শান্ত সেই ভিড়ের মাঝে দাঁড়িয়ে রইল। মোড়ক উন্মোচন করার জন্যে যখন অনেকের হাতে বই দেয়া হয় তখন শান্ত একটা বইয়ের জন্যে হাত বাড়িয়ে দেয়। মাঝে মাঝে একটা বই পেয়ে যায়। সেও সবার সাথে বইয়ের মোড়ক উন্মোচন করে বইটা নিজের কাছে রেখে দেয়। দেখতে দেখতে শান্তর বইয়ের সংখ্যা বাড়তে থাকল। শুধু যে বইয়ের সংখ্যা বাড়িয়ে তুলল তা নয়, মোড়ক উন্মোচনের পর একটু মিষ্টি খাওয়ার আয়োজন থাকে, সেখানে শান্ত একটার পর মিষ্টি খেয়ে যেতে থাকল।
টুনি শান্তকে ছেড়ে মুনিয়া আর টুম্পাকে খুঁজে বের করল। তারা ছোটদের বইয়ের স্টলে বই দেখে যাচ্ছে। এত বই তার মাঝে কোনটা কিনবে সেটা নিয়ে মনস্থির করতে পারছে না। যেটাই দেখে সেটাই তাদের কেনার ইচ্ছা করে। টুনি তাদের বই কিনতে দিয়ে নিজের বইগুলো কিনতে বের হলো। ঘুরে ঘুরে একটা ভূতের বই, একটা গণিতের, আরেকটা প্রোগ্রামিংয়ের বই কিনল। তখনো কিছু টাকা রয়ে গেছে, সেই টাকা দিয়ে নতুন কোনো ভালো বই কেনা যাবে না, তাই ঠিক করল টাকাটা টুম্পা না হয় মুনিয়াকে দিয়ে দেবে। নিজেদের টাকার সাথে মিলিয়ে হয়তো ভালো কোনো একটা বই কিনে ফেলতে পারবে।
দুজনকে ছোটদের বইয়ের স্টলের একেবারে শেষ মাথায় খুঁজে পাওয়া গেল। তখনো বই ঘাঁটাঘাঁটি করছে। টুনিকে দেখে মুনিয়া প্রায় ছুটে তার কাছে এসে গলা নামিয়ে ফিসফিস করে বলল, “টুনি আপু, কি হয়েছে জানো?”
মুনিয়া কাছাকাছি একটা স্টলের সামনে একজন বাবা আর মা এবং সাথে ছয়-সাত বছরের একটা ছেলেকে দেখিয়ে বলল, “ঐ ছেলেটাকে দেখেছ?”
“হ্যাঁ। দেখেছি। কী হয়েছে ছেলেটার?”
“ছেলেটা কাঁদছে দেখেছ?”
টুনি তখন লক্ষ করল আসলেই বাচ্চাটা ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে।
মুনিয়া বলল, “কেন কাঁদছে জানো?”
“কেন?”
“বাচ্চাটা একটা বই কিনতে চাইছিল, তার আব্লু-আম্মু বইটা কিনে দিবে না, সেই জন্যে কাঁদছে।”
“কেন কিনে দেবে না?”
মুনিয়া বলল, “জানি না। কী সুন্দর একটা ভূত আর রাক্ষসের বই তবু তার আব্বু-আম্মু কিনে দিচ্ছে না।”
বইটা কেন কিনে দিচ্ছে না মুনিয়া না জানলেও টুনির কারণটা বুঝতে দেরি হলো না। বাবা-মাকে দেখেই বোঝা যাচ্ছে তারা খুবই সাধারণ মানুষ, টাকা-পয়সা বেশি নেই। বাচ্চাকে নিয়ে বইমেলায় এসেছে কিন্তু বাচ্চাকে তার ইচ্ছা মতোন দামি বই কিনে দেবার ক্ষমতা নেই। টুনির বাচ্চাটার জন্যে যেটুকু মায়া হলো তার আব্বু-আম্মুর জন্যে তার থেকে অনেক বেশি মায়া হলো।
মুনিয়া বলল, “টুনি আপু, আমরা বাচ্চাটাকে বইটা কিনে দেই?”
টুনি মাথা নাড়ল, বলল, “না। আমরা বইটা কিনে দিলে তার আব্বু আম্মু লজ্জা পাবে। এমনি এমনি বইটা নিতে রাজি নাও হতে পারে।”
“কিন্তু দেখো বাচ্চাটা কীভাবে কাঁদছে। দেখে আমার একটু একটু কান্না এসে যাচ্ছে।” সত্যি সত্যি মুনিয়ার গলা কান্না কান্না হয়ে গেল।
টুনি একটু চিন্তা করল, তারপর বলল, “দেখি কী করা যায়। তুই যা, টুম্পাকে ডেকে আন।”
মুনিয়া তার বইয়ের ভারী ব্যাগটা টুনির কাছে রেখে টুম্পাকে ডেকে আনতে গেল। টুনি বাবা-মা আর বাচ্চাটার দিকে নজর রাখে তারা যেন চোখের আড়াল না হয়ে যায়। টুনি দেখতে পেল বাবা বইয়ের স্টল থেকে সস্তা একটা বই কিনে দিতে চাইছে কিন্তু বাচ্চাটা রাজি হচ্ছে না। সে এখন আর কাঁদছে না কিন্তু অভিমানে মুখটা ভার করে রেখেছে।
মুনিয়া গিয়ে টুম্পাকে ধরে এনেছে, টুম্পা জিজ্ঞেস করল, “টুনি আপু তুমি ডেকেছ?”
“হ্যাঁ। আমাদের এখন একটা মিশন কমপ্লিট করতে হবে।”
“মিশন কমপ্লিট?”
“হ্যাঁ।”
“কী মিশন?”
টুনি সামনের স্টল থেকে বাবা-মায়ের সাথে হেঁটে যেতে থাকা বাচ্চাটাকে দেখিয়ে বলল, “ঐ যে বাচ্চাটা দেখছিস, এই বাচ্চাটাকে তার আব্বু-আম্মু একটা বই কিনে দেয় নাই–”
টুনি কথা শেষ করার আগেই টুম্পা বলল, “আমি দেখেছি। ভূত আর রাক্ষসের বই। বইটার দাম দুইশ টাকা। বাবা-মায়ের কাছে এত টাকা নাই। আমি দেখেছি বাবা তার মানিব্যাগটা কয়েকবার দেখেছে–”
টুনি বলল, “তাহলে তো তুই জানিস। বাচ্চাটার কান্না দেখে মুনিয়ার কান্না পেয়ে যাচ্ছে তাই এখন আমাদের এই বাচ্চাটাকে এই বইটা কিনে দিতে হবে। কিন্তু এমনভাবে দিতে হবে যেন তারা কিছুতেই বুঝতে না পারে আমরা কিনে দিচ্ছি, তাহলে বাচ্চার আব্বু-আম্মু লজ্জা পাবে। কারো যখন টাকা থাকে না তখন গায়ে পড়ে তাদের সাহায্য করলে লজ্জা পায়।”
“তাহলে কীভাবে দিতে হবে?”
“আমি একটা প্ল্যান করেছি। তার আগে তুই গিয়ে দৌড় দিয়ে বইটা কিনে আন। মুনিয়া তুই এই বাচ্চাটা আর তার আব্বু-আম্মুকে চোখে চোখে রাখ যেন ভিড়ের মাঝে হারিয়ে না যায়।”
টুম্পার কাছে যথেষ্ট টাকা ছিল না। তাই টুনি আর টুম্পার বাড়তি টাকাটাও দিতে হলো, টুম্পা সেই টাকা নিয়ে বই কিনতে গেল। মুনিয়া একটা কাজ পেয়ে খুবই খুশি হলো। সে বাচ্চাটাকে দূর থেকে চোখে চোখে রাখতে লাগল যেন হারিয়ে না যায়। টুনি তখন তার ব্যাগ থেকে তার নোট বইটা বের করল, তারপর সেখান থেকে কয়েকটা পৃষ্ঠা ছিঁড়ে সেগুলো ছোট ছোট টুকরায় ভাগ করল। তারপর প্রত্যেকটা কাগজের টুকরায় লিখল “বিজয়ী” তারপর সেই কাগজগুলোকে ভাজ করে রাখল যেন ভেতরে কী লেখা আছে দেখা না যায়।
