আলো তখন ভূত এসেছে?”
টুম্পা মাথা নাড়ল, সে আসলে কখনোই ভূত নিয়ে কিছু শুনেনি। আলোতে এসেছে শুনেনি, অন্ধকারে এসেছে সেটাও শুনেনি।
টুনি বলল, “তার মানে হচ্ছে এই বাসায় ভূত আসতে হলে প্রথমে ইলেকট্রিসিটিটা বন্ধ করতে হবে। তার মানে বুঝেছিস?”
টুম্পা মাথা নেড়ে জানাল, সে বুঝেনি।
