এই অধ্যায়ের উপরের দিকের একটি অংশে (কেন ক্ষমতাশালী পুরুষেরা বেশি পরকীয়ায় আসক্ত হয়?) যে সতর্কবাণী দেয়া হয়েছে সেই সতর্কবাণী কিন্তু এখানেও প্রযোজ্য। উপরের আলোচনা থেকে কেউ যদি ধরে নেন, প্রতিভাধর হলেই সবাই স্ত্রীকে ফেলে পরকীয়ায় কিংবা পরনারীতে আসক্ত হবেন কিংবা নারীলোলুপ হয়ে যাবেন, তা কিন্তু ভুল হবে। বহু প্রতিভাধরেরাই কিন্তু নারীলোলুপ নন। প্রতিভা নারীলিপ্সার কারণ নয়, বড়জোর বলা যায় কারো কারো ক্ষেত্রে একটা অচেতন বৈবর্তনিক কৌশল। জিওফ্রি মিলার, ম্যাট রিডলী, সাতোসি কানাজাওয়া সহ অনেক বিবর্তনবাদী মনোবিজ্ঞানীই প্রতিভা, চৌকষতা, বুদ্ধিমত্তা–এ বৈশিষ্ট্যগুলোকে যৌনতার নির্বাচন বা সেক্সুয়াল সিলেকশনের ফল বলে রায় দিয়েছেন। প্রতিভার উদ্ভব আর বিকাশে যৌনতার নির্বাচন ব্যাপারটা কাজ করে থাকলে বিপরীত লিঙ্গের দৃষ্টি আকর্ষণের মাধ্যমে নির্বাচিত হবার ব্যাপারটিও অবধারিতভাবেই বিবর্তনের ইতিহাসে কাজ করেছিল। আদিম সমাজে হয়তো প্রতিভার নির্বাচন কাজ করত খুব ছোট স্কেলে। যে ব্যক্তি তার উদ্ভাবনী শক্তি দিয়ে নিখুঁত এবং ধারালো অস্ত্র বানাতে পেরেছিল এবং গোত্রকে দিয়েছিল অধিক শিকার এবং মাংসের নিশ্চয়তা, তারা হয়ে উঠেছিল গোত্রের হার্টথ্রব। এ ধরনের প্রতিভাধর আদিম প্রকৌশলীরা নারীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পেরেছিল অধিক মাত্রায়। ফলে তারা শয্যাসঙ্গী হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিল। একইভাবে পুরুষেরাও নারীদের বিভিন্ন প্রতিভাকে নির্বাচিত করেছিল, করেছিল বুদ্ধিমত্তা, স্মার্টনেস এবং সর্বোপরি সৌন্দর্যকেও। সেজন্যই নারীরা আজও সৌন্দর্যের প্রতি সচেতন থাকে (বিলিয়ন ডলারের কসমেটিক্স ইন্ডাস্ট্রি মূলত এই চাহিদাকে মূল্য দিয়েই টিকে আছে), কারণ পুরুষেরা সুন্দরী নারীর প্রতি লালায়িত হয়।
তবে আধুনিক সমাজে প্রতিভার সমীকরণটা অনেক জটিল হয়ে গেছে। এটা ঠিক প্রতিভাধরদের পুরুষদের প্রতিভা কেবল নারীদের আকর্ষণের জন্য এটা ঢালাওভাবে বলা ঠিক নয়, কিংবা আরও ভালোভাবে বললে ‘পলিটিকালি কারেক্ট’ নয়, কিন্তু বিবর্তনের ইতিহাসের প্রেক্ষাপট বিবেচনা করলে ‘দৃষ্টি আকর্ষণের’ ব্যাপারটা একেবারে ফেলে দেয়া যাবে না। আর অনেক প্রতিভাধর পুরুষেরা যে নিজেদের প্রতিভাকে নারীলিপ্সার কাজে ব্যবহার করেছেন এবং এখনও করছেন, সেটা আমার এ লেখার উদাহরণগুলোতেই বোধ করি স্পষ্ট করা হয়েছে। শক্তিমত্তার পাশাপাশি আজ পুরুষদের বুদ্ধিমত্তা, প্রতিভা দিয়ে নারীরা আকৃষ্ট হন, (এটা বৈবর্তনিক প্রবৃত্তির কারণেই অনেক সময় ঘটে, ব্যক্তিবিশেষের সচেতন ইচ্ছা অনিচ্ছার ব্যাপারটি এখানে মুখ্য নয়), যার কারণে বহু নারীই প্রতিভাবানদের প্রতি আকৃষ্ট হয়। আকৃষ্ট হবার পরে তা গ্রহণ বা বর্জনের ব্যাপারটা ব্যক্তিবিশেষের বিবেচনার উপরেই থেকে যায় অবশ্য। এর একটি চমৎকার উদাহরণ বিজ্ঞানী স্টিফেন হকিং এর প্রতিভাময় জীবন। দুরারোগ্য মোটর নিউরোন রোগে আক্রান্ত এই প্রতিভাধর বিজ্ঞানীর কেবল মস্তিষ্কইটাই কর্মক্ষম এবং তিনি ডান হাতের দু আঙুল ছাড়া আর কিছু নাড়াতে পারেন না, তারপরেও পক্ষাঘাতগ্রস্ত এই বিজ্ঞানী স্বীয় প্রতিভায় আকর্ষণ করতে পেরেছেন একাধিক নারীকে, এবং বর্তমানে তৃতীয় স্ত্রীর সাথে সুখী জীবনযাপন করছেন।
আরেকটি ব্যাপারও পরিষ্কার করা প্রয়োজন। উপরের আলোচনা থেকে কেউ যদি ধরে নেন, প্রতিভা কেবল পুরুষদেরই একচেটিয়া, সেটাও ভুল একটি উপসংহারে পৌঁছানো হবে। প্রতিভা শুধু ছেলেদেরই থাকে না, থাকে মেয়েদেরও। আর মেয়েদের প্রতিভার ব্যাপারটাও কিন্তু একইভাবে যৌনতার নির্বাচনের মাধ্যমেই নির্বাচিত হয়েছিল, এবং হয়েছিল একইভাবে পুরুষদের জৈবিক চাহিদাকে মূল্য দিতে গিয়ে। তবে কিছু ক্ষেত্রে বিবর্তন মনোবিজ্ঞানীরা প্রতিভার বিকাশে নারী পুরুষে। বহু প্রতিভাধর পুরুষের প্রতিভা যেমন স্বতঃস্ফূর্তভাবে নারী সঙ্গ পেয়ে বিকশিত হয়েছিল, নারীদের ক্ষেত্রে প্যাটার্নটি ঠিক সেরকম নয়। নারীদের ক্ষেত্রে সবচেয়ে প্রতিভাময় মুহূর্তের সূচনা ঘটে যখন সে দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্কে জড়ায় বা জড়ানোর আভাস পায়[২৬৬]। বিখ্যাত কবি এলিজাবেথ ব্যারেট ব্রাউনিং এর কথা বলা যায় এ প্রসঙ্গে। গবেষকেরা বলেন, তার প্রতিভার দীপ্তি শিখর স্পর্শ করেছিল যখন তিনি রবার্ট ব্রাউনিং এর কাছ থেকে প্রেমের সাড়া পেয়েছিলেন, এবং দীর্ঘমেয়াদি ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের দিকে যাচ্ছিলেন। পর্তুগিজের সনেট’, যাকে সমালোচকেরা তার জীবনের শ্রেষ্ঠ কীর্তি বলে মনোনীত করেছেন, সে সময়েরই লেখা! অবশ্য চেষ্টা করলে যে এই ধারার ব্যতিক্রম পাওয়া যাবে না যে তা নয়। তসলিমা নাসরিনের কথাই ধরা যেতে পারে। তসলিমা তার যৌবনে বহু পুরুষের সান্নিধ্যেই এসেছেন, আর দশটা মেয়ের তুলনায় অনেক বেপরোয়া জীবন অতিবাহিত করেছেন, ঠিক সেসময়ই তার কলম থেকে বেরিয়েছিল ক্ষুরধার লেখনীগুলো পত্রিকার কলাম, গল্প, উপন্যাস আর কবিতা। তার মানে এই নয় যে, মেয়েরা কেবল শান্ত, সুন্দর এবং দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্কে থাকলেই কেবল ভালো লিখতে পারে। ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ সময়েও দুর্দান্ত লেখা বেরিয়ে আসে, নারী পুরুষ সবারই। যদিও তসলিমাকে নিয়ে গবেষণারত কোনো গবেষক আমাদের দেখিয়ে বলতেই পারেন, তার অনিন্দ্যসুন্দর এবং কালজয়ী কবিতাগুলোর বেশিরভাগই তসলিমা লিখেছিলেন, যখন তিনি রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহর সাথে দীর্ঘমেয়াদি রোমান্টিক সম্পর্কের মধ্যে ছিলেন, তা সেই সম্পর্কে যতই টানাপোড়েনের আলামত থাকুক না কেন।
