সহ্যশক্তি রমারও কম নয়। আজ কতকাল সে খুনি-আসামির বৌ হইয়া বাঁচিয়া আছে–অপাপবিদ্ধ পবিত্র মানুষের ঘরকন্নার মধ্যে পাড়ার একপাল ভদ্রমহিলার কৌতুক ও কৌতূহল-মেশানো সহানুভূতির আকণ্ঠ আবর্তে। কতদিন ধরিয়া সে অহোরাত্রি যাপন করিয়াছে–স্বামীর আগামী ফাঁসির তারিখের বৈধব্যকে ক্রমাগত বরণ করিয়া করিয়া! আপিল যদি না করা হইত–আজ রাত্রি প্রভাত হইলে কারো সাধ্য ছিল না রমাকে বৌ করিয়া রাখে। তবু এখনো লাইব্রেরিঘরে ঢুকিবার দরজার আড়ালে পাষাণপ্রতিমার মতো তাহার দাঁড়াইয়া থাকিবার ভঙ্গি দেখিলে অবাক হইয়া যাইতে হয়। না আছে চোখে ভয়, না আছে দেহে শিহরণ। পাষাণপ্রতিমার মতোই। তার কাঠিন্য যেন অকৃত্রিম। গণপতি যে মূৰ্ছিত হইয়া পড়িয়া গেল, তাতেও যেন তার। কিছু আসিয়া গেল না। এক পা আগানো দূরে থাক, এক পা পিছাইয়া লাইব্রেরিঘরের ভিতরে আত্মগোপন করাটাই সে যেন ভালো মনে করিল। স্বামীর,-সত্যবানের মতোই যে স্বামী তাহার–মৃত্যুর কবল হইতে ফিরিয়া আসিয়াছে, সেই স্বামীর মূৰ্ছা ভাঙিবার কী আয়োজন হইল, একবার তাহা চাহিয়া দেখিবার শখটাও অন্ততপক্ষে রমার গেল কোথায়? এ কৌতূহল যে-মেয়েমানুষ দমন করিতে পারে-ধরিত্রীর মতো তার সহ্যশক্তিও সত্যই অতুলনীয়-মৃত ও অসাড়!
মাথায় জল দিতে দিতে অল্পক্ষণ পরেই গণপতির জ্ঞান ফিরিয়া আসিল। জামাকাপড় বদলাইয়া এক বাটি গরম দুধ খাইয়া সে সকলের সঙ্গে ভিতরের বড় ঘরে গিয়া বসিল। পশুপতি একবার প্রস্তাব করিয়াছিল যে, গণপতি নিজের ঘরে গিয়া। বিছানায় শুইয়া বিশ্রাম করুক। গণপতি নিজেই তাহাতে রাজি হইল না। মূৰ্ছা ভাঙিবার পর নিজেকে লুকানোর ইচ্ছাটা কী কারণে যেন তাহার কমিয়া গিয়াছে। অনেক জল ঢালবার ফলে মাথাটা বোধ হয় তাহার ঠাণ্ডা হইয়া আসিয়াছিল, সকলের সঙ্গে কথা বলিবার জন্য এতক্ষণে সে একটু একটু আগ্রহই বরং বোধ করিতে লাগিল।
অল্পে অল্পে একথা-সেকথা হইতে কথাবার্তা অনেকটা সহজ হইয়া আসিল। ছ-মাসের মধ্যে আত্মীয়স্বজন অনেকের সঙ্গেই বহুবার গণপতির দেখা হইয়াছে, তবু সে এমনভাবে কথা বলিতে লাগিল, যেন ওই সময়কার পারিবারিক ইতিহাসটা ঘুর্ণাক্ষরে জানিবার উপায়ও তাহার ছিল না। তিন মাস আগে জেলে বসিয়া পশুপতির কাছে বাড়ির যে ঘটনার কথা শুনিয়া সে আশ্চর্য হইয়াছিল, আজ পিসিমার মুখে সেই ঘটনার কথা শুনিয়া সে নবজাগ্রত বিস্ময় বোধ করিল, এমনকি–যে ব্যাপার এখানে সে স্বয়ং প্রত্যক্ষ করিয়া জেলে গিয়াছিল–পরিমল তার বর্ণনা দিতে আরম্ভ করিলে, আজই যেন প্রথম শুনিতেছে এমনিভাবে শুনিয়া গেল। স্মৃতি, চিন্তা, অনুভূতি, কল্পনা প্রভৃতি গণপতির ভিতরে কমবেশি জড়াইয়া গিয়াছে সত্য, তবু জানা কথা ভুলিবার মতো অন্যমনস্কতা তো ফাঁসির আসামিরও আসিবার কথা নয়! কিন্তু এই অভিনয়ই গণপতির ভালো লাগিতেছিল। এমনই উৎসুকভাবে একথা-সেকথা জানিতে চাহিলে এবং তার জবাবে যে যাই বলুক গভীর মনোযোগর সঙ্গে তাই শুনিয়া গেলে, ক্রমে ক্রমে তার নিজের ও অন্যান্য সকলেরই যেন বিশ্বাস জন্মিয়া যাইবে দীর্ঘকালের জন্য সে দূরদেশে বেড়াইতে গিয়াছিল। এতদিন তার গৃহে অনুপস্থিত থাকিবার আসল কারণটা সকলে ভুলিয়া যাইবে।
হয়তো তাই যাইতে লাগিল এবং সেইজন্য হয়তো যখন আবার ওই আসল কারণটা মনে পড়িবার অনিবার্য কারণ ঘটিতে লাগিল, সকলেই যেন তখন হঠাৎ একটু একটু চমকাইয়া উঠিতে লাগিল। গণপতিকে পুলিশে ধরিবার অল্প কিছুদিন আগে মহাসমারোহে তার ছোটবোন রেণুর বিবাহ হইয়াছিল। গণপতি একসময় রেণুর সম্বন্ধে প্রশ্ন করিতে সকলের এমনি সচকিতভাব দেখা গেল। এ ওর মুখের দিকে চাহিল–কিন্তু বয়স্ক কেহ জবাব দিল না। শুধু পশুপতির সাতবছরের মেয়ে মায়া বলিল, পিসিমাকে শ্বশুরবাড়িতে রোজ মারে, কাকা।
গণপতি অবাক হইয়া বলিল, মারে?
মায়া বলিল, তুমি মানুষ মেরেছ কিনা তাই জন্যে।
তিন-চার জন একসঙ্গে ধমক দিতে মায়া সভয়ে চুপ করিয়া গেল। মনে হইল, ধমকটা যেন গণপতিকেই দেওয়া হইয়াছে। কারণ, মায়ার চেয়েও তার মুখখানা শুকাইয়া গেল বেশি। আবার কিছুক্ষণ এখন তাহার কারো মুখের দিকে চোখ তুলিয়া, চাহিবার ক্ষমতা হইবে না।
পশুপতি গলা সাফ করিল। বলিল, ঠিক যে মারে তা নয়, তবে ওরা ব্যবহারটা ভালো করছে না।
বড় বোন বেণু বলিল, বিয়ের পর সেই যে নিয়ে গেল মেয়েটাকে এ পর্যন্ত আর একবারও পাঠায়নি। মহী দু-বার আনতে গেল।
মহীপতি বলিল, আমার সঙ্গে একবার দেখা করতেও দেয় নি। বললে—
রাজেন্দ্রনাথ কাঁপা গলায় বলিলেন, আহা, থাক না ওসব কথা, বাড়িতে ঢুকতে-না-ঢুকতে ওকে ওসব শোনাবার দরকার কী! ও তো আর পালিয়ে যাবে না।
খানিকক্ষণ সকলে চুপ করিয়া রহিল। বাহিরে বাদল মাঝখানে একটু কমিয়াছিল, এখন আবার আরো জোরের সঙ্গে বর্ষণ শুরু হইয়াছে। ঘরের মধ্যে এখন ভিজা বাতাসের গাঢ়তম স্পর্শ মেলে। রমা এবারও ঘরে আসে নাই, এবারও সে নিজেকে আড়াল করিয়া রাখিয়াছে–পাশের ঘরের দরজার ওদিকে। তবে এবার আর সে দাঁড়াইয়া নাই, মেঝেতে বসিয়াছে। একতলার রান্নাঘর হইতে ডালসম্ভারের গন্ধ ভিজা বাতাসকে আশ্রয় করিয়া আসিয়া এ ঘরে জমা হইয়াছে, বেণুর বড় মেয়ে শৌখিন সুহাসের অঙ্গ হইতে এসেন্সের যে গন্ধ এতক্ষণ পাওয়া যাইতেছিল তাও গিয়াছে ঢাকিয়া। পিসিমা কয়েক মিনিটের জন্য ঠাকুরঘরে গিয়াছিলেন, প্রসাদ ও প্রসাদি ফুলের রেকাবি হাতে তিনি এই সময় ফিরিয়া আসিলেন। সকলের আগে গণপতিকে বলিলেন, জুতো থেকে পা-টা খোল তো বাবা।
