পিসে নিশ্বাসের জন্য হাঁপাইতেছিল। খানিক পরে ক্ষীণস্বরে বলিল, একটা জানালা খুলে দিন।
নীলমণি সভয়ে বলিল, দে তো শ্যামা, জানালাটা খুলে দে।
শ্যামা আরো বেশি ভয়ে ভয়ে বলিল, ঝড় হচ্ছে যে বাবা!
হোক, খুলে দে।
শ্যামা পশ্চিমের ছোট জানালাটি খুলিয়া দিল। ঝড় পুবদিক হইতে বহিতেছিল, মাঝে মাঝে এলোমেলো একটু বাতাস আর ছিটেফোঁটা একটু বৃষ্টি ঘরে ঢোকা ছাড়া জানালাটি খুলিয়া দেওয়ার বিশেষ কোনো মারাত্মক ফল হওয়ার সম্ভাবনা ছিল না। কিন্তু ভীরু নিভা ছেলের গায়ে আর-এক পরত কাপড় জড়াইয়া দিল।
পিসে বলিল, ঘুমের ঘোরে কখন চাদর মুড়ি দিয়ে ফেলেছি, আর একটু হলেই দম আটকাত! বাপ!
নীলমণি জিজ্ঞাসা করিল, আপনার অসুখ আছে নাকি? পিসে ভর্ৎসনার চোখে চাহিয়া বলিল, খুব মোটাসোটা দেখছেন বুঝি? অসুখ না থাকলে মানুষের এমন চেহারা হয়? চার বছর ভুগছি মশায়, মরে আছি একেবারে। যম ব্যাটাও কানা, এত লোককে নিচ্ছে, আমায় চোখে দেখতে পায় না। যে কষ্টটা পাচ্ছি মশায় শত্রুও যেন—
ব্যাপারটা কী?
পিসে রাগিয়া বলিল, টের পান না? এমন করে শ্বাস টানছি দেখতে পান না? পাবেন কেন, আপনার কী। যার হয় সে বোঝে।
বোঝা গেল, পিসের মেজাজটা খিটখিটে।
নীলমণি ভাবে সান্ত্বনা দিয়া বলিল, আহা, সেরে যাবে, ভালোমতো চিকিচ্ছে। হলেই সেরে যাবে।
পিসে বলিল, হুঁ, সারবে। আমকাঠের তলে গেলে সারবে। চিকিচ্ছের কি আর কিছু বাকি আছে মশায়? ডাক্তার কবরেজ জলপড়া–কিচ্ছুটি বাদ যায়নি। আজ চার বছর ডাঙায় তোলা মাছের মতো খাবি খাচ্ছি, কোনো ব্যাটা সারাতে পারল!
কথার মাঝে মাঝে পিসে হাপরের মতো শ্বাস টানে, এক-একবার থামিয়া গিয়া ডাঙায় তোলা মাছের মতোই চোখ কপালে তুলিয়া খাবি খায়। নীলমণির গায়ে কাঁটা দিতে লাগিল। বাতাস। পৃথিবীতে কত বাতাস! তবুও ফুসফুস ভরাইতে পারে না। অন্নপূর্ণার ভাণ্ডারে সে উপবাসী, পঞ্চাশ মাইল গভীর বায়ুস্তরে ডুবিয়া। থাকিয়া ওর দম আটকাইল।
পিসে বলিল, কী করে জানেন? বলে, ভয় কী, সেরে যাবে। বলে, সবাই টাকা নেয় চিকিৎসে করে, শেষে বলে, না বাপু, তোমার সারবে না, এসব ব্যারাম সারে না। আমি বলি, ওরে চোর ডাকাত ছুঁচোর দল! সারাতে পারবি না তো মেরে ফ্যাল, দে, মরবার ওষুদ দে।
উত্তেজনায় পিসে জোরে জোরে হাঁপাইতে লাগিল। নীলমণি কথা বলিল না, তার বিদ্রি আরক্ত চোখ দুটি কেবলি মিটমিট করিয়া চলিল।
তেল কমিয়া আসায় আলোটা দপদপ করিতেছে, এখনই নিবিয়া যাইবে। ছেলেকে বুকে জড়াইয়া হাতকে বালিশ করিয়া নিভা দুর্গন্ধ চটে কাত হইয়া শুইয়া পড়িয়াছে। শ্যামা বসিয়া বসিয়া ঝিমাইতেছে।
নীলমণির হুঁকা-কলকি শ্যামা জানালায় নামাইয়া রাখিয়াছিল। আলোটা নিবি য়া যাওয়ার আগে নীলমণি বাকি তামাকটুকু সাজিয়া লইল। তারপর ঠেস দিয়া আরাম করিয়া পিসের শ্বাস টানার মতো শাঁ শাঁ করিয়া জলহীন হুঁকায় তামাক টানিতে লাগিল।
আপিম
আজ সকালে বাজারে যাওয়ার লোকের অভাব ঘটিয়াছে। বাজার প্রতিদিন একরকম নরেন নিজেই করে, আজ সকালে ঘুম হইতে উঠিয়া সে একগাদা আপিসের কাগজপত্র লইয়া বসিয়াছে। অথচ বাজারে একজনকে পাঠাইতে হইবে। আপিস আছে, স্কুল-কলেজ আছে, কিছু মাছ-তরকারি না আনাইলে চলিবে কেন? ব্যস্ত ও ব্ৰিত স্বামীর মুখ দেখিয়া মায়ার বড়ই মমতাবোধ হইল, বাজারের কথাটা না তুলিয়াই সে সিঁড়ি দিয়া উঠিয়া গেল ছাতে।
ছাতের ঘুপচি-ঘরখানায় থাকে বিমল, সংসারের সমস্ত গণ্ডগোলের উর্ধ্বে থাকিয়া সে কলেজের পড়া করে। বিমল তখনো ঘুমাইতেছিল। বেলা আটটার আগে কোনোদিনই তার ঘুম ভাঙে না। ছোট কেরোসিন-কাঠের টেবিলটিতে গাদা করা বই-খাতা আর ইংরেজি-বাংলা মাসিকপত্র; বিছানাতেও কয়েকটা বই পড়িয়া আছে। মাথার কাছে একটা বার্লির কৌটা, দেশলাইয়ের কাঠি, পোড়া সিগারেটের টুকরা আর ছাইয়ে প্রায় ভর্তি হইয়া গিয়াছে, বিছানা পাতিয়া মেঝের যেটুকু ফাঁকা আছে সেখানেও এইসব আবর্জনাই বেশি।
এসব মায়ার নজরে পড়িল না, এতবড় ছেলে সিগারেট খাইবে সেটা আর এমন কী দোষের ব্যাপার? মায়ার শুধু চোখে পড়িল ঘুমন্ত ছেলের ক্লিষ্ট মুখোনি। আহা, কত রাত জাগিয়া না জানি ছেলে তার পড়িয়াছে! আজ যেমন করিয়াই হোক ওকে একটু বেশি দুধ খাওয়াইতেই হইবে। ভাশুরের দুধ যদি একটু কমাইয়া দেওয়া যায়–আপিম খায় বলিয়াই একজন রোজ একবাটি দুধ খাইবে আর এত খাঁটিয়া তার ছেলের যথেষ্ট দুধ জুটিবে না? যে ছেলে একদিন….
সেইখানে দাঁড়াইয়া মায়া হয়তো ছেলের ভবিষ্যতের এবং সেই সঙ্গে জড়ানো নিজের ও নিজের এই সংসারের ভবিষ্যতের স্বপ্নে কিছুক্ষণের জন্য বিভোর হইয়া থাকিত, গোঙানির মতো আওয়াজ করিয়া বিমল পাশ ফেরায় স্বপ্ন-দেখা তখনকার মতো স্থগিত রাখিতে হইল।
কাল যে ইংরেজি নভেলখানা পড়িতে পড়িতে বিমল ঘুমাইয়া পড়িয়াছিল, ঠিক পিঠের নিচে সেই বইখানাই অনেকক্ষণ তার ঘুম ভাঙানোর চেষ্টা করিতেছিল। মায়া ডাকিতেই সে জাগিয়া গেল।
বাজার? চা-টা খাইয়া একবার বাজার যাইতে হইবে? মস্ত একটা হাই তুলিয়া মাথা নাড়িয়া বিমল বলিল, আমি পারব না।
মায়া তা জানে। বিমল কোনোদিন বাজারে যায় না, বাজারে গেলে তার বিশ্রী লাগে, কেমন যেন লাগে, বড় খারাপ লাগে। তবু মায়া আর একবার চেষ্টা করিয়া দেখিল, কাকে পাঠাব তবে? আজকের মতো একবারটি যা লক্ষ্মী, উনি আপিসের কাজ নিয়ে বসেছেন, নইলে–
