“হ্যাঁ। যেকোনোটা। কিন্তু একটার বেশি না।”
জুয়েল তখন রীতিমতো ঝাঁপিয়ে পড়ে ভূত আর রাক্ষসের বইটা ছো মেরে তুলে নিয়ে বুকের মাঝে চেপে ধরল। তাকে দেখে মনে হতে লাগল একটু আলগা করলেই বুঝি কেউ এসে বইটা ছিনিয়ে নিয়ে যাবে।
টুনি বলল, “এখানে আরো অন্য বই আছে, সবগুলো দেখে নাও একবার।”
জুয়েল রীতিমতো গর্জন করে বলল, “না। আমি এইটাই নিব।”
টুনি বলল, “ঠিক আছে।”
টুম্পা এতক্ষণ একটা কথাও বলেনি, এই প্রথম মুখ খুলল, বলল, “আপু আমাদের কিন্তু আরও অনেক জরিপ করা বাকি আছে। এক জায়গায় বেশি সময় দিলে জরিপ শেষ হবে না। ম্যাডাম তখন খুব রাগ করবে।”
টুনি বলল, “হ্যাঁ হ্যাঁ তুমি ঠিকই বলেছ। চলো অন্য বাচ্চা খুঁজে বের করি।”
টুম্পা বইগুলো ব্যাগে ঢাকাল তারপর দুজনে উল্টো দিকে হাঁটতে থাকে, একটু পরেই মুনিয়া তাদের সাথে যোগ দিল।
দূর থেকে তারা জুয়েল আর তার আব্লু-আম্মুকে লক্ষ করল। বাচ্চাটা বইটা নিয়ে রীতিমতো লাফাতে লাফাতে হেঁটে যাচ্ছে। তার আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে থাকা হাসি হাসি মুখটা দেখে টুনি, টুম্পা আর মুনিয়াও আনন্দে হাসতে থাকে।
.
সন্ধে হওয়ার পর ছোটাচ্চু সবাইকে নিয়ে মেলার মাঝখানের মাঠটাতে গোল হয়ে বসল, ছোটাচ্চু এখন সবার বইয়ের হিসেব নেবে। দেখবে সবাই তাদের টাকা ঠিকমতো খরচ করেছে কি না, ঠিকভাবে নিজেদের বই কিনেছে কি না। প্রমি কিংবা শাহানার মতো যারা একটু বড় তাদের দিয়ে শুরু করা হলো, দেখা গেল তারা শুধু যে ছোটাচ্চুর পাঁচশ টাকা খরচ করেছে তা নয়, তার সাথে নিজের জমানো টাকাও খরচ করে অনেক বই কিনেছে। তার মাঝে গল্প-উপন্যাস আছে, সায়েন্স ফিকশান আছে, এমনকি কটমটে জ্ঞানের বইও আছে। ছোটাচ্চু বইয়ের বান্ডিল হাতে নিয়ে রীতিমতো বইয়ের দাম বের করে যোগ দিয়ে মিলিয়ে নিল। মনে হচ্ছে ছোটাচ্চু মাত্রার বাইরে সিরিয়াস!
বাচ্চারা সবাই একে অন্যের বই দেখছে, কথা বলছে, হাসাহাসি করছে, তার মাঝে শুধু শান্তকে খুবই মনমরা দেখা গেল। সাধারণত সবসময়েই সে সবচেয়ে বেশি কথা বলে, আজকে তার মুখে কোনো কথা নেই, কেমন যেন চিমসে মেরে বসে আছে।
ছোটাচ্চু একটু বড় ছেলেমেয়ে শেষ করে শান্তর বইগুলো দেখতে চাইল, শান্ত একটু অপরাধীর মতো ভঙ্গি করে ছোটাচ্চুর হাতে তিনটা বই তুলে দিল। প্রথম বইটার নাম নৈঃশব্দ্যের কান্না, কবিতার বই এবং কবির নাম তুফান তূর্য। ছোটাচ্চু চোখ কপালে তুলে বলল, “তুই কবিতার বই কিনেছিস? তুফান তূর্যের বই? তুফান তূর্য আবার মানুষের নাম হয় নাকি?”
শান্ত চুপ করে মাঠ থেকে একটা দুইটা ঘাস ঘেঁড়ার চেষ্টা করতে থাকল। ছোটাচ্চু বইটা খুলে রীতিমতো চমকে উঠল! বলল, “এ কী! ভেতরে কবির অটোগ্রাফ এবং ভালোবাসা। ব্যাপারটা কী? তোর নাম শান্ত কিন্তু ভালোবাসাটা শান্তাকে! শান্তাটা কে?”
টুনি পুরো ব্যাপারটা জানে কিন্তু সে চুপ করে রইল।
ছোটাচ্চু শান্তর পরের দুইটা বই নিল একটা বইয়ের নাম “হাঁস মুরগির বিষ্ঠা থেকে সার” অন্যটা “সহজ টোটকা চিকিৎসা”-এই বই দুটি সে মোড়ক উন্মোচনের ভিড় থেকে কজা করেছে, বইয়ের কী নাম, সেটা নিয়ে সে মাথা ঘামায়নি!
ছোটাচ্চু খানিকক্ষণ হাঁ করে শান্তর দিকে তাকিয়ে রইল, তারপর বলল, “তুই এ কী বই কিনেছিস? বইয়ের দামগুলো দেখে বলল, “সব মিলিয়ে তুই তো দুইশ টাকাও খরচ করিসনি। বাকি টাকা কই?”
শান্ত মাথা চুলকে খানিকক্ষণ ইতিউতি করে শেষ পর্যন্ত সত্যি কথাটা বলে ফেলল। তার আসল পরিকল্পনা ছিল নানা জায়গা থেকে কিছু ফ্রি বই ম্যানেজ করে নগদ পাঁচশ টাকা মেরে দেবে। কিন্তু তার খুবই কপাল খারাপ, মোড়ক উন্মোচনের ভিড়ের মাঝে ফ্রি বইয়ের জন্য যখন ধস্তাধস্তি করছিল তখন পকেটমার তার পকেট থেকে কড়কড়া পাঁচটা একশ টাকার নোট হাওয়া করে দিয়েছে। তার আম এবং ছালা কিংবা চা এবং চায়ের কাপ কিংবা কাঁঠালের কোয়া এবং বিচি দুই-ই গেছে। পকেট মারা যাবার পর তার এত মুড খারাপ হয়েছে যে সে আর ফ্রি বইয়ের জন্যে চেষ্টা করেনি, মেলায় মুখ কালো করে ঘুরে বেড়িয়েছে।
ছোটাচ্চু দাঁত কিড়মিড় করে বলল, “তোর উচিত শাস্তি হয়েছে। এখন বসে বসে হাঁস-মুরগির বিষ্ঠা দিয়ে সার বানিয়ে তোর ঘিলুর মাঝে ঢালতে থাক। টোটকা ওষুধ হিসেবে মাঝে মাঝে এক চামচ খেয়েও নিবি। বুঝেছিস?”
শান্ত খুবই মনমরা হয়ে বলল যে তার আসলে খুবই গাধামো হয়েছে। বইমেলা ঘুরে ঘুরে সে দেখেছে অনেকগুলো ফাটাফাটি বই আছে। তার ঐ বইগুলোই কেনা উচিত ছিল। জিম করবেটের শিকার কাহিনি। কনটিকির ভ্রমণ। এপোলো থার্টিনের মহাকাশ-অভিযান। অসাধারণ সব বই। দেখলেই জিভে পানি এসে যায়।
ছোটাচ্চু গজগজ করতে করতে টুনি, টুম্পা আর মুনিয়ার বইগুলো হাতে নিল। বইগুলো খুবই সুন্দর কিন্তু দাম হিসেব করতে গিয়ে দেখলে দুইশ টাকা কম। ছোটাচ্চু বলল, “কী হলো? দুইশ টাকা কম কেন? টাকা কোথায়? খরচ করিসনি?”
টুনি, টুম্পা আর মুনিয়া একজন আরেকজনের মুখের দিকে তাকাল, দুইশ টাকার হিসাব কেন মিলানো যাচ্ছে না সেটা বলা ঠিক হবে কি না বুঝতে পারছিল না। টুনি শেষ পর্যন্ত বলেই দিল, ছোটাচ্চু যে নিয়ম করে দিয়েছে সেই নিয়মের বাইরে তো আর তারা যায়নি। তারা বই-ই কিনেছে কিন্তু নিজেদের জন্যে নয়, অন্যের জন্যে। কাজটা নিশ্চয়ই খুব বড় অপরাধ হতে পারে না!
