একটা বড় বাসকে ওভারটেক করে ড্রাইভার যখন গুলির মতো সামনে চলে গেল, ঝুমু খালা সিট ধরে কোনোমতে নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, “ড্রাইভার সাহেব।”
“কী হলো?”
“আপনার আসলে এরোপ্লেনের পাইলট হবার কথা ছিল। কপালের দোষে হয়েছেন গাড়ির ড্রাইভার।”
ড্রাইভার কোনো কথা না বলে বিষ দৃষ্টিতে একবার ঝুমু খালার দিকে তাকাল। ঝুমু খালা বলল, “আপনারে মনে হয় কেউ এখনো বলে নাই, আপনার গাড়ির কিন্তু দুই দিকে পা নাই। যত জোরেই চালান। এইটা কিন্তু আকাশে উড়বে না।”
ড্রাইভার মুখ খিঁচিয়ে বলল, “আপনার মুখ খুব খারাপ।”
ঝুমু খালা বলল, “গরিবের পরিবার। জন্মের সময় বাপে মধু কিনে আনতে পারে নাই। বাড়িতে কাঁচা মরিচ ছিল, মুখে সেইটাই দিছিল। তাই আমার মুখ এত খারাপ। মুখে মিষ্টি কথা আসে না।”
“মিষ্টি কথা না আসলে চুপ করে থাকেন। ঝাল কথা বলতে হবে কেন?”
“তার কারণ গাড়ি একসিডেন্ট হলে আপনি একলা মরবেন না তার সাথে আমরা সবাই মরব। আপনি মরতে চান মরেন, বাড়িতে গিয়ে গলায় দড়ি দেন। কিন্তু আমাদের সবাইরে আপনি মারতে পারবেন না।”
ড্রাইভার গলা উঁচিয়ে বলল, “আপনারে কতবার বলব আমার গাড়িতে চাক্কা পীরের তাবিজ আ-” কথা বলার সময় চোখের কোনা দিয়ে তাবিজটা একনজর দেখতে গিয়ে যেই আবিষ্কার করল রিয়ার ভিউ মিররে ঝোলানো তাবিজটা নেই, তাই সে কথা শেষ না করে মাঝখানে থেমে গেল। হেঁচকি তোলার মতো শব্দ করে বলল, “তা-তা-তাবিজ! আমার তাবিজ!”
সবাই তখন দেখল যেখানে একটা তাবিজ ঝুলছিল সেখানে কিছু নেই। কীভাবে সেটা ঘটেছে সেটা এখন টুম্পা হঠাৎ করে বুঝে গেল। সে টুনির দিকে তাকাল, টুনি চোখ টিপে মুচকি হাসল।
ঝুমু খালা চিৎকার করে বলল, “আপনার তাবিজ কই গেল?
ড্রাইভার খুব তাড়াতাড়ি গাড়িকে থামিয়ে এনে রাস্তার পাশে দাঁড়া করিয়ে গাড়ির ভিতরে আঁতিপাতি করে খুঁজতে থাকে। হাহাকারের মতো শব্দ করে বলল, “আমার তাবিজ! আমার চাক্কা পীরের তাবিজ!”
ঝুমু খালা বলল, “আপনি বলছিলেন আপনার তাবিজ জিন্দা। সেই জন্যে মনে হয় উড়ে উড়ে চলে গেছে।”
সবাই ভাবল ঝুমু খালার টিটকারি শুনে ড্রাইভার বুঝি রেগে উঠবে। ড্রাইভার রাগল না, চোখে-মুখে গভীর একটা দুঃখের ভাব ফুটিয়ে বলল, “আপনি আমার সাথে মশকরা করছেন। কিন্তু এই তাবিজ আসলেই জিন্দা। বিনা অজুতে এই তাবিজ ছুঁতে হয় না। এই তাবিজের অপমান করলে তাবিজ গায়েব হয়ে যায়। আপনারা সবাই এই তাবিজের বেইজ্জতি করেছেন, তাবিজ গোসা করে গায়েব হয়ে গেছে। হায়রে হায়!”
ঝুমু খালা বলল, “আমরা কখন আপনার তাবিজের বেইজ্জতি করলাম?”
“একটু পরে পরে বলেছেন একসিডেন্ট হবে একসিডেন্ট হবে, সেইটা তাবিজের বেইজ্জতি হলো না?”
ছোটাচ্চু একটু বিরক্ত হয়ে বলল, “ঠিক আছে ড্রাইভার সাহেব বেইজ্জতি হলে হয়েছে। এখন রওনা দেন।”
শান্ত বলল, “এখন আপনার জিন্দা তাবিজ নাই, তাই আস্তে আস্তে চালাবেন।”
ড্রাইভার ফোঁস করে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “নিশানা খুব খারাপ। চাক্কা পীরের তাবিজ নাই, ভালো-মন্দ কিছু একটা না হয়ে যায়!”
ঝুমু খালা বলল, “হবে না। আপনি ড্রাইভার ভালো, এতক্ষণ গাড়ি উড়ায়ে নিচ্ছিলেন, এখন রাস্তার উপর দিয়ে নিবেন।”
ড্রাইভার মুখটা কালো করে তার সিটে বসে গাড়ি স্টার্ট করল। গাড়ি স্টার্ট দিয়ে চালিয়ে নিয়ে গেল খুবই সাবধানে, কোনো বিপজ্জনক ওভারটেক করল না, বিপরীত দিক থেকে ছুটে আসা কোনো গাড়িকে হেড লাইট জ্বালিয়ে-নিভিয়ে চোখ রাঙানি দিল না। কোনো বাস কিংবা ট্রাকের একেবারে গা ঘেঁষে পার হলো না, হর্ন বাজিয়ে কারো কান ঝালাপালা করল না। এক কথায় বলা যায়, সবাই খুবই শান্তিতে পুরো রাস্তা পার করল।
বেশি সাবধানে গাড়ি চালানোর কারণে পৌঁছাতে দেরি হয়ে গেল, যখন শেষ পর্যন্ত কাঁচা রাস্তা দিয়ে ঝাঁকুনি খেতে খেতে মাইক্রোবাসটি ভূতের বাড়ি পৌঁছেছে তখন বিকেল হয়ে গেছে।
এই বাগানবাড়িটি আগে কেউ দেখেনি, সবাই এটাকে ভূতের বাড়ি বলে এসেছে। বাগানবাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে মনে হলো এটা বুঝি আসলেই একটা ভূতের বাড়ি। পুরানো একটা দোতলা বাসা, চারপাশে বড় বড় গাছ দিয়ে ঢাকা। বড় বড় গাছের কারণে দিনের বেলাতেই আবছা অন্ধকার। সামনে বড় বারান্দা, ভারী কাঠের পুরানো আমলের দরজা-জানালা। পুরানো দেয়াল থেকে জায়গায় জায়গায় পলেস্তারা খসে পড়েছে। দালান বেয়ে বেয়ে কিছু কিছু লতানো গাছ উঠে গেছে। দালানটির ঝকঝকে-তকতকে ভাবটি নেই কিন্তু সে জন্যে এটাকে খারাপ লাগছে না, বরং এর মাঝে অন্য একধরনের সৌন্দর্য ফুটে উঠেছে।
গাড়ির শব্দ শুনে পিছন থেকে একজন মাঝবয়সী মানুষ হাজির হলো। মনে হয় এই বাগানবাড়ির কেয়ারটেকার। ছোটাচ্চুকে একটা সালাম দিয়ে বলল, “আমার স্যার ফোন করে আমাকে বলেছেন আপনারা দুপুরে আসবেন।”
“হ্যাঁ। আসতে একটু দেরি হয়ে গেল।”
“স্যার বলেছিলেন আপনারা ডিটেকটিভ। এখন তো দেখি সবাই পোলাপান।”
“আমি এসেছি ডিটেকটিভের কাজে। আর অন্যেরা আসছে বেড়াতে।”
মানুষটা মাথা নেড়ে বলল, “ভালো। ভালো। খুব ভালো। এই জায়গাটা বেড়ানোর জন্যে খুব ভালো।”
ছোটাচ্চু বলল, “কিন্তু শুনেছি এই বাড়িটাতে নাকি ভূতের উপদ্রব আছে?”
মানুষটা দাঁত বের করে হেসে বলল, “এই যুগে কেউ ভূত বিশ্বাস করে? ওগুলো বাজে কথা। এই সুন্দর জায়গাটার একটা বদনাম দেবার জন্যে লোকজন এই কথা ছড়ায়।”
