বিমল আবার মাথা নাড়িল, উঁহু, বাজার-টাজার আমার দ্বারা হবে না মা, বল তো দশবার গিয়ে দোকান থেকে জিনিস এনে দিচ্ছি; বাজারে ঢুকে মাছ, তরকারি কিনতে পারব না।
মায়া ফিরিয়া গেল। তাই হোক, কোনোদিন যেন ছেলেকে তার নিজে বাজার করিতে যাইতে না হয়, শুধু বাজার করার জন্যই যেন মাহিনা দিয়া লোক রাখিবার ক্ষমতা তার হয়।
আচ্ছা, তার ভাশুর কেন বাজারে যায় না? অন্তত আজকের মতো কেন যাইবে না? আপিম খায় বলিয়া? এ তো উচিত নয়! আগে যখন বড় চাকরি করিত, তখনকার কথা আলাদা। তখন কিছু বলিবার ছিল না, কিন্তু এখন যখন সপরিবারে ধরিতে গেলে একরকম ভাইয়ের ঘাড়ে চাপিয়া আছে, এখন একদিনের জন্য দরকার হইলে কেন সে যাইবে না?
কথাটা বুঝাইয়া বলিতে নরেনও সায় দিল, তারপর সন্দিগ্ধভাবে বলিল, দাদা কি যাবে? কাল কতটা গিলে ঘুমোচ্ছে কে জানে, ডেকে তুলতেই প্রাণ বেরিয়ে যাবে। দাদার কথা বাদ দাও।
বড্ড বাড়াবাড়ি করছেন আজকাল।
নরেন একথাতেও সায় দিল। বলিল, কী জান, শোকে তাপে এরকম হয়েছেন। বৌদি মারা যাবার পর থেকে–
তার আগে বুঝি খেতেন না?
তা খেতেন, তবে সে নামমাত্র, এতটা বাড়েনি।
আপিমের নেশা বাড়ালেই বাড়ে।
মায়া উঠিয়া গেল, বাজারে পাঠাইয়া দিল ঠিকা-ঝি কালিদাসীকে। বাড়তি একটা কাজও কালিদাসী করে না, এক গ্লাস জল গড়াইয়া দিতে বলিলেও গজর গজর করে, কিন্তু বাজারে পাঠাইলেই যায়। পয়সা তো চুরি করেই, মাছ-তরকারিও কিছু কিছু সরায়, ভিন্ন একটা পুঁটুলি বাঁধিয়া আনিয়া নির্ভয়ে মায়াকে দেখায়, অন্তরঙ্গভাবে একগাল হাসিয়া বলে, ঘরের বাজারটাও এইসাথে সেরে এলাম মা। গরিবের বাজার দেখেছ মা, দুটি আলু, দুটি ঝিঙে–
মায়া বিশ্বাস করে না যে, তাদের বাজার হইতে সরানো এই সামান্য জিনিসেই কালিদাসীর বাড়ির সকলের পেট ভরে। তবে সে আরো যে তিনটি বাড়িতে কাজ করে তাদের প্রত্যেকের বাজারে এরকম ভাগ বসাইলে চলিয়া যাইতে পারে বটে। মাঝবয়সী এই স্ত্রীলোকটির আঁটসাঁট গড়ন আর চালচলন সমস্তই মায়ার চক্ষুশূল, ঝি পাওয়া এত কঠিন না হইলে সে কবে কালিদাসীকে দূর করিয়া দিত। তবু মেয়ে মানুষ মেয়েমানুষের ঘরের খবর না জানিয়া পারে না, তাই খুঁটিয়া খুঁটিয়া কালিদাসীর সংসারের সব বিবরণই মায়া প্রায় জানিয়া ফেলিয়াছে। খাওয়ার লোক এ বাড়ির চেয়ে দু-একজন বেশিই হইবে, তাছাড়া কালিদাসীর স্বামী মদন আপিম খায়।
প্রথম দিন খবরটা শুনিয়া মায়া গভীর সহানুভূতির সঙ্গে বলিয়াছিল, আপিম খায়! তাই বুঝি রোজগারপাতি কিছুই করে না?
কালিদাসী আশ্চর্য হইয়া বলিয়াছিল, রোজগার করবে না কেনে গা? ওর মতো খাটতে পারে কটা লোক? তবে গরিবের রোজগার তো, কুলোয় না।
মায়াও আশ্চর্য হইয়া বলিয়াছিল, আপিম খায়, তবু নিয়মিত কাজকম্ম করে?
কালিদাসী বলিয়াছিল, আপিম খায় তো কাজকম্ম করবে না কেনে মা?
.
প্রায় দশটার সময় কালিদাসীর বাজার-করা মাছ-তরকারি মুখে গুঁজিয়া নরেন আপিস যাইতেছিল, আপিমশোর দাদা ডাকিতেছে শুনিয়া তার ঘরে গেল। তিনটি মাথার বালিশের উপর একটা পাশবালিশ চাপাইয়া আরামে ঠেস দিয়া হরেন আধশোয়া অবস্থায় পড়িয়া আছে। মুখে কিন্তু তার একটুও আরামের ছাপ নাই, আছে চটচটে ঘামের মতো ভোতা একটা অবসাদ আর নির্বিকার উদাসভাবের আবরণ। তোশকটা একটু ঘেঁড়া, বিছানার চাদরটা অত্যন্ত ময়লা, দুটি বালিশ আর পাশবালিশটিতে ওয়াড়ের অভাব, ঘরের সমস্ত জিনিসপত্রে পীড়াদায়ক বিশৃঙ্খলা। কিন্তু উপায় কী? শোকে তাপে মানুষ যখন কাতর হইয়া পড়ে, তখন আর তার কাছে কী প্রত্যাশা করা যায়?
হরেন বলিল, আপিস যাচ্ছ?
নরেন বলিল, হ্যাঁ।
একটা টাকা দাও দিকি আমাকে।
নরেন একটু ভাবিল। টাকার বড় টানাটানি, মাস শেষ হইয়া আসিয়াছে। অনেক দিন হইতে দাদাকে সে টাকা দিয়া আসিতেছে, কখনো একটা, কখনো দশটা। আজ ব্যাপারটা একটু বিবেচনা করিয়া দেখা দরকার। আর কি কোনোদিন হরেনের পক্ষে গা-ঝাড়া দিয়া উঠিয়া বড় চাকরি-বাকরি করা সম্ভব হইবে? আগের মতো অত বড় না হোক, মাঝারি রকমের বড়? দুবছরের মধ্যে যদি এত আপিম বাড়াইয়াও শোকতাপটা সামলাইয়া উঠিতে না পারিয়া থাকে, আর কি কোনোদিন পারিবে? আপিমটা হয়তো দিন দিন পরিমাণে বাড়িয়াই চলিবে। মায়া ঠিক বলিয়াছে, আপিমের নেশা বাড়াইলেই বাড়ে।
টাকা তো নেই দাদা। মাস কাবার হয়ে এল, আমি সামান্য মাইনে পাই–
একেবারে নেই? আনা চারেক হবে না?
নরেন মাথা নাড়িয়া বলিল, না, একটি পয়সা নেই। আপিমের জন্যে তো? আপিমটা এবার তুমি ছেড়ে দাও দাদা।
হরেন তৎক্ষণাৎ রাজি হইয়া গেল, আচ্ছা, ছেড়ে দেব। কিন্তু হঠাৎ তো ছাড়া যায় না, এ্যাদ্দিনের নেশা! কারো কাছে ধারধোর করে অল্প একটু এনো আজ কিনে, কমিয়ে কমিয়ে কদিন বাদেই একেবারে ছেড়ে দেব। সত্যি, এ নেশাটা এবার ছেড়ে দেওয়াই উচিত। এনো কিন্তু, কেমন?
দেখি-বলিয়া নরেন চলিয়া গেল।
জবাবটা হরেনের তেমন পছন্দ হইল না। অন্তত আজকের দিনটা চলিয়া যায় এ রকম সামান্য পরিমাণে আপিম নরেন কিনিয়া আনিবে এটুকু ভরসাও কি করা চলে, এ রকম জবাবের পর? যদি না আনে? অসময়ে সে ফিরিয়া আসিবে, তারপর হয়তো হাজার চেষ্টা করিয়াও এক রতি আপিমও সংগ্রহ করা চলিবে না। কী সর্বনাশ! সন্ধ্যার সময় একটু আপিম না হইলে তার চলিবে কেন? কথাটা ভাবিতে গিয়াই তার হৃৎকম্প উপস্থিত হয়।
