কিছুক্ষণের মাঝেই টুম্পা বইটা কিনে আনল, মোটাসোটা রঙিন একটা বই, ছোট বাচ্চাদের এরকম একটা বই খুব পছন্দ হতেই পারে।
টুনি বলল, “শোন, আমি আমার প্ল্যানটা বলি। আমি ভান করব যে আমি এই মেলায় ছোট বাচ্চারা কী রকম বই পছন্দ করে তার একটা জরিপ নিচ্ছি। কেউ যদি জরিপে অংশ নেয় তখন তাকে একটা লটারিতে অংশ নিতে দেয়া হবে। সেই লটারিতে যারা জিতবে তারা একটা বই উপহার পাবে।”
টুম্পা মাথা নাড়ল, বলল, “বুঝেছি, তুমি বাচ্চাটাকে লটারিতে জিতিয়ে দেবে?”
হ্যাঁ। আমি অনেকগুলো কাগজের টুকরো নিয়েছি সবগুলোতে লিখেছি বিজয়ী। তাই বাচ্চাটা চোখ বন্ধ করে যেটাই তুলবে সেটাই হবে বিজয়ী।
মুনিয়া উত্তেজিত হয়ে বলল, “টুনি আপু তোমার মাথা ভর্তি খালি বুদ্ধি আর বুদ্ধি।”
টুনি হাসল, “এইটা এমন কিছু বুদ্ধি না। আমাদের বুদ্ধি দেখাতে হবে জরিপ নেওয়ার সময়।” তারপর টুম্পার দিকে তাকিয়ে বলল, “আমাদের বাচ্চাটা আর তার আম্মু-আব্বুর কাছাকাছি তোর জরিপ নেব। তুই ভান করবি আমাকে চিনিস না, পারবি না?”
টুম্পা বলল, “পারব।”
মুনিয়া বলল, “আর আমি?”
“তুই একটু দূরে দাঁড়িয়ে দেখবি কী হচ্ছে।”
মুনিয়া বলল, “না টুনি আপু আমিও খেলতে চাই।”
টুনি বলল, “খেলতে চাস? এখানে খেলা কোনটা?”
“এই পুরোটাই তো খেলা টুনি আপু। আমি খেলব।”
“তুই কীভাবে খেলবি?”
“টুম্পা আপুর বদলে আমার জরিপ নেবে।”
টুনি বলল, “তুই বেশি ছোট। তুই পারবি না। বাচ্চাটার আব্বু-আম্মু বুঝে ফেলবে, তখন খুব খারাপ ব্যাপার হবে।”
মুনিয়া বলল, “না টুনি আপু, আমি পারব। তুমি পরীক্ষা করে দেখো।”
টুনি কিছুক্ষণ মুনিয়ার দিকে তাকিয়ে রইল, তারপর বলল, “ঠিক আছে। তাহলে তোর জরিপ নেব। আমি তোকে যা প্রশ্ন করব তুই শুধু তার উত্তর দিবি। আর খবরদার হেসে ফেলবি না। ভান করবি যেন তুই আমাকে চিনিস না, আগে কখনো দেখিস নাই।”
“ঠিক আছে। আমি তোমাকে চিনি না। তোমাকে কখনো দেখি নাই।”
টুনি তখন টুম্পার দিকে তাকিয়ে বলল, “টুম্পা তুই তাহলে আমার অ্যাসিস্ট্যান্ট। তুই সবগুলো বই নিয়ে যাবি। লটারির শেষে বইগুলো দেখাবি। সেখান থেকে যে বইটা নিতে চায় নেবে।”
টুম্পা বলল, “ঠিক আছে, বইগুলো দাও।”
টুনি তাদের সবগুলো বই টুম্পার কাছে দিয়ে দিল।
কথা বলার সময় তারা সারাক্ষণই চোখের কোনা দিয়ে বাচ্চাটা আর তার বাবা-মাকে চোখে চোখে রেখেছে। পরিবারটা এখন বাচ্চাদের বইয়ের স্টল থেকে সরে গিয়ে খালি মাঠের দিকে হেঁটে যাচ্ছে। ওরা দেখল কাছাকাছি একটা খালি বেঞ্চ পেয়ে সেখানে বাবা-মা বাচ্চাটাকে নিয়ে বসে পড়েছে। বাচ্চাটা মুখ ভার করে বসে আছে, একটা কথাও বলছে না।
টুনি বলল, “মুনিয়া তুই দৌড়ে যা, ঐ বেঞ্চটাতে বাচ্চাটার পাশে বসে যা। মনে আছে তো তুই আমাকে আর টুম্পাকে চিনিস না?”
মুনিয়া মাথা নাড়ল, বলল, “মনে আছে টুনি আপু। আমি তোমাকে আর টুম্পাপুকে চিনি না। কোনোদিন দেখি নাই।” তারপর দৌড়ে গিয়ে বেঞ্চটাতে বাচ্চাটির পাশে বসে গেল।
টুনি আর টুম্পা কয়েক মিনিট পর বেঞ্চটার দিকে রওনা দিল। টুনির এক হাতে নোট বুক অন্য হাতে একটা কলম। টুম্পার কাছে ব্যাগের ভেতর তাদের সবগুলো বই। বেঞ্চটার কাছে গিয়ে টুনি থেমে যায়, তারপর মুনিয়ার দিকে তাকিয়ে বলল, “আপু, তুমি কী আমাদের একটা জরিপে অংশ নেবে? জরিপে অংশ নিলে তুমি একটা লটারি করতে পারবে–”
মুনিয়া মুখ শক্ত করে বলল, “জরিপ মানে কী?”
টুনি মুনিয়ার উত্তর শুনে মুগ্ধ হলো, এই বয়সী বাচ্চার জরিপ শব্দটা জানা থাকার কথা নয়।
টুনি বলল, “জরিপ মানে হচ্ছে আমি তোমাকে কয়টা প্রশ্ন করব, তুমি তার উত্তর দেবে।”
মুনিয়া বলল, “তুমি কঠিন কঠিন প্রশ্ন করবে না তো? আমি কঠিন কঠিন প্রশ্নের উত্তর দিতে পারব না।”
টুনি মাথা নেড়ে বলল, “না, না, না। মোটেও কঠিন প্রশ্ন করব না। তোমার বই পড়তে ভালো লাগে কী না, কী রকম বই পড়তে ভালো লাগে এ রকম প্রশ্ন।”
“ঠিক আছে। বেশিক্ষণ লাগবে না তো?”
“না। বেশিক্ষণ লাগবে না।”
টুনি তার নোটবই নিয়ে রেডি হলো। পাশে বসে থাকা বাচ্চাটা খুব আগ্রহ নিয়ে পুরো ব্যাপারটা দেখছে। টুনি জিজ্ঞেস করল, “তোমার নাম কী?”
“আমার নাম ঝিলিক।”
টুনি মুচকি হাসল, তারপর নাম লিখে জিজ্ঞেস করল, “ঠিক আছে ঝিলিক, তুমি কোন ক্লাসে পড়ো?”
“আমি বেবি ক্লাসে পড়ি।” টুনি নোট বইয়ে ক্লাসটা লিখে নিল।
“তুমি যদি বেবি ক্লাসে পড়ো তাহলে নিশ্চয়ই এখনো পড়তে শিখোনি।”
মুনিয়া মাথা নেড়ে বলল, “না, না, আমি পড়তে পারি।”
টুনি বলল, “সত্যি পড়তে পারো? বাহ। ঐ যে বইয়ের স্টল আছে সেখানে কী লেখা আছে পড়ো দেখি।”
মুনিয়া বইয়ের স্টলের নামটি পড়ে শোনাল, দিনরাত্রি প্রকাশনী। টুনি খুশি হওয়ার ভান করে বলল, “তুমি কী কোনো বই পড়েছ?”
মুনিয়া বলল, “হ্যাঁ, আমি অনেক বই পড়েছি।”
“ভেরি গুড। তুমি কী বই পড়েছ তার নাম বলো দেখি।”
মুনিয়া বলল, “ছোটদের অ আ ক খ। ছোটদের এ বি সি ডি।”
টুনি মাথা নাড়ল, বলল, “না না পাঠ্যবই না। গল্পের বই না-হয় কবিতার বই, না-হলে কমিক—”
মুনিয়া বলল, “হ্যাঁ পড়েছি। দাদু আর রাম ছাগল, ভূতের বাচ্চা ভুতুয়া, হোজ্জার গল্প—”
টুনি বইয়ের নামগুলো লিখে নেয়ার ভান করতে থাকে। নামগুলো লিখে শেষ করার ভান করে জিজ্ঞেস করল, “তোমার কী রকম বই পড়তে ভালো লাগে? ছবিওয়ালা বই না ছবি ছাড়া বই?”
