নারীদের পরকীয়ার ব্যাপারে আরও একটি লক্ষণীয় প্যাটার্ন পাওয়া গিয়েছে, যেটা পুরুষদের থেকে কিছুটা আলাদা। বহু ক্ষেত্রেই দেখা গেছে, নতুন সঙ্গীর সাথে অপরিকল্পিত যৌনসম্পর্কের (casual sex) মাধ্যমে নারীরা সঙ্গীটিকে ভবিষ্যৎ স্বামী হিসেবে মূল্যায়ন করে নিতে চায়। সে জন্যই এমনকি স্বল্পমেয়াদি সম্পর্কের ক্ষেত্রেও বহুগামী, বোহেমিয়ান ধরনের ছেলের সাথে সম্পর্ক করতে নারীরা প্রাথমিকভাবে অনিচ্ছুক থাকে; অতীতে যদি পুরুষটির বহু নারীর সাথে সম্পর্ক কিংবা আসক্তি থেকে থাকে, তা নারীটির কাছে এক ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত সংকেত নিয়ে উপস্থিত হয়। এর কারণ, স্বল্পমেয়াদি সম্পর্কে জড়ালেও তার অবচেতন মনে থাকে দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্কের আকাক্ষা, যার নিরিখেই সে সাধারণত উপরোক্ত বৈশিষ্ট্যগুলো বিচার করে থাকে। তার সঙ্গীর বহুগামিতা কিংবা অতীতে বহু নারীর প্রতি আসক্তির অর্থ তার চোখে হয়ে ওঠে তার সাথে ভবিষ্যৎ সম্পর্ক রচনার ক্ষেত্রে অবিশ্বস্ততার নিয়ামক। অর্থাৎ, সে ধরে নেয় এ ধরনের পুরুষেরা ‘ভবিষ্যৎ স্বামী হিসেবে উপযুক্ত নয়। মোটাদাগে, ভবিষ্যৎ স্বামীর মধ্যে যে গুণাবলিগুলো প্রত্যাশা করে, ঠিক সেগুলোই একটি নারী তার যৌনসঙ্গীর মধ্যে খুঁজতে চায়[২৩১]। দুটি ক্ষেত্রেই মেয়েরা চায় তার পুরুষ সঙ্গী হবে দয়ালু, রোমান্টিক, সমঝদার, দুর্দান্ত, স্বাস্থ্যবান, রসিক, বিশ্বস্ত এবং সম্পদের বিনিয়োগের ব্যাপারে থাকবে উদার। সেজন্যই বিবর্তন মনোবিজ্ঞানী ডেভিড বাস তার ‘বাসনার বিবর্তন’ (The Evolution Of Desire) বইয়ে বলেন[২৩২],
উভয় ক্ষেত্রেই মেয়েদের অভিরুচির এই অপরিবর্তনীয়তা ইঙ্গিত করে যে, নারীরা অনিয়মিত যৌনসঙ্গীকে হবু স্বামী হিসেবেই দেখে এবং সেজন্য দুইক্ষেত্রেই বেশি পদপর্যাদা আরোপ করে।
বহু সমাজে আবার দেখা গেছে, যে সমস্ত সমাজে সহিংসতা খুব বেশি, নারীরা বিবাহ বহির্ভূত যৌনসম্পর্ক করে নিজের নিরাপত্তার ব্যাপারটা চিন্তা করে। স্বামীর বাইরে গোত্রের অন্য কোনো পুরুষের সাথে যদি নারীর কোনো বিশেষ বন্ধুত্ব গড়ে উঠে তবে সে স্বামী বাইরে থাকলে বাঁ অন্য কোন সময়ে বিপদ আপদ থেকে রক্ষা করতে পারবে। এ ব্যাপারটা সাধারণভাবে প্রাণিজগতের মধ্যে প্রচলিত আছে। যেমন, সাভানা বেবুনদের নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে বারবারা সুটস সহ অন্যান্য বিজ্ঞানীরা লক্ষ্য করেছেন যে, এই ধরনের বেবুনদের সমাজে একটি নারী বেবুনের সাথে প্রাথমিক বা মূলসঙ্গীর বাইরেও একজন বা দুজন সঙ্গীর সাথে বিশেষ ধরনের সম্পর্ক গড়ে উঠে, এবং সেই সঙ্গী বা সঙ্গীরা অন্য বেবুনদের উত্যক্ত করার হাত থেকে নারী বেবুনটিকে রক্ষা করে[২৩৩]। পর-পুরুষের সাথে যৌনতার বিনিময়ে মূলত জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে নারী বেবুনটি। এ প্রসঙ্গে বিজ্ঞানী রবার্ট স্মিথ তার একটি গবেষণাপত্রে বলেন[২৩৪]—
প্রাথমিক সঙ্গীটি সবসময় নারী বেবুন কিংবা তার সন্তানের পাশে থেকে থেকে তাকে রক্ষা করতে পারে না। তার অনুপস্থিতিতে অন্য কোনো পুরুষের সাথে নারীটির বিশেষ কোনো সম্পর্ক থাকলে তা তার বেঁচে থাকায় বাড়তি উপযোগিতা নিয়ে আসে। এভাবে নারীটি অন্য কোনো পুরুষের সাথে সম্পর্ক তৈরি করে নিজের এবং নিজের সঙ্গীর জিন রক্ষা করার ক্ষেত্রে এক ধরনের স্ট্র্যাটিজি তৈরি করে।
এ ধরনের স্ট্র্যাটিজি মানবসমাজে বর্তমানে খুব বেশি দৃশ্যমান না হলেও বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, আদিম শিকারি সংগ্রাহক কিছু সমাজে যেখানে নারীদের উপর পুরুষালি সহিংসতা, আগ্রাসন, ধর্ষণ খুবই বেশি, সেখানে নারীরা এ ধরনের অতিরিক্ত যুগল বন্ধনের মাধ্যমে নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে[২৩৫]।
সঙ্গী রদবদল বা ‘মেট সুইচিং’ও হতে পারে আরেকটি বড় কারণ যার কারণে একটি নারী পরকীয়া করতে পারে। স্পটেড স্যান্ড পাইপার (বৈজ্ঞানিক নাম Actitis macularia) নামে আমেরিকার মিনেসোটার হ্রদে দৃশ্যমান এক ধরনের পাখিদের মধ্যে সঙ্গী রদবদলের প্রবণতা উল্লেখযোগ্য মাত্রায় পাওয়া গিয়েছে। জীববিজ্ঞানী মার্ক কলওয়েল এবং লিউস ওরিং প্রায় চার হাজার ঘণ্টা ধরে এই পাখিদের জীবনাচরণ পর্যবেক্ষণ করে সিদ্ধান্তে এসেছেন যে, এ ধরনের পাখিদের মধ্যে সঙ্গী রদবদল খুবই স্বাভাবিক ঘটনা36। সঙ্গী রদবদলের মাধ্যমে বর্তমান সঙ্গীর চেয়ে আরও আকর্ষণীয় সঙ্গীকে খুঁজে নেয় একটি নারী স্পটেড স্যান্ড পাইপার। মানবসমাজেও কিন্তু এ ব্যাপারটি লক্ষ করলে খুঁজে পাওয়া যাবে। বর্তমান সঙ্গীর চেয়ে অন্য কাউকে অধিকতর আকর্ষণীয়, সুদর্শন কিংবা কাঙ্খিত মনে হলে, কিংবা বর্তমান সঙ্গীর স্ট্যাটাসের চেয়ে উঁচু সামাজিক পদমর্যাদাসম্পন্ন কেউ তার সাথে দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্কের ব্যাপারে আগ্রহী হয়ে উঠলে নারী তার সাথেও পরকীয়ায় জড়াতে করতে পারে। পরকীয়া করতে পারে যদি নারীর বর্তমান সঙ্গী যদি অসুস্থ হয়, পঙ্গু হয়, শারীরিকভাবে অক্ষম হয়, যুদ্ধাহত হয় কিংবা মুমূর্ষ হয়। বাংলাদেশে বিগত শতকের নব্বইয়ের দশকের চাঞ্চল্যকর মুনীর-খুকুর পরকীয়া আর তাকে কেন্দ্র করে সাংবাদিক রীমা হত্যাকাণ্ডের কথা নিশ্চয় অনেকেরই মনে আছে। মধ্যবয়সি খুকু পরকীয়া প্রেম শুরু করেছিলেন ড. মেহেরুন্নেসার পুত্র মুনীরের সাথে। খুকুর স্বামী ছিলেন পক্ষাঘাতগ্রস্ত এবং অসুস্থ। স্বামীর এ শারীরিক পরিস্থিতি খুকুকে চালিত করেছিল মুনীরের সাথে পরকীয়ায় জড়াতে, আর প্ররোচিত করেছিল মুনীরকে রীমা হত্যায়। কাজেই নারী শুধু পরকীয়া করে না, প্রয়োজনে পরকীয়ার কারণে হত্যায় প্ররোচনা দেওয়া শুধু নয়, নিজ হাতে হত্যা পর্যন্ত করতে পারে। কিছুদিন আগে পরকীয়ার কারণে আয়শা হুমায়রা কীভাবে তার নিজের সন্তান সামিউলকে নির্দয়ভাবে হত্যা করে লাশ ফ্রিজবন্দি করে পরে বাইরে ফেলে দিয়েছিল, তার পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ দিনের পর দিন ধরে পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। পরকীয়ার কারণে মায়ের নিজ সন্তান হত্যা হয়তো খুব চরম এবং ব্যতিক্রমী উদাহরণ, কিন্তু আকর্ষণীয় সঙ্গীর জন্য বর্তমান সঙ্গীকে ত্যাগ, কিংবা স্বামীর তুলনায় আরও ‘উৎকৃষ্ট কারো সাথে লুকিয়ে ছাপিয়ে পরকীয়া তা নয়। এ ব্যাপারটা সব সময়ই এবং সব সমাজেই ছিল। পয়সাওয়ালা কিংবা সুদর্শন, স্বাস্থ্যবান, আকর্ষণীয়, মনোহর কিংবা উঁচু পদমর্যাদাসম্পন্ন সঙ্গীর জন্য পুরাতন সঙ্গীকে ত্যাগ মেয়েদের মধ্যে এক সময় একধরনের অভিযোজনগত উপযোগিতা দিয়েছিল, অন্তত হেলেন ফিশারের মতো নৃতত্ত্ববিদেরা তাই মনে করেন[২৩৭]। সেই আদিম শিকারি সংগ্রাহক সমাজের কথা চিন্তা করুন, যেখানে একটি নারীকে বিয়ে করতে হয়েছিল এক দুর্বল শিকারিকে যার চোখের দৃষ্টি ছিল ক্ষীণ, শিকারে অযোগ্য এবং স্বভাবে কাপুরুষ। এ ধরনের সম্পর্কে থাকা নারীরা মানসিক অতৃপ্তি মেটাতে হয়তো পরকীয়া শুরু করেছিল সুস্থ সবল, স্বাস্থ্যবান তরুণ কোনো সাহসী শিকারির সাথে–’মিস্টার গুড জিন’ পাওয়ার এবং ভবিষ্যত সন্তানের মধ্যে তা রেখে যাওয়ার প্রত্যাশায়। ভালো জিনের জন্য সঙ্গীবদলের ব্যপারটি যদি আদিম শিকারি সংগ্রাহক পরিস্থিতিতে নারীদের একধরনের স্ট্র্যাটিজি হয়ে থাকে, তবে সেটি এখনকার সময়েরও বাস্তবতা হতে পারে তা নির্দ্বিধায় বলা যায়। র্যান্ডি থর্নহিলের একটি সাম্প্রতিক গবেষণা থেকে এই ‘গুড জিন’ অনুকল্পের সত্যতা পাওয়া গিয়েছে[২৩৮]। গবেষণায় দেখা গেছে নারীরা যখন পরকীয়া করে তখন প্রতিসম চেহারার প্রতি আকর্ষিত হয় বেশি[২৩৯]। প্রতিসম চেহারা সবসময়ই একটি ভালো ‘ফিটনেস মার্কার হিসেবে বিবেচিত। প্রেমিকের চেহারা প্রতিসম হওয়া মানে তার প্রেমিকের চেহারা আকর্ষণীয়, তার শরীরের গঠন উন্নত, সে পুরুষালি, বুদ্ধিদীপ্ত, চৌকষ, স্বাস্থ্যবান এবং রোগজীবাণু থেকে মুক্ত[২৪০]। তাই যে নারী স্বামীকে রেখে প্রতিসম বৈশিষ্ট্যের প্রেমিকের পেছনে ছুটছে, তার প্রস্তর যুগের মস্তিষ্ক’ আসলে প্রকারান্তরে ‘ভালো জিন’ নিজ সন্তানের জন্য নিশ্চিত করে রাখতে চাইছে।
