ড্রাইভার বলল, “ভয় পাবেন না স্যার। আমার গাড়িতে চাক্কা পীরের তাবিজ! আমেরিকা থেকে গাড়ির কোম্পানির মালিক নিজে আসছিল চাক্কা পীর বাবার সাথে দেখা করতে।”
“কেন?”
“এই তাবিজ নিতে। গাড়ির কোম্পানি গাড়ি তৈরি করার সময় গাড়ির ভিতরে পাকাপাকিভাবে তাবিজ লাগিয়ে দিবে। গাড়ি আর একসিডেন্ট হবে না। চাক্কা পীর বাবা রাজি হয় নাই।”
“কেন রাজি হয় নাই?”
“চাক্কা পীর বাবা খালি নিজের দেশের খেদমত করতে চায়।”
ড্রাইভার বলল, “এই দেশের সরকার থেকে মন্ত্রী চাক্কা পীর বাবার কাছে আসছিল।”
“কেন?”
“চাক্কা পীর বাবার দোয়া নিতে। চাক্কা পীর বাবা মন্ত্রীরে কী বলেছেন জানেন?”
“কী বলেছেন?”
“ড্রাইভিং লাইসেন্সের সাথে সাথে সবাইরে একটা তাবিজ দিতে। তাহলে এই দেশে আর একসিডেন্ট হবে না।”
“মন্ত্রী রাজি হয়েছে?”
“জে রাজি হয়েছে। মনে হয় পার্লামেন্টে এইটা নিয়ে আলোচনা করে আইন পাস হবে।”
“ও।”
এরকম সময়ে টুম্পা বলল, “ছোটাচ্চু বমি করব।”
টুম্পা কম কথার মানুষ, তাই তার কথাকে খুব গুরুত্ব দিয়ে নেয়া হয়। বিশেষ করে যখন সে বমি করতে চায় এবং সত্যি সত্যি বমি করলে সেটা ছোটাছুর ঘাড়ে করা হবে। ড্রাইভারের একসিডেন্ট থেকে রক্ষা পাওয়ার তাবিজ আছে কিন্তু বমি ফেকে রক্ষা পাওয়ার কোনো তাবিজ নেই, তাই ছোটাচ্চু যখন বলল, “ড্রাইভার সাহেব গাড়ি থামান। একজন বমি করবে।” তখন ড্রাইভার সাথে সাথে তার গাড়ি থামাল।
যে বমি করবে তার গাড়ি থেকে তাড়াতাড়ি নামার কথা কিন্তু টুম্পাকে খুব তাড়াহুড়া করতে দেখা গেল না, সে খুব ধীরে-সুস্থে নামল। নেমেই বমি করার কোনো লক্ষণ দেখাল না, এদিক-সেদিক তাকাতে লাগল। ঝুমু খালাও দরজা খুলে নেমে টুম্পার কাছে এসেছে, জিজ্ঞেস করল, “কী হলো বমি করবে না?”
“করব।”
“করো।”
টুম্পা বলল, “এই জায়গাটা ময়লা, আমি এইখানে বমি করব না।” বলে সে বমি করার জন্যে পরিষ্কার জায়গার খোঁজে সামনের দিকে হাঁটতে লাগল।
বিষয়টা সবার কাছে খানিকটা বিচিত্র মনে হলেও আসলে এটা মোটেও বিচিত্র না, কারণ বমি করার এই নাটকটা এমনি এমনি হয়নি। ড্রাইভার যখন তার চাক্কা পীরের তাবিজের ওপর ভরসা করে মাইক্রোবাসটাকে রীতিমতো উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছিল তখন টুনি টুম্পাকে ফিসফিস করে বলল, “টুম্পা, তোকে একটা কাজ করতে হবে।”
“কী কাজ?”
“বমি করতে হবে।”
“কিন্তু আমার বমি পায় নাই।”
টুম্পা কেউ যেন শুনতে না পায় সেভাবে ফিসফিস করে বলল, “তোর আসলে বমি করতে হবে না। তুই খালি ভান করবি। আগে বলবি তোর বমি করতে হবে তারপর গাড়ি থেকে নামবি। ধীরে-সুস্থে নামবি। নেমে সময় নিবি। যখন আমি ডাকব তখন গাড়িতে ঢুকবি। এর আগে ঢুকবি না।”
অন্য যে কেউ হলে জিজ্ঞেস করত, “কেন?” টুম্পা জিজ্ঞেস করল। টুনির ওপরে তার অনেক বিশ্বাস। কেন এই নাটকটা করতে হবে একটু পরে নিশ্চয়ই বোঝা যাবে। তাই যখন টুনি টুম্পাকে সিগন্যাল দিল, টুম্পা বলল, “ছোটাচ্চু, বমি করব।“
টুম্পা বমি করার জন্যে সুন্দর জায়গা খুঁজে হাঁটতে থাকে আর ঝুমু খালা তাকে বমি করানোর জন্যে পিছমে পিছনে হাঁটতে থাকে। ছোটাচ্চু অবাক হয়ে বলল, “কই যায়?”
টুনি বলল, “বমি করার জন্যে একটা ভালো জায়গা খুঁজছে।”
ছোটাচ্চু বলল, “বমি করার জন্যে কারো ভালো জায়গা লাগে?”
“টুম্পার লাগে। টুম্পা খুবই খুঁতখুঁতে।”
তখন প্রথমে ছোটাচ্চু তারপর শান্ত তারপর গাড়ির ড্রাইভার মাইক্রোবাস থেকে নেমে গেল।
টুনি ঠিক এই সময়টার জন্যে অপেক্ষা করছিল। কেউ যেন না দেখে সেভাবে একটু সামনে ঝুঁকে হ্যাঁচকা টান দিয়ে রিয়ার ভিউ মিররে ঝোলানো চাক্কা পীরের তাবিজটা খুলে নিল তারপর মুঠিতে ধরে সেও মাইক্রোবাস থেকে নেমে গেল।
টুম্পা তখনো হাঁটছে, টুনি চিৎকার করে বলল, “টুম্পা, বমি করলে করে ফেল তাড়াতাড়ি।”
টুম্পা তখন বসে সামনে মাথা ঝুঁকিয়ে কয়েকবার ‘ওয়াক ওয়াক’ শব্দ করল। বমি করার খুব ভালো অভিনয় বলা যাবে না, কিন্তু কেউ শখ করে কখনো বমি করার অভিনয় করে না, তাই কেউ সন্দেহ করল না।
কিছুক্ষণ পর টুম্পা ঝুমু খালার হাত ধরে ফিরে আসল। টুম্পা চেহারার মাঝে একটা বিধ্বস্ত ভাব ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করে রেখেছে। ছোটাচ্চু জিজ্ঞেস করল, “বমি হয়েছে?”
ঝুমু খালা উত্তর দিল, “বেশি হয় নাই।”
ছোটাচ্চু বলল, “না হলেই ভালো।”
টুনি বলল, “খোলা বাতাসে হাঁটাহাঁটি করলে বমি বমি ভাব কমে যায়।”
শান্ত বলল, “লুতুপুতু মানুষকে নিয়ে জার্নি করা ঠিক না।”
ছোটাচ্চু বলল, “থাক, থাক। ছোট মানুষ।”
তারপর টুম্পার দিকে তাকিয়ে বলল, “এখন যেতে পারবি?”
টুম্পা মাথা নেড়ে জানাল যে সে যেতে পারবে। তখন একজন একজন করে সবাই আবার মাইক্রোবাসে উঠে পড়ল। ড্রাইভার তার সিটে বসে আবার গাড়ি স্টার্ট করে। দেখতে দেখতে মাইক্রোবাসের স্পিড বাড়তে থাকে, সামনে যা কিছু আছে সবকিছু ওভারটেক করে ফেলে, উল্টো দিক থেকে যা কিছু আসে তার গা ঘেঁষে যেতে থাকে, মাঝে মাঝেই হেড লাইট জ্বালিয়ে নিভিয়ে বিপরীত দিক থেকে আসা গাড়িগুলোকে চোখ রাঙানি দিয়ে সামনে থেকে সরে যেতে বাধ্য করতে থাকে। ছোটাচ্চু কয়েকবার বলল, “আস্তে ড্রাইভার সাহেব, আস্তে।”
ড্রাইভার তার কথা শুনল না।
