“ছবিওয়ালা বই।”
“রঙিন ছবি নাকি সাদা কালো ছবি?”
“রঙিন রঙিন।”
“কী রকম বই পড়তে তোমার ভালো লাগে? রূপকথা নাকি ভূত নাকি হাসির গল্প?”
“আমার হাসির গল্প বই পড়তে সবচেয়ে বেশি ভালো লাগে।”
টুনি সবকিছু লিখে শেষ করার ভান করে জিজ্ঞেস করল, “তুমি টেলিভিশন দেখো?”
“দেখি।”
“তোমার টেলিভিশন দেখতে বেশি ভালো লাগে নাকি বই পড়তে?”
“টেলিভিশনে কার্টুন দেখতে আমার সবচেয়ে ভালো লাগে কিন্তু আমাকে দেখতে দেয় না। বাসায় বড় মানুষেরা দিন-রাত খবর শুনে।”
“হিন্দি সিরিয়াল?”
“না। আমার আব্বু-আম্মু কখনো হিন্দি সিরিয়াল দেখে না। আমিও দেখি না।”
টুনি খুশি হওয়ার ভান করে বলল, “ভেরি গুড। কখনো হিন্দি সিরিয়াল দেখবে না। আর তোমাকে বলে রাখি, টেলিভিশন দেখা থেকে বই পড়া অনেক বেশি ভালো। বুঝেছ?”
মুনিয়া মাথা নেড়ে বুঝে ফেলার ভান করল। টুনি নোট বইয়ে আরো কিছুক্ষণ লিখে মুনিয়ার দিকে তাকিয়ে বলল, “ঝিলিক, তোমার জরিপ নেয়া শেষ। এখন লটারি। কিন্তু তার আগে তোমাকে অন্য একটা জিনিস জিজ্ঞেস করি।”
“করো।”
“তুমি ছোট একজন মানুষ, আব্বু-আম্মু ছাড়া একা এক বসে আছ, তোমার আব্বু-আম্মু কোথায়?”
মুনিয়া বলল, “ঐ যে আমার আব্বু-আম্মু বই কিনছে। হেঁটে হেঁটে আমার পা ব্যথা হয়ে গেছে তাই এখানে বসে আছি।”
টুনি-মুনিয়ার বুদ্ধি দেখে মুগ্ধ হলো। সে খুবই ভালোভাবে অভিনয় করে যাচ্ছে। বাসায় গিয়ে তাকে অভিনয়ের জন্যে একটা মেডেল দিতে হবে।
টুনি তার ব্যাগ থেকে ভাঁজ করা ছোট ছোট কাগজগুলো বের করে তার হাতে ধরল, বলল, “এখান থেকে একটা কাগজ নাও। চোখ বন্ধ করে নিতে হবে।”
মুনিয়া চোখ বন্ধ করে ভাঁজ করা ছোট একটা কাগজ নিল। টুনি বলল, “খুলে দেখো কী লেখা। যদি বিজয়ী লেখা থাকে তাহলে পুরস্কার পাবে। যদি দুঃখিত লেখা থাকে তাহলে কোনো পুরস্কার নাই।”
“জিতলে কী পুরস্কার পাব? চিপসের প্যাকেট?”
“না, না। মোটেও চিপসের প্যাকেট না। জিতলে পুরস্কার হচ্ছে বই।”
“কী বই?”
“আমাদের কাছে অনেক রকম বই আছে। যেটা পছন্দ।”
মুনিয়া তখন খুব সাবধানে ভাঁজ করা কাগজটা খুলল, ভেতরে লেখা বিজয়ী এবং সেটা দেখে মুনিয়া আনন্দে পাগল হয়ে যাবার একটা অনবদ্য অভিনয় করল।
টুম্পা তখন তার ব্যাগ থেকে বইগুলো বেঞ্চে ছড়িয়ে দিয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। টুনি বলল, “ঝিলিক। নাও, তুমি এখান থেকে একটা বই বেছে নাও।”
মুনিয়া জিজ্ঞেস করল, “একটাই নেব, নাকি আরো বেশি?”
টুনি বলল, “না একটা। আমাদের অনেক জরিপ করতে হবে।”
মুনিয়া তখন বইগুলো থেকে একটা বই বেছে নেয়ার একটা অসাধারণ অভিনয় করল। তারপর বইটা বুকে চেপে ধরে তার কাল্পনিক আবু-আম্মুর কাছে ছুটে চলে গেল।
পাশে বাচ্চাটি একরকম বিস্ফারিত চোখে বইগুলোর দিকে তাকিয়ে আছে। যে বইটি তার আব্বু-আম্মু কিনে দেয়নি সেই বইটিও এখানে আছে। সে কি জরিপে অংশ নিতে পারে না? লটারিতে অংশ নিতে পারে না? কিন্তু কীভাবে সেটা হতে পারে?
খুব সহজেই হয়ে গেল। টুনি বাচ্চাটার আব্বু-আম্মুর দিকে তাকিয়ে বলল, “আমরা কি আপনার বাচ্চার একটা জরিপ নিতে পারি? বেশিক্ষণ লাগবে না।”
আব্বু-আম্মু কিছু বলার আগেই বাচ্চাটা লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়াল, বলল, “হ্যাঁ, হ্যাঁ। আমি জরিপ হব। জরিপ হব।”
টুনি বলল, “ভেরি গুড। তাহলে তোমার নাম বলো।”
“আমার নাম মোহাম্মদ আজহারুল ইসলাম খান জুয়েল।”
“ভেরি গুড জুয়েল। তুমি কোন ক্লাসে পড়ো?”
“টু। ক্লাস টু। আমি পরীক্ষায় থার্ড হয়েছি।”
“বাহ্! এরপরের বার সেকেন্ড হবে। তারপরের বার ফার্স্ট।”
জুয়েল জোরে জোরে মাথা নাড়ল। টুনি ঠিক আগের মতোই একটার পর একটা প্রশ্ন করে যেতে লাগল। জুয়েল খুবই উৎসাহ নিয়ে প্রত্যেকটা প্রশ্নের উত্তর দিতে থাকল এবং আড়চোখে ভূত এবং রাক্ষসের মোটাসোটা রঙিন বইটার দিকে তাকাতে লাগল।
দেখতে দেখতে জরিপ শেষ হয়ে গেল। দেখা গেল জুয়েল গল্প বই পড়তে খুবই পছন্দ করে। তার প্রিয় বই হচ্ছে ভূতের গল্প। তারও পছন্দ ছবিওয়ালা রঙিন বই এবং সেও টেলিভিশনে কার্টুন দেখতে পছন্দ করে তবে সে নিজ থেকে ঘোষণা দিল যে টেলিভিশন দেখা মোটেই ভালো কাজ না।
জরিপ শেষ হওয়ার পর টুনি আবার তার ভাঁজ করা ছোট ছোট কাগজগুলো তার দুই হাতের মুঠোয় নিয়ে জুয়েলের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, “জুয়েল এখন চোখ বন্ধ করে একটা কাগজ নাও।”
জুয়েল বিড়বিড় করে একটা দোয়া পড়ে তার বুকে ফুঁ দিল, নার্ভাসভাবে তার মায়ের দিকে তাকাল, এবং তার মা তাকে সাহস দিলেন।
টুনি বলল, “জুয়েল যদি দেখো লটারিতে তুমি জিত নাই, তাহলে মন খারাপ করবে না তো?”
জুয়েল খুব কষ্ট করে মাথা নাড়ল, বলল, “করব না।”
টুনি বলল, “এটা তো একটা লটারি, তাই কে জিতবে কে হারবে তার কোনো ঠিক নেই। বুঝেছ?”
জুয়েল ফ্যাকাসে মুখে বলল, “বুঝেছি।”
“নাও একটা কাগজ।”
জুয়েল অনেকক্ষণ চিন্তা-ভাবনা করে একেবারে নিচের থেকে একটা কাগজ নিল। নিয়ে কাঁপা হাতে এটা ধরে রাখল।
টুনি বলল, “খুলো কাগজটা। না জিতলে মন খারাপ কোরো না কিন্তু।”
জুয়েল কাগজটা খুলল, ভেতরে লেখা–”বিজয়ী” অন্য কিছু লেখা সম্ভব না যদিও জুয়েলের পক্ষে সেটা কল্পনা করাও সম্ভব ছিল না।
কাগজটা দেখে মনে হলো জুয়েল নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছে। তার ঠোঁট কাঁপতে থাকল এবং সেইভাবে কাঁপা গলায় বলল, “আমি যে কোনোটা নিতে পারব?”
