ক্ষমতা বাড়িয়ে অধিক নারীর দখল নেওয়া সম্ভবত পুরুষদের মেটিং স্ট্র্যাটিজি ছিল বরাবরই। যারা এই স্ট্রাটিজিতে সফল হয়েছে, তারাই অধিক হারে নারীর দখল নিতে পেরেছে, আর বহু সন্তান-সন্ততি রেখে গেছে। যেমন মৌলে ইসমাইল এক হাজারের উপর সন্তান সন্ততি রেখে গিয়েছিলেন হারেমের অসংখ্য নারীর গর্ভে গর্ভসঞ্চারের মাধ্যমে। চেঙ্গিস খান আর বংশধরেরা বিভিন্ন দেশে যুদ্ধজয়ের পরে এমনই ধর্ষণ করেছিলেন যে, এশিয়ার প্রায় ৮% জনসংখ্যার মধ্যে তাদের জিন ট্রাক করা যায় এখনও। শুনতে হয়তো খারাপ লাগবে, কিন্তু যে স্ট্র্যাটিজিগুলো ক্ষমতাবান পুরুষেরা একসময় ব্যবহার করেছিল তাদের প্রজননগত সফলতা ত্বরান্বিত করতে, সেগুলোর ছাপ আধুনিক সমাজেও পাওয়া যায়। সেজন্যই আদিম শিকারি-সংগ্রাহক ট্রাইব থেকে শুরু করে আলেকজান্ডার, চেঙ্গিসখান থেকে আধুনিক সমাজের বিল ক্লিন্টন, ডমেনিক স্ট্রাউস কান, আর আর্নল্ড শোয়ার্সনেগারদের মতো ক্ষমতাশালীদের আচরণে এটাই বোঝা যায় যে ক্ষমতার সাথে বহুগামিতার জোরালো সম্পর্ক অতীতেও ছিল, এখনও আছে।]
একটি ব্যাপারে এখানে সতর্ক থাকা প্রয়োজন। উপরের আলোচনা থেকে কেউ যদি ধরে নেন, ক্ষমতাশালী হলেই সবাই পরকীয়ায় আসক্ত হবেন কিংবা নারীলোলুপ হয়ে যাবেন, তা কিন্তু ভুল হবে। আমাদের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি এরশাদের নামে যে রকম নারী কেলেঙ্কারীর অপবাদ ছিল, বাংলাদেশের অন্য অনেক রাষ্ট্রপতিরদের ক্ষেত্রে তা ছিল না। অথচ সকলেই ছিলেন একইরকমভাবেই বাংলাদেশের ক্ষমতার শীর্ষে। আমেরিকায় রাষ্ট্রপতি থাকাকালীন সময়ে বিল ক্লিন্টন মনিকার সাথে যা করেছেন বুশ কিংবা ওবামা তা করেননি। ক্ষমতা থাকলেই কেউ এরশাদের মতো নারীলোলুপ হয় না, খুব সত্যি কথা। কিন্তু এরশাদ সাহেবের মতো নারীলোলুপতা বাস্তবায়িত করতে হলে বোধ করি রাজনৈতিক, সামাজিক বা অর্থনৈতিকভাবে যথেষ্ট ক্ষমতাশালী হওয়া চাই। অর্থাৎ, ক্ষমতার শীর্ষে থাকলে কিংবা ক্ষমতাশালী হয়ে উঠলে সেই ‘পুরুষালি লালসা’ পুরিস্ফুটনের সুযোগ থাকে বেশি, ব্যাপারটা ত্বরান্বিত হয় অনেক ক্ষেত্রেই। আকবরের পক্ষেই সম্ভব ছিল ৫০০০ নারীর হারেম পোর, কিংবা সুলতান মৌলে ইসমাইলের পক্ষেই সম্ভব ছিল ১০৪২জন সন্তান-সন্ততি ধরাধামে রেখে যাওয়ার; সহায়সম্বলহীন রহিমুদ্দিনের পক্ষে নয়। সেজন্যই সাতোসি কানাজাওয়া তার বইয়ের ‘গাইস গন ওয়াইল্ড’ অধ্যায়ে বলেছেন–
Powerful men of high status throughout the history attained very high reproductive success, leaving a large number of offspring (legitimate or otherwise), while countless poor men in the country died mateless and childless. Moulay Ismail the Bloodthirsty stands out quantitively, having left more offspring than anyone else on record, but he was by no means qualitatively different from other powerful men, like Bill Clinton.
বিভিন্ন ধর্মীয় চরিত্র এবং ধর্ম প্রচারকদের জীবনী বিশ্লেষণ করলেও এই অনুকল্পের সত্যতা মিলবে। পদ্মপুরাণ অনুসারে (৫/৩১/১৪) শ্রীকৃষ্ণের স্ত্রীর সংখ্যা ষোল হাজার এক শ। এদের সকলেই যে গোপবালা ছিলেন তা নয়, নানা দেশ থেকে সুন্দরীদের সংগ্রহ করে তার হারেমে’ পুরেছিলেন কৃষ্ণ স্বীয় ক্ষমতার আস্ফালনে। হিন্দু ধর্মের ক্ষমতাবান দেবচরিত্রগুলো ইন্দ্র থেকে কৃষ্ণ পর্যন্ত প্রত্যেকেই ছিলেন ব্যভিচারী; ক্ষমতাবান ব্রাহ্মণ মুনিঋষিরা যে ছিল কামাসক্ত, বহুপত্নীক এবং অজাচারী–এগুলো তৎকালীন সাহিত্যে চোখ রাখলেই দেখা যায়। এই সব মুনিঋষিরা ক্ষমতা, প্রতিপত্তি আর জাত্যাভিমানকে ব্যবহার করতেন একাধিক নারীদখলের কারিশমায়। ইসলামের প্রচারক মুহম্মদ যখন প্রথম জীবনে দরিদ্র ছিলেন, প্রভাব প্রতিপত্তি তেমন ছিল না, তিনি খাদিজার সাথে সংসার করেছিলেন। খাদিজা ছিলেন বয়সে মুহম্মদের ১৫ বছরের বড়। কিন্তু পরবর্তী জীবনে মুহম্মদ অর্থ, বৈভব এবং সমরাঙ্গনে অবিশ্বাস্য সফলতা অর্জন করার পর অপেক্ষাকৃত কম বয়সি সুন্দরী নারীদের প্রতি আকৃষ্ট হন। খাদিজা মারা যাওয়ার সময় মহানবির বয়স ছিল ৪৯। সেই ৪৯ থেকে ৬৩ বছর বয়সে মারা যাওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি কমপক্ষে হলেও ১১ টি বিয়ে করেন[২২৫]। এর মধ্যে আয়েশাকে বিয়ে করেন আয়েশার মাত্র ৬ বছর বয়সের সময়। এ ছাড়া তার দত্তক পুত্র যায়েদের স্ত্রী জয়নবের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে তাকে বিয়ে করেন (সে সময় আরবে দত্তক পুত্রের স্ত্রীকে বিয়ে করার রীতি প্রচলিত ছিল না, কিন্তু মুহম্মদ আল্লাহকে দিয়ে কোরানের ৩৩:৪, ৩৩:৩৭, ৩৩:৪০ সহ প্রভৃতি আয়াত নাজিল করিয়ে নেন); এ ছাড়া ক্রীতদাসী মারিয়ার সাথে সম্পর্ক স্থাপন করেছিলেন (সে সময় তিনি হাফসাকে ওমরের বাড়ি পাঠিয়েছিলেন বলে কথিত আছে[২২৬]) যা হাফসা এবং আয়েশাকে রাগান্বিত করে তুলেছিল; যুদ্ধবন্দি হিসেবে জুয়ারিয়া এবং সাফিয়ার সাথে সম্পর্ক পরবর্তীতে নানা রকম বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। বিভিন্ন পথে নারীর দখল নিতে মুহম্মদ আগ্রহী হয়েছিলেন তখনই যখন তার অর্থ প্রতিপত্তি আর ক্ষমতা বেড়ে গিয়েছিল বহুগুণে।
