এই স্বার্থপরতার উপস্থিতির কারণেই কীভাবে পরার্থিতার উদ্ভব ঘটে তা আরও স্পষ্ট হবে নীচের কিছু উদাহরণে।
.
ইট-পাটকেল এবং পিঠ চুলকোচুলকির খেলা
জীবজগতে গেম থিওরি এবং বিবর্তনীয় স্থিতিশীল তত্ত্ব কীভাবে কাজ করে তা না হয় জানা গেল। কিন্তু একটি জীব কী করে বুঝবে কখন তাকে স্বার্থপর হতে হবে, আর কখন পরার্থ? কীভাবে বুঝবে কখন সত্যবাদী যুধিষ্ঠির সাজতে হবে, আর কখন হতে হবে বিশ্বাসঘাতক বিভীষণ? এর উত্তর পাওয়া গেছে দুই প্রতিভাবান বিজ্ঞানী রবার্ট এক্সেলরড (Robert Axelrod) এবং রবার্ট ট্রাইভার্স (Robert Trivers)-এর পৃথক দুটি গবেষণায়। দুজন বিজ্ঞানী আলাদা দুটি তত্ত্ব দিয়েছেন। নামে আলাদা হলেও তত্ত্বের বিষয়বস্তু মোটামুটি একই। তুমি আমার পিঠটি চুলকালে আমিও এক সময় তোমার পিঠটি চুলকে দিব। আর তুমি ইট মারলে আমিও দেব পাটকেলটি মেরে। কাজেই বাপু যা করবে বুঝে করো। এই হলো তত্ত্ব দুটির মোদ্দা কথা।
ইটটি মারলে পাটকেলটি খেতে হবে–এই তত্ত্বের ইংরেজি ‘টিট ফর ট্যাট’ (Tit for tat)। এটি দিয়েছেন এক্সেলরড। আর রবার্ট ট্রাইভার্সের ‘পিঠ চুলকোচুলকি’ সংক্রান্ত তত্ত্বের নাম বিনিময়ী পরার্থিতা (Reciprocal Altruism)। দুটি তত্ত্বই ইঙ্গিত করছে–অতীতে আমার প্রতি তুমি কী আচরণ করেছ সেটা মনে করে আমি তোমার প্রতি আচরণ করব। ভালো আচরণ করে থাকলে আমার থেকেও ভালো আচরণ পাবে, আর ঝামেলা করে থাকলে আমার দিক থেকেও তাই পাবে। কাজ কর্মে এক হলেও তত্ত্ব দুটিতে সূক্ষ্ম কিছু পার্থক্য থেকে গেছে। টিট ফর ট্যাট ঘটে একই প্রজাতিতে। এক ভার্ভেট বানর ক্ষিদার সময় আরেক বানরকে কলা দিলে, সেই বানরও পরবর্তীতে কলা দিয়ে প্রথম বানরকে সাহায্য করবে। শিকারিদের দ্বারা। আক্রান্ত হবার মুহূর্তে কোনো পরোপকারী বানর বন্ধু যদি চিৎকার করে সতর্ক করে দেয়, তবে পরোপকারী বানরটি কখনো বিপদে পড়লেও ঠিক একইভাবে সেই আক্রান্ত বানরটি চিৎকার করে তাকে বিপদে সাহায্য করবে। টিট ফর ট্যাটবিদ্যমান থাকে একই প্রজাতির মধ্যে। বানর কেবল চিৎকার করে সতর্ক করবে আরেকটি বানর বিপদে পড়লেই, কোনো খরগোশ বিপদে পড়লে নয়। আর তাদের সাহায্যের ধরনও একই ধরনের হবে। কলার বিনিময়ে কলা, কিংবা চীৎকারের বিনিময়ে চিৎকার। অন্য কিছু নয়। কিন্তু অন্য দিকে রেসিপ্রোকাল অলট্রইজম বা বিনিময়ী পরার্থিতার ক্ষেত্রে পরার্থিতা প্রজাতির স্তর অতিক্রম করে যায়। এক প্রজাতি অন্য প্রজাতিকে সহায়তা করে। আমরা আগে আমরা আগে ক্লাউন মাছ আর এনিমোন, হামিং বার্ডের সাথে অর্নিথোপথিলাস ফুলের, কিংবা এংরাকোয়িড অর্কিডের সাথে আফ্রিকান মাদার সহবিবর্তনের উদাহরণের সাথে পরিচিত হয়েছি যেগুলো প্রজাতির স্তর অতিক্রম করে পরার্থিতার বিকাশ ঘটিয়েছে। সাহায্যের ধরনও ভিন্ন হতে পারে। আমি পূজা উপলক্ষ্যে প্রতিবেশীকে পায়েশ পাঠালে, প্রতিবেশীও যে পায়েশই পাঠাবে তা নয়, হয়তো ঈদের দিন পাঠাবে কোরমা–এই ধরনের!
ইট-পাটকেল তথা টিট ফর ট্যাট তত্ত্বের উদ্ভবটা বেশ মজার। আশির দশকের প্রথমভাগে কম্পিউটারের শক্তি বাড়তে শুরু করেছে হু-হুঁ করে। পার্সোনাল কম্পিউটারও বাজারে আসতে শুরু করেছে। এই সময় রবার্ট এক্সেলরড নামের এক তরুণ রাষ্ট্রবিজ্ঞানীর শখ হলো কম্পিউটারের সাহায্যে আসামির সঙ্কটের একটা সিমুলেশন পরীক্ষা করবেন। তিনি একটি মজার প্রতিযোগিতার আয়োজন করলেন যেখানে প্রতিযোগীরা আসামির সংকট সমাধানের জন্য একটা ভালো এলগরিদম সাবমিট করবে। প্রায় দুশবার একে অপরের মধ্যে ক্রমান্বয়ে খেলা চলবে। এর মধ্যে যার পয়েন্ট সবচেয়ে বেশি হবে সেই এলগোরিদমই বিবেচিত হবে শ্রেষ্ঠ হিসেবে। চৌদ্দজন প্রতিযোগী সেই প্রোগ্রামিংয়ের খেলায় অংশ নেন–তারা সহজ সরল থেকে শুরু করে বিভিন্ন জটিল জটিল এলগোরিদম সাবমিট করলেন। এনাতল র্যাপোর্ট (Anatol Rapoport) নামে এক তরুণ প্রোগ্রামারের এলগোরিদম সর্বোচ্চ পয়েন্ট পেয়ে জয়লাভ করল–আর সেই প্রোগ্রামের স্ট্র্যাটিজি ছিল সবচেয়ে সরল-সেই টিট ফর ট্যাট। প্রথমে সহযোগিতা করে সে খেলা শুরু করবে, আর মনে রাখবে তার প্রতিপক্ষ ঠিক কি করেছিল তার সাথে সহযোগিতা নাকি বিরোধিতা। প্রতিপক্ষ সহযোগিতা করে থাকলে সেও সহযোগিতা করবে, আর বিরোধিতা করলে সেও করবে বিরোধিতা। এভাবেই এগুতে থাকবে। এভাবেই সে সবচেয়ে বেশি পয়েন্ট অর্জন করে প্রথম স্থানে পৌঁছে গেল। এই প্রতিযোগিতার মাধ্যমেই বেরিয়ে এল যে, টিট ফর ট্যাট বা ইটটি মারলে পাটকেলটি খেতে হয়–এটিই আসামির সংকট মোকাবেলার জন্য সর্বোত্তম সমাধান।
কয়েক বছর পরে রবার্ট এক্সেলরড আবারো আরেকটি টুর্নামেন্টের আয়োজন করলেন টিট ফর ট্যাট আলগোরিদমকে কেউ হারাতে পারে কি না সেটা পুনর্বার পরীক্ষা করার জন্য। এবারেও শীর্ষস্থান অধিকার করে বসে রইলো সেই আদি অকৃত্রিম টিট ফর ট্যাট! তিনি ১৯৮১ সালে বিষয়টি ফোকাস করে হ্যামিলটনের সাথে মিলে সায়েন্স পত্রিকায় একটি নিবন্ধ লেখেন ‘দ্য ইভোলুশন অব কোঅপারেশন’ নামে[২৯৫], এবং বছরখানেক পরে একটি বই লেখেন সেই একই শিরোনামে[২৯৬]। এভাবেই টিট ফর ট্যাট অ্যালগরিদম বিবর্তনীয় গেম থিওরির এক রাজকীয় স্থান অধিকার করে নিল।
