টুম্পা জিজ্ঞেস করল, “সবাই টাকা পাবে ছোটাচ্চু?”
“হ্যাঁ। সবাই।”
“ঝুমু খালা?”
“একশবার। ঝুমু যদি বইমেলায় যায়, ঝুমুও পাবে।”
মুনিয়া জিজ্ঞেস করল, “ঝুমু খালা তুমি কী বই কিনবে?”
ঝুমু খালা মুখ গম্ভীর করে বলল, “বইমেলায় গিয়ে দেখি কী বই আছে।”
“তুমি পড়তে পারো?”
“পারি না আবার? বানান করে করে সব পড়তে পারি। ইংরেজিটা খালি সমস্যা হয়।”
শান্ত তখন হাত পেতে বলল, “ছোটাচ্চু, আমার পাঁচশ টাকা এখনই দিয়ে দাও।”
“এখন? এখন কেন দেব?”
“তাহলে কখন দেবে?”
“বইমেলায় যখন যাবি তখন পাবি। আমি সবাইকে বইমেলায় একটা খাম ধরিয়ে দেব।”
মুনিয়া উত্তেজিত হয়ে জিজ্ঞেস করল, “নোটগুলো কি নতুন দিবে নাকি পুরাতন?”
ছোটাচ্চু হাসল, হেসে বলল, “অবশ্যই কড়কড়া নতুন নোট!”
মুনিয়া আনন্দে দাঁত বের করে হাসল। তাকে দেখে মনে হলো, পাঁচশ টাকা পাবে সেটা নিয়ে যত আনন্দ, তার থেকে বেশি আনন্দ কারণ নোটগুলো হবে কড়কড়ে নতুন নোট!
.
দু’দিন পর সবাই দলবেঁধে বইমেলায় হাজির হলো। শেষ পর্যন্ত অবশ্য দাদি এবং ঝুমু খালা আসতে পারল না, বাসায় মেহমান আসার কারণে দুজনেই ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। ছোটাচ্চু সবার হাতে একটা করে খাম ধরিয়ে দিল। সেই খাম খুলে দেখা গেল সত্যি সত্যি তার ভেতরে কড়কড়ে পাঁচটা একশ টাকার নোট। কড়কড়ে নোটগুলো ধরে উত্তেজনায় মুনিয়ার নিশ্বাস বন্ধ হয়ে যাবার অবস্থা। পাঁচশ টাকা দিয়ে পৃথিবীর কত কিছু কিনে ফেলা যায় কিন্তু ছোটাচ্চু বলে দিয়েছে বই ছাড়া আর কিছু কেনা যাবে না। শুধু বই-ই কিনতে হবে। যা ইচ্ছা তা-ই কিনতে দিলে আরও ভালো হতো কিন্তু শুধু বই কিনতেও মুনিয়ার কোনো আপত্তি নেই।
টুনি শান্তকে জিজ্ঞেস করল, “শান্ত ভাইয়া, তুমি কী বই কিনবে?”
শান্ত উদাস মুখে বলল, “আমি বই কিনে টাকা নষ্ট করব না।”
“কিন্তু ছোটাচ্চু বলেছে এই টাকা নিয়ে বই-ই কিনতে হবে।”
“ছোটাচ্চুকে পাঁচশ টাকার বই দেখালেই তো হলো।”
“বই না কিনে কেমন করে দেখাবে?”
শান্ত নিজের মাথায় টোকা দিয়ে বলল, “তুই দেখ আমি কীভাবে ম্যানেজ করি।”
শান্ত কীভাবে বই ম্যানেজ করে দেখার জন্যে টুনি তার পিছু পিছু গেল। শান্ত কয়েকটা বইয়ের স্টল ঘুরে একটা স্টলের সামনে দাঁড়াল। সেই স্টলে একজন কমবয়সী কবি একটা কলম হাতে করে খুব আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করছে, কেউ তার বই কিনলেই সে একটা অটোগ্রাফ দেবে। কিন্তু কেউ তার বই কিনছে না।
শান্ত একটু অপেক্ষা করে কমবয়সী কবির নামটা বের করে ফেলল, নামটা যথেষ্ট কায়দার নাম, তুফান তূর্য। শান্ত তখন কবির দিকে এগিয়ে গেল, তাকে জিজ্ঞেস করল, “আপনি কবি তুফান তূর্য?”
কবি তুফান সূর্যের চোখ চকচক করে উঠল, বলল, “হ্যাঁ। কেন?”
“না, এমনি। আপনার নাম অনেক শুনেছি তো।”
কবি এবারে রীতিমতো উত্তেজিত। বলল, “আমার নাম শুনেছ? কার কাছে শুনেছ?”
“আমার আপুর কাছে। ইউনিভার্সিটিতে পড়ে। ইংরেজিতে অনার্স।”
টুনি কাছাকাছি দাঁড়িয়ে শান্তর বানিয়ে বানিয়ে কথা বলার ক্ষমতা মুগ্ধ হয়ে দেখতে থাকে।
কবি তুফান তূর্য বলল, “তোমার বোন কবিতা পড়ে বুঝি?”
শান্ত মাথা নাড়ল, বলল, “খুব খুঁতখুঁতে। সবার কবিতা পড়তে চায় না। আপনারটা পড়ে।”
“তাই বুঝি?”
“হ্যাঁ। আপনার কবিতার বই বের হয়েছে?”
কবি তুফান তূর্য বলল, “হ্যাঁ। আমার প্রথম বই। নৈঃশব্দ্যের কান্না।”
“আমার আপু খুশি হবে। একটা কিনে নিয়ে গেলে অনেক খুশি হতো। একটা অটোগ্রাফসহ।”
“কিনে নিয়ে যাও একটা কপি। অটোগ্রাফ দিয়ে দিব।”
“কেমন করে কিনব? সব টাকা খরচ করে ফেলেছি।” বলে শান্ত খুবই বিষণ্ণ মুখে হাঁটতে শুরু করল, কয়েক পা হাঁটতেই কবি তাকে ডাকল, “এই যে ছেলে, শুনো।”
শান্ত এগিয়ে এলো। কবি তুফান তূর্য বলল, “আমি তোমার বোনকে একটা কবিতার বই অটোগ্রাফসহ দিয়ে দিই। কী বলো?”
“খুবই ভালো হয় তাহলে। আমার আপু যে কী খুশি হবে চিন্তাও করতে পারবেন না। আপনাকে অসম্ভব পছন্দ করে তো!”
কবি তুফান তূর্য তার লেখা একটা কবিতার বই নিয়ে শান্তকে জিজ্ঞেস করল, “কী নাম তোমার আপুর?”
“শান্তা।” কবি তুফান তূর্য বড় বড় করে লিখল,
প্রিয় শান্তাকে
অনেক ভালোবাসা।
তুফান তূর্য
শান্ত বইটা হাতে নিয়ে হাসি হাসি মুখে বের হয়ে এলো। স্টল থেকে বেশ খানিকটা সরে যাবার পর টুনি শান্তর কাছে এসে বলল, “শান্ত ভাইয়া”
শান্ত দাঁত বের করে হেসে বলল, “দেখলি, কেমন করে একটা বই ম্যানেজ করলাম? দেড়শ টাকা দাম!”
“দেখেছি।” টুনি বলল, “কাজটা একেবারে ঠিক হলো না। তুমি কেমন করে এত মিথ্যা কথা বলতে পারো? কবি তুফান তূর্যকে তুমি এইভাবে ঠকালে?”
“মোটেও ঠকাই নাই। উৎসাহ দিয়েছি। এখন এই মানুষটা কত উৎসাহ পেল চিন্তা করতে পারবি?”
“তাই বলে এইভাবে মিথ্যা কথা বলবে?”
“যা যা ভাগ।”
“তা ছাড়া বইয়ে লিখেছে শান্তা-তোমার নাম শান্ত।”
শান্ত হাত নেড়ে উড়িয়ে দিল। বলল, “একটা মাত্র আকার! ওটা কোনো ব্যাপারই না। ঘষে তুলে ফেলব।”
শান্ত তখন আরো ফ্রি বই ম্যানেজ করার জন্যে এগিয়ে গেল। এবারে সে গেল বইয়ের মোড়ক উন্মোচন করার জায়গায়। সেখানে অনেক ভিড়। মানুষ ঠেলাঠেলি করছে, তার মাঝে একটার পর একটা বইয়ের মোড়ক উন্মোচন হচ্ছে। লেখক তার বইগুলো রঙিন কাগজে মুড়ে নিয়ে আসছে, লেখকের ছেলে-মেয়ে-স্ত্রী ফুল নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে তখন একজন বুড়ো মতন গুরুত্বপূর্ণ মানুষ আসে। তাকে প্রথমে ফুল দেয়া হয় তারপর সবার হাতে একটা করে বই দেয়া হয়, একজন মানুষ তখন বই এবং লেখক নিয়ে কিছু কথা বলে, তারপর সবাই বইয়ের মোড়ক খুলে। তখন হাততালি দেয়া হয়, সবাইকে নিয়ে ছবি তোলা হয়।
