কীভাবে কীভাবে পরিকল্পনা করে তারা জুয়েল নামের বাচ্চাটাকে ভূত এবং রাক্ষসের বইটা দিয়েছে শুনে ছোটাচ্চু অবশ্য খুবই মজা পেল। শুধু ছোটাচ্চু না অন্যেরাও আনন্দে হি হি করে হাসতে লাগল। ছোটাচ্চু এত খুশি হলো যে সে একেবারে একটা বক্তৃতা দিয়ে দিল। বলল, “তোরা যেটা করেছিস সেটা খুবই সুইট একটা কাজ। একটা ছোট বাচ্চার বইটার এত শখ অথচ মা-বাবা সেটা কিনে দিতে পারছে না, শুনে তো কষ্ট লাগতেই পারে। কিন্তু বইটা এমনভাবে দিলি যেন বাবা-মায়ের আত্মসম্মানে আঘাত না লাগে, এটা অসাধারণ একটা কাজ। তোরা এত ছোট কিন্তু তোদের এরকম ম্যাচুরিটি–আমি মুগ্ধ হয়ে গেছি! আমি এত খুশি হয়েছি যে আমি কি করব জানিস?”
সবাই জানতে চাইল, “কী করবে ছোটাচ্চু?”
“তোদের তিনজনকে আরো পাঁচশ টাকা করে দেব।”
শুধু তিনজন নয়, সবাই মিলে তখন আনন্দে এত জোরে চিৎকার করে উঠল যে মনে হলো বইমেলায় সবাই রীতিমতো চমকে উঠল! ছোটাচ্চু তখন তখনই পকেট থেকে তিনটা পাঁচশ টাকার নোট বের করে তিনজনের হাতে ধরিয়ে দিল। টুম্পা আর মুনিয়া নোর্টটা হাতে নিয়ে তখন তখনই আবার ছোটদের বইয়ের স্টলের দিকে ছুটে যেতে শুরু করে। তাদের আর এক মুহূর্ত দেরি করার ধৈর্য নেই।
একটু পর অন্যরাও উঠে দাঁড়াল। মেলার মাঝে ইতস্তত ঘুরে ঘুরে তারা নতুন বই দেখতে থাকে। টুনি একটা বেঞ্চে চুপচাপ বসে ছিল তখন শান্ত তার পাশে এসে বসল। টুনি লক্ষ করল তার হাতে কিছু নেই। টুনি জিজ্ঞেস করল, “তোমার বইগুলো কোথায় শান্ত ভাইয়া?”
“ডাস্টবিনে ফেলে দিয়েছি।”
“ফেলে দিয়েছ?”
“হ্যাঁ। তোদের সবার হাতে এত সুন্দর সুন্দর বই আর আমার কাছে হাঁস-মুরগির বিষ্ঠা! ছিঃ!”
টুনি জিজ্ঞেস করল, “তুমি সুন্দর বই কিনতে চাও?”
“কীভাবে কিনব, বদমাইশ পকেটমারটা আমার পকেট মেরে দিল, ধরতে পারলে খুন করে ফেলতাম।” তারপর সে পকেটমারকে অত্যন্ত খারাপ ভাষায় একটা গালি দিল।
টুনি তার ব্যাগ থেকে ছোটাচ্চুর দেওয়া পাঁচশ টাকার নোটটা বের করে শান্তর দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, “নাও শান্ত ভাইয়া। এই টাকা দিয়ে তোমার পছন্দের বই কিনে নাও।”
শান্ত অবাক হয়ে বলল, “তোর টাকা দিয়ে আমি বই কিনব?”
“হ্যাঁ।”
“কেন?”
“আমরা সবাই সুন্দর সুন্দর বই নিয়ে বাসায় যাব আর তোমার কোনো বই থাকবে না–এটা কেমন হবে?
“সত্যি দিচ্ছিস?”
“হ্যাঁ।”
“পুরোটা?” টুনি মাথা নাড়ল, বলল, “পুরোটা।”
“পরে যদি ঝগড়া হয় ফেরত চাইবি না?”
“না। ফেরত চাইব না।”
“খোদার কসম?”
“খোদার কসম।”
শান্তর মুখ তখন একশ ওয়াট বাতির মতো জ্বলে উঠল। টুনির হাত থেকে ছোঁ মেরে নোটটা নিয়ে সেটাকে একটা চুমু খেল, তারপর হাত ঝাঁকুনি দিয়ে বলল, “ইয়েস!”
টুনি বসে বসে দেখল শান্ত ভাইয়া নোটটা পকেটে রেখে সেই পকেটটা হাত দিয়ে শক্ত করে চেপে ধরে রেখে হনহন করে হেঁটে যাচ্ছে। পিছন থেকে দেখা যাচ্ছে না কিন্তু মুখে নিশ্চয়ই বিশাল একটা হাসি।
দূর থেকে টুম্পা আর মুনিয়াকে দেখা যাচ্ছে ছোটাচ্চুটি করে বই কিনছে। বইয়ের বোঝা আর টেনে নিতে পারছে না-কী আনন্দ! টুনি আশপাশে তাকাল, বাবা-মায়েরা তাদের ছেলেমেয়েদের নিয়ে হাঁটছে। কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছেলেমেয়েরা হাত ধরাধরি করে হাঁটছে। চশমা পরা খ্যাপা ধরনের একটা মেয়ে হেঁটে গেল, বাতাসে চুল ওড়ছে, কী সুন্দর লাগছে দেখতে। শাড়ি পরা দুজন মেয়ে হাসতে হাসতে কথা বলতে বলতে হেঁটে যাচ্ছে। কী সুন্দর কপালে লাল-সবুজ টিপ দিয়েছে। দেখতে কী ভালো লাগছে!
টুনি বসে বসে দেখে। তার মনে হয়, আহা বেঁচে থাকাটা কী আনন্দের!
লুডো টুর্নামেন্ট
মুনিয়া একটা লুডোর বোর্ড, তার ছক্কা আর খুঁটির বাক্স নিয়ে গিয়েছে টুম্পার কাছে। টুম্পা গভীর মনোযোগ দিয়ে কাগজ কেটে কেটে একটা প্রজাপতি বানাচ্ছিল। মুনিয়া তাকে বলল, “টুম্পা আপু, আমার সাথে লুডো খেলবে?”
টুম্পা বলল, “উঁহু। এখন খেলতে পারব না। দেখছিস না এই প্রজাপতিটা তৈরি করছি, তারপর এইটা রং করতে হবে, তারপর রং শুকাতে হবে। অনেক কাজ।”
মুনিয়া তখন গেল প্রমির কাছে, গিয়ে বলল, “প্রমি আপু তুমি আমার সাথে লুডো খেলবে?”
প্রমি বলল, “কেমন করে খেলি, বলো! হোমওয়ার্ক এখনও শেষ হয় নাই যে।”
মুনিয়া তখন গেল শাহানার কাছে, শাহানাও বলল তার সময় নেই। মুনিয়া শান্তর কাছে যাবে কি না ঠিক করতে পারছিল না। কিন্তু যেহেতু দোতলার সিঁড়িতে তার সাথে দেখা হয়েই গেল তাই তাকে জিজ্ঞেস করল, “শান্ত ভাইয়া, তুমি আমার সাথে লুডো খেলবে?”
শান্ত চিৎকার করে হাত-পা নেড়ে মাথা ঝাঁকিয়ে বলল, “কী বললি তুই? লুডো? তোর সাথে? আমার কি মাথা খারাপ হয়েছে যে তোর মতো একটা গেন্দা বাচ্চার সাথে বসে বসে এখন আমি লুডো খেলব? আমার কি কাজের অভাব পড়েছে? যা যা-ভাগ এখান থেকে!”
শান্তর কথা শুনে মুনিয়া কিছু মনে করল না। শান্ত সব সময় এইভাবেই কথা বলে। ভালোভাবে কথা বললেই বরং মুনিয়া অবাক হতো। মুনিয়া তখন গেল টুনির কাছে। টুনি বিছানায় আধশোয়া হয়ে একটা বই পড়ছিল, মুনিয়াকে দেখে বলল, “কী খবর মুনিয়া?”
মুনিয়া বলল, “টুনি আপু, তুমি আমার সাথে লুডো খেলবে?” টুনি মাথা চুলকে বলল, “লুডো? তোর সাথে?”
“হ্যাঁ।”
টুনি বলল, “লুডো খেলার মাঝে কোনো বুদ্ধি নাই, পুরোটা হচ্ছে লটারি। অন্য কিছু খেলিস না কেন?”
