মধ্যবয়সী কর্তার এই বিলাসিতার বিষয়টি প্রথমে জানে বাড়ির গিন্নিমা। পরে পাশের বাড়ি। তারপরে পাড়াসুদ্ধ। সবশেষে আস্ত গাঁয়ের লোক। তবে অনেক সময় অনেক মুখরা স্বভাবের কাজের মেয়েগুলোকে বাগে আনা বেশ কঠিন হয়ে পড়ে। কাজ থেকে অব্যাহতি পেলে তারা নিজেরাই এধরনের কুৎসা রটিয়ে মালিকপক্ষকে বিপাকে ফেলতে সচেষ্ট হয়। মধ্য বয়সী পুরুষদের এরকম সঙ্কটময় যৌনজীবনের বিড়ম্বনা নতুন কোনও ঘটনা নয়। এসব কুকীর্তির সংবাদ বেশিদিন চাপাও থাকে না।
একা এবং সুযোগ পেলেই নাগালের মেয়েগুলোর স্তন টেপাটেপি করতে যেন আর তর সয় না কামার্ত পুরুষগুলোর। তা সে দুই বছরই হোক ষোল বছরই হোক। আদর করার নাম করে ঘরের দরজা বন্ধ করে কোলে বসিয়ে নিয়ে নিজেদের পুরুষাঙ্গটি ঘষতে থাকে অপ্রাপ্ত বয়সীর যোনিদেশে। মেয়ের বয়সী শিশুটির হাফ প্যান্টের ফাঁকে পুরুষাঙ্গ ঢুকিয়ে কতই না রক্ত ঝরায়! অসহায় শিশুটির কিছুই বলার থাকে না; অনভ্যস্ত ব্যথায় চোখের জল ঝরানো ছাড়া। শিশুটির ফুলে ওঠা রক্তাক্ত, বিক্ষত যৌনাঙ্গ মায়ের চোখ এড়িয়ে যায়। সুযোগ পেলেই আদর করার ছলে, চাচা, মামা, নানা, অমুক ভাই ওরা মেয়েদের টেনে নিয়ে যায় একলা ঘরে। ছোটবেলার কত অভিজ্ঞতা। ক’টা বলবো? মনে পড়ে বুলবুলির মায়ের কথা। অকাল বিধবা। মাথাভর্তি কালো চুল। গড়িয়ে পড়া যৌবন। সাদা ধুতির নিচে পরিপুষ্ট স্বাস্থ্যের বর্তুল স্ফীতি হাঁটার সময় জোয়ারের জলের মতো দু’পাশে ডাইনে-বাঁয়ে দোলে। সুযোগ পেলে বুলবুলির মা নিজেই দালানের পেছনে যেত বাড়ির মালিকের সঙ্গে। আর বুলবুলি যেত কর্মচারী ছোঁড়ার সঙ্গে পায়খানায় প্রায় প্রতিদিনই। যথানিয়মে একদিন বুলবুলির মায়ের পেট ফুলে ওঠে। জানতে পেরে মালিকের বৌ তাকে নিয়ে যায় কবিরাজের কাছে। বুলবুলিরও পেট ফোলে। যায় পীর-ফকিরের কাছে। এ-রকম এক গোলমেলে পরিস্থিতিতে বুলবুলির মায়ের মৃত্যু সংবাদ কোনও সংবাদই হলো না। আপদ গ্যাছে। মা নেই তাই মেয়ের কথা কে বলবে! বুলবুলির পেট হলে তের বছরের বুলবুলি, মেয়ের মা হয়। জীবন সংগ্রামে ব্যর্থ হয়ে যোব বছর বয়সে বুলবুলি, পৃথিবীর সবচেয়ে পুরানো এবং সহজ কাজ খুঁজে পেতে বেশ্যা খাতায় নাম লেখায়।
খ. গ্রামের ফকিরগুলোকে কাজ দিতে চাইলে ওরা কিছুতেই রাজি হয় না। যদি বলা হয়, ‘জোয়ান বেডি কাম কর না কিল্লাই!’ বিরক্ত হয়ে মুখটা ঘুরিয়ে ভিক্ষের অপেক্ষা না করেই চলে যায়। দিনের বেলায় এদিক-ওদিক ঘুরে ফিরে। ভিক্ষে করাটাই ওরা স্বাধীন পেশা হিসেবে সম্মানজনক মনে করে। আর রাত্রিবেলায় শহরের এর-ওর হাত ধরে চলে যায় অন্ধকারে। কেউ চালার তলে। কেউ গাঙিনার পারে, কেউ পরিত্যক্ত জমিদার বাড়ির বিশাল দেয়ালের ওপারে। গ্রামে এগুলো কোনও ব্যাপারই নয়।
‘ভাত জোটে না। আবার পেড হইছে! ক্যান হইছে! আগে মনে থাকে না? ক এইডার বাপ কেডা।’ বিলকিস উত্তর দেয় না। ওর মুখ-চোখ ভাঙা। পেটটা মাটির দিকে ঝুলছে। মনে হয় এক্ষুণি প্রসব হয়ে যাবে। ভাত নিয়ে সে চলে যায়। এক সপ্তাহ পর ফিরে আসে বাচ্চা কোলে নিয়ে। আমরা উৎসুক হয়ে বাচ্চা দেখি। কাপড় দিই। দুধ দিই। দুধ না থাকলে কেনার পয়সা দিই। দিই আর অবাক হয়ে দেখি। দেখি শহরের অনেক ভিখিরির কোলের বাচ্চাগুলো যতই বড় হয় ওদের চেহারাগুলো ততই ধীরে ধীরে মনে হয় দীনু কাকা, নান্টু, বিন্দু, মিজান, মিন্টু ওদের মতো হয়। মকবুল যতই বড় হয় ততই ওর নাক-চোখ-ঠোঁট হয় চেয়ারম্যানের মতো। বিলু যতই বড় হয় দেখতে হয় আমার আপন কাকার মতো; অবিকল একই চেহারার।
ফকিরনিকে ধমকে জিজ্ঞেস করি। বলি, কাউরে কমু না। সে আমার কথার কোনও উত্তর দেয় না। শুধু বিস্মিত চোখ অন্যদিকে ফিরিয়ে রাগ রাগ চেহারা করে তাকিয়ে থাকে। থেকে বলে, ভাত দিলে দ্যান। খালি খালি, এতো কথা জিগান ক্যান …।
গ. একবার আমাদের গ্রামে এক সাধু আস্তানা গাড়লেন। এসেছেন তিনি পাবনা থেকে সর্বরোগের নিরাময় করতে পারবে বলে ঘোষণা দিলে মানুষের ঢল নামে তার আস্তানার দিকে। পয়সার বিনিময়ে তিনি ঝাড়-ফুক, তাবিজ-জলপড়া ইত্যাদি দেন। মেয়েদের নিয়ে যান একলা ঘরে। একা, তাদেরকে সেখানে হিফাজতশেষে, স্বামীদের কপালে দেন লক্ষ টাকা আয়ের ফু-দোয়া-তাবিজ-কবজের গ্যারান্টি। নিঃসন্তান পিতামাতাকে দেখান ন্যূনতম পাঁচটি সন্তানের স্বপ্ন। মৃতপ্রায় রোগীকে দেখান গোলাপি জীবনের স্বপ্ন। আর তিনি নিজে হতে থাকেন বিত্তশালী। বাড়তে থাকে তার আস্তানা। বাড়ে ভিড়।
রোগী মরে যায়। সেসব নিঃসন্তান মহিলাকে দেখে ডাক্তার বলেন তার জরায়ুই নেই তো সন্তান ধারণ করতেন কি করে! আর যে মেয়েদের তিনি একা একা একলা ঘরে নিয়ে হিফাজত করেছিলেন, তাদের প্রত্যেকের পেটের পরবর্তী সস্তানের আদল সেই সাধুরই। আর গরিব পুরুষেরা বড়লোক হতে চেয়ে দক্ষিণা দিয়ে দিয়ে নিঃস্ব হতে থাকে। না দিলে বাবা-ভোম ভোলানাথ ভীষণ ক্ষেপে গিয়ে অভিশাপ দেন। তাকে ভয় পাবে না এমন সাধ্য কার! তার অস্ত্র ধর্ম। ধর্মের দোহাই। সন্দেহ, যৌন অপকর্মকে উতরিয়ে যায়। ধর্ম, যৌন অপকর্মকে উতরিয়ে। যায়, মন্দির-মসজিদ-মাদ্রাসা-গির্জা-পেগোডায়, যায় ধর্মবোধের দোহাই দিয়ে। মানুষের প্রাত্যহিক জীবনে তখন ধর্মচর্চা হয়ে ওঠে মানবজীবনের একটি অন্যতম অলঙ্কার। আর সেই সুযোগে চলে যাবতীয় যৌন অপকর্ম।
