“আমি অন্য কোনো খেলা পারি না।”
“আয় তোকে দাবা খেলা শিখিয়ে দেই। দাবা হচ্ছে বুদ্ধির খেলা।”
মুনিয়া মাথা নাড়ল, বলল, “উঁহু। আমি বুদ্ধির খেলা খেলতে চাই না। আমি লুডো খেলতে চাই।”
“কেন তুই বুদ্ধির খেলা শিখতে চাস না?”
মুনিয়া বলল, “আমার বুদ্ধি ভালো লাগে না।”
টুনি একটু অবাক হয়ে মুনিয়ার দিকে তাকিয়ে রইল। এই বাসায় এখন সবচেয়ে ছোট হচ্ছে মুনিয়া, সে এখনই বুঝে গেছে বুদ্ধি বিষয়টা ভালো না!
টুনি বলল, “ঠিক আছে তোর সাথে আমি লুডো খেলব কিন্তু একটু সময় দে, বইটার খুব ইন্টারেস্টিং একটা জায়গায় এসেছি তো এইটা শেষ করে আসি।”
মুনিয়ার অপেক্ষা করার সময় নাই। সে তখন গেল ঝুমু খালার কাছে, গিয়ে বলল, “ঝুমু খালা তুমি আমার সাথে লুডো খেলবে?”
ঝুমু খালা বলল, “অবশ্যই খেলব। লুডো আমার সবচেয়ে পছন্দের খেলা। আমি দিন-রাত চব্বিশ ঘণ্টা লুডো খেলতে পারি। তবে সাপ-লুডো একটু ভয় লাগে। সাপ দেখলেই আমার শরীর কী রকম জানি ইজিবিজি করে।”
মুনিয়া বলল, “এইগুলো তো সত্যি সাপ না।”
“সত্যি হোক মিথ্যা হোক কিছু আসে-যায় না। সাপ দেখলেই শরীর ইজিবিজি করে।”
“তোমার কোনো ভয় নাই ঝুমু খালা, আমি সাপ-লুডো খেলব না।”
ঝুমু খালা খুশি হয়ে বলল, “চমৎকার!”
মুনিয়া বলল, “তাহলে বোর্ডটা এখানে পাতব? গুটি বসাব?”
ঝুমু খালা বলল, “মুনিয়া সোনা, আমাকে দুইটা মিনিটি সময় দাও। ডালটা বাগাড় দিয়ে ফেলি, ভাতটা নামিয়ে মাছগুলো ভেজে ফেলি–”
মুনিয়া হতাশ হয়ে মাথা নাড়ল, সে জানে এতগুলো কাজ কোনোভাবেই দুই মিনিটে শেষ হবে না। তাই তখন সে দাদির (কিংবা নানির) কাছে গেল নালিশ করতে। দাদি বসার ঘরে সোফায় বসে আছেন, তার পাশে একটা ষোলো-সতেরো বছরের ছেলে বসে আছে। ছেলেটা দেখতে অনেক স্মার্ট আর চেহারা খুব সুন্দর। একটা কালো টি-শার্ট আর জিনসের প্যান্ট পরে আছে।
মুনিয়াকে দেখে দাদি জিজ্ঞেস করলেন, “মুনিয়া তোর মুখটা এত ভার কেন? কী হয়েছে?”
“দাদি, কেউ আমার সাথে খেলতে চায় না।”
“কেউ তোর সাথে খেলতে চায় না? এত বড় সাহস? সবগুলোকে ডেকে আন, খুন করে ফেলব সবগুলোকে আজকে।”
“সত্যি ডেকে আনব?”
“হ্যাঁ সত্যি।”
“সত্যি খুন করে ফেলবে?”
“সত্যি না তো মিথ্যা নাকি? সবাইকে বল আমার একজন নাতি এসেছে, তার সাথে পরিচয়ও করিয়ে দেব।”
মুনিয়া তখন সবাইকে ডেকে আনল, দাদি তাদের সবাইকে খুন করে ফেলা হবে বলার পরও কাউকে সে রকম দুশ্চিন্তিত দেখা গেল না। দাদির এই নতুন নাতিটি কে এবং কোথা থেকে এসেছে সেটা জানার জন্যে সবার ভেতরেই একটু কৌতূহল।
দাদি তার নতুন নাতির সাথে পরিচয় করিয়ে দিলেন, বললেন, “এই যে এ হচ্ছে আমার ছোটবেলার বান্ধবী জোবেদার নাতি। জোবেদার নাতি মানে আমার নাতি।”
সবাই দাদির নাতিকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে মনে মনে এ প্লাস দিয়ে দিল। ছেলেটা স্মার্ট আর সুন্দর। জামা-কাপড়ও যথেষ্ট ভালো। এই বয়সের মেয়েরা খুব সুইট হয়, কিন্তু ছেলেরা কেমন যেন ভ্যাবলা ধরনের হয়ে যায়। কিন্তু এই ছেলেটা মোটেও ভ্যাবলা ধরনের নয়।
দাদি বললেন, “এর নাম মিশু।”
তারপর অন্যদের দেখিয়ে বললেন, “মিশু, এরা আমার নাতি-নাতনি। এদের থেকে খুব সাবধান, একজন থেকে আরেকজন আরো বেশি তাঁদড়।”
শান্ত আপত্তি করল, বলল, “দাদি কথাটা ঠিক বললে না তুমি। আমরা মোটেও তঁদড় না।”
দাদি বললেন, “ঠিক আছে। সেইটা নিয়ে আলোচনা না করলাম।” তারপর মিশুকে দেখিয়ে বললেন, “মিশু ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হবে বলে এসেছে। অন্য কোথাও থাকতে চাইছিল, আমি বলেছি আমি থাকতে অন্য কোথাও কেন থাকবে? তাই এখন এই বাসায় কয়দিন থাকবে।”
প্রমি বলল, “মিশু ভাই, তুমি কোন ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হবে?”
মিশু উত্তর দেবার আগেই দাদি বললেন, “মিশু যে কয়টা ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি পরীক্ষা দিয়েছে তার প্রত্যেকটাতে চান্স পেয়েছে। সবগুলোতে একেবারে প্রথম দিকে আছে, তার মানে হচ্ছে বাংলাদেশের যে কোনো ইউনিভার্সিটির যেকোনো সাবজেক্টে ভর্তি হতে পারবে। তাই না মিশু?”
মিশু লাজুক মুখে মাথা নাড়ল, বলল, “আপনি এমনভাবে বলছেন যেন এইটা সাংঘাতিক কিছু। এটা এমন কিছু না, আমার থেকে আরও কত ভালো ছাত্রছাত্রী আছে।”
দাদি বললেন, “থাকলে থাকুক, তাদেরকে তো আর আমি চিনি না! আমি চিনি তোমাকে।”
দাদি বললেন, “দেখবেন আপনার নাতি-নাতনিরা আরো ভালো হবে!”
দাদি চোখ কপালে তুলে বললেন, “আমার নাতি-নাতনি? এরা কোনোদিন বই খুলে দেখে মনে করছ? বইয়ের সাথে এদের কারো কোনো সম্পর্ক নাই।”
টুনি আপত্তি করল, “কী বলছ দাদি? শাহানা আপু হচ্ছে জিনিয়াস। সায়েন্স ফেয়ারে দুইবার গোল্ড মেডেল পেয়েছে।”
“হ্যাঁ, শাহানাটাই কেবল একটু লেখাপড়া করে। যাই হোক, তোরা মিশুকে নিয়ে যা–কোথায় থাকবে কী সমাচার ঠিক করে দে।”
মুনিয়া তখন দাদিকে মনে করিয়ে দিয়ে বলল, “দাদি, তুমি বলেছিলে এদের খুন করবে। এরা কেউ আমার সাথে লুডো খেলতে চায় না।”
দাদির মনে পড়ল, মাথা নেড়ে বললেন, “ও হ্যাঁ। তোরা কেউ মুনিয়ার সাথে খেলতে চাস না কেন? বেচারি একটা লুডোর বোর্ড নিয়ে কতক্ষণ থেকে ঘুরে বেড়াচ্ছে।”
সবাই একসাথে একটু যন্ত্রণার শব্দ করল। প্রমি বলল, “দাদি লুডো খেলার মাঝে কোনো বুদ্ধি নাই, এইটা খেলার ইচ্ছা করে না।”
