জুতার স্পর্শ ত্যাগ করিয়া গণপতি পবিত্র হইলে, পিসিমা প্রসাদি ফুল লইয়া তাহার কপালে ঠেকাইলেন, তারপর হাতে দিলেন প্রসাদ এবং আজও আধা-মমতা আধা-ধমকের সুরে তাহার চিরন্তন অনুযোগটা শুনাইয়া দিলেন–ঠাকুরদেবতা কিছু তো মানবি নে, শুধু অনাচার করে বেড়াবি।
এ ঘরে কেহ কিছু বলিল না; কিন্তু পাশের ঘরের দরজার ওদিক হইতে অস্ফুট কণ্ঠে শোনা গেল, মাগো।
পিসিমা চমকাইয়া বলিলেন, কে গো ওখানে বৌমা?
পরিমল জিজ্ঞাসা করিল, কী হল রে রমা?
রমার আর কোনো সাড়াশব্দ পাওয়া গেল না। পরিমলের কোলের ছেলেটি মেঝেতে হামা দিতে দিতে নাগালের মধ্যে আসিয়া পড়িয়াছিল, গণপতি হাত বাড়াইয়া তাকে কোলে তুলিয়া লইল–ওকে আদর করিবার ছলে মাথা হেঁট করিয়া থাকা সহজ। রাজেন্দ্রনাথ কাঁপা গলায় বলিলেন, দ্যাখ তো সুহাস, মেজ-বৌমার কী হল? ফিট-টিট হল নাকি?
পরিমল বলিল, তুই বোস, আমি দেখছি।
উঠিয়া গিয়া নিচুগলায় রমাকে কী যেন জিজ্ঞাসাবাদ করিয়া সে ফিরিয়া আসিল; বলিল, না, কিছু হয় নি।
কিছু না। একেবারেই কিছু হয় নাই। কী হইবে ওই পাথরের মতো শক্ত মেয়েমানুষটার? এই যে এতকাল গণপতি জেলখানায় আটক ছিল, ফাঁসি এড়ানোর ভরসা কয়েকদিন আগেও তাহার ছিল না,রমা কি একদিন আবেগে ভাঙিয়া পড়িয়াছিল, কাঁপিতে কাঁপিতে কাঁদিতে কাঁদিতে ননদ, জা কারো বুকে একবার আশ্রয় খুঁজিয়াছিল, কারোকে টের পাইতে দিয়াছিল–তার কিছুমাত্র সান্ত্বনার প্রয়োজন আছে? এ কথা সত্য যে, যেদিন হইতে গণপতিকে পুলিশে ধরিয়াছিল, সেদিন হইতে সে হাসিতে ভুলিয়া গিয়াছে, দিনের পর দিন কথা কমাইয়া কমাইয়া প্রায় বোবা হইয়া গিয়াছে, রোগা হইতে হইতে সোনার বরন তাহার হইয়া গিয়াছে কালি। তা, সেটা আর এমন কী বেশি! দুঃখের ভাগ তো সে দেয় নাই, সান্ত্বনা তো নেয় নাই, লুটাইয়া বুকফাটা কান্না তো কাঁদে নাই।
একদিন বুঝি কাঁদিয়াছিল। শুধু একদিন!
গভীর রাত্রে বাড়ির সকলে তখন ঘুমাইয়া পড়িয়াছে–সুহাস ছাড়া। সেদিন সুহাসের বর আসিয়াছিল, তাই বর-বৌ দুজনেরই হইয়াছিল অনিদ্রা-রোগ। অত রাত্রে ঘর ছাড়িয়া বাহির হইয়া দুজনে হাত ধরাধরি করিয়া রমার ঘরের সামনে দিয়া তাদের কোথায় যাওয়ার প্রয়োজন হইয়াছিল–সে কথা বলা মিছে। নিজের ঘরে রমা একা থাকিত, এখনো তাই থাকে। অনেক বলিয়া অনেক বকিয়াও তাকে কারো সঙ্গে শুইতে রাজি করা যায় নাই। এমনকি শ্বশুরের অনুরোধেও না।
যাই হোক, রমার ঘরের সামনে সুহাস থমকিয়া দাঁড়াইয়া ছিল। কান পাতিয়া ঘরের মধ্যে বিশ্রী একটা গোঙানির আওয়াজ শুনিয়া ভয়ে বেচারির স্বামী সোহাগে তাতানো দেহটা হইয়া গিয়াছিল হিম। বরকে ঘরে পাঠাইয়া, তারপর সে ডাকিয়া তুলিয়াছিল পরিমলকে; বলিয়াছিল, বড়মামি, ঘরের মধ্যে মেজমামি গোঙাচ্ছে, শিগগির এসো।
গোঙাচ্ছে? ডাক ডাক তোর মামাকে ডেকে তোল, সুহাস!–কী হবে মা গো!
পশুপতিকে পিছনে করিয়া পা টিপিয়া টিপিয়া গিয়া পরিমল খানিকক্ষণ রুদ্ধ দরজায় কান পাতিয়া রমার গোঙানি শুনিয়াছিল। তারপর জোরে জোরে দরজা ঠেলিয়া ডাকিয়াছিল, মেজ-বৌ! ও মেজবৌ, শিগগির দরজা খোল।
প্রথম ডাকেই গোঙানি থামিয়া গিয়াছিল, কিন্তু তারপর অনেক ডাকাডাকিতেও রমা প্রথমে সাড়া দেয় নাই। শেষে ধরা গলায় বলিয়াছিল, কে?
আমি। দরজা খোল তো মেজ-বৌ, শিগগির।
কেন দিদি?
পরিমল অবশ্য সে কৈফিয়ত দেয় নাই, আরো জোরে ধমক দিয়া আবার দরজাই খুলিতে বলিয়াছিল। রমারও আর দরজা না খুলিয়া উপায় থাকে নাই।
কী হয়েছে দিদি?
তুই গোঙাচ্ছিলি কেন রে, মেজ-বৌ? রমা বিস্ময়ের ভান করিয়া বলিয়াছিল, গোঙাচ্ছিলাম? কে বললে?
বারান্দার আলোয় রমার মুখে চোখের জলের দাগগুলি স্পষ্টই দেখা যাইতেছিল। একটু থামিয়া ঢোক গিলিয়া পরিমল বলিয়াছিল–আমি নিজে শুনেছি, তুই তবে কাঁদছিলি?
না, কাঁদি নি তো! কে বললে কাঁদছিলাম?-বলিয়া পশুপতির দিকে নজর পড়ায় রমা লম্বা ঘোমটা টানিয়া দিয়াছিল।
তখন পরিমল বলিয়াছিল, আমি আজ তোর ঘরে শোব রমা?
রমা বলিয়াছিল, কেন?
কী কৈফিয়তই যে মেয়েটা দাবি করিতে জানে! অফুরন্ত!
পরিমল ইতস্তত করিয়া বলিয়াছিল, ভয়টয় যদি পাস—
রমা বলিয়াছিল, ভয় পাব কেন? আমার অত ভয় নেই… বড্ড ঘুম পাচ্ছে দিদি।
বলিয়া সকলের মুখের উপর দরজা বন্ধ করিয়া দিয়াছিল। কী রূঢ় ব্যবহার! মনে। করলে আজও পরিমলের গা জ্বালা করে।
যাই হোক, তার পর হইতে রাত্রে বাহিরে গেলে বাড়ির অনেকেই চুপিচুপি রমার ঘরের দরজায় কান পাতিয়া ভিতরের শব্দ শুনিবার চেষ্টা করিয়াছে। কিন্তু আর কোনোদিন কিছু শোনা যায় নাই।
শোনা যাইবে কী, রমা কি সহজ মেয়ে! হোক না স্বামীর ফাঁসি, সে দিব্যি মস্ত একটা ঘরে সারারাত একা নাক ডাকাইয়া ঘুমাইতে পারে। আজ হঠাৎ অস্ফুট স্বরে একবার মাগো বলিয়া ফেলিয়াছে বলিয়াই ওর যে কিছু হইয়াছে–এ কথা মনে। করিবার কোনো প্রয়োজন নাই।
মিস্টার দের কড়া সিগার টানিয়া পশুপতির বোধ হয় গলাটা খুসখুস করিতেছিল, সে আর একবার গলা সাফ করিয়া বলিল, রেণুর জন্য তুমি ভেবো না গনু। ওকে আসতে দেয় নি বটে, কিন্তু ওকে কষ্ট ওরা দেয় না।
বিবাহের পর প্রথম শ্বশুরবাড়ি গিয়া আর আসিতে না দিলে, মোল বছরের মেয়েকে কষ্ট দেওয়া হয় কি না, গণপতি ধারণা করিয়া উঠিতে পারিল না; কিন্তু বোনটার জন্য তার নিজের বড় কষ্ট হইতে লাগিল। মৃদুস্বরে সে বলিল, ওকে একটা তার করে দিলে হত না?
