এ ব্যাপারে বড়সড় গবেষণা করেছেন অস্টিনের টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয়ের বিবর্তন মনোবিজ্ঞানের অধ্যাপক ডেভিড বাস। ৫১১ জন কলেজ ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে চালানো এ গবেষণায় তাদের কল্পনা করতে বলা হয় যে, তার সঙ্গী কারো সাথে যৌনসঙ্গমে প্রবৃত্ত হয়েছে কিংবা কারো সাথে মানসিক আবেগময় এক ধরনের সম্পর্ক তৈরি করেছে। কোন ব্যাপারটা তাকে বেশিঈর্ষাকাতর করে তুলবে? প্রায় ৮৩ শতাংশ নারী মনেকরেছে তার সঙ্গী তাকে না জানিয়ে অন্য কোনো মেয়ের সাথে আবেগময় সম্পর্ক গড়ে তুললে সেটা তাকে ঈর্ষাপরায়ণ করে তুলবে, কিন্তু ছেলেদের ক্ষেত্রে সেটি মাত্র শতকরা ৪০ ভাগ। অন্যদিকে শতকরা ৬০ ভাগ ছেলে মত দিয়েছে তার সঙ্গী তার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে অন্য কারো সাথে দৈহিক সম্পর্ক গড়ে তুললে সেটা তাকে চরম ঈর্ষাকাতর করে ফেলবে। মেয়েদের ক্ষেত্রে সেটা পাওয়া গেছে মাত্র ১৭ ভাগ[১২৫]। বাসের এই ফলাফল কেবল আমেরিকার গবেষণা থেকে পাওয়া গেলেও পরবর্তীতে কোরিয়া, জাপান, চীন, সুইডেনসহ অনেকে দেশেই একই ফলাফল পাওয়া গেছে বলে দাবি করা হয়েছে[১২৬]। একই ধরনের ফলাফলের দাবি এসেছে হাঙ্গেরি, মেক্সিকো, নেদারল্যান্ডস, সোভিয়েত রাশিয়া এবং যুগোস্লাভিয়াতে চালানো সমীক্ষা থেকেও[১২৭]। তাই বিবর্তন মনোবিজ্ঞানীরা ধারণা করেন নারী-পুরুষে এই ঈর্ষাগত পার্থক্য সমগ্র মানবজাতির মধ্যেই পারিসাংখ্যিক পরিসীমায় বিস্তৃত। ধারণা করা হয় বিবর্তনের দীর্ঘদিনের যাত্রাপথে নিজের সঙ্গীকে ধরে রাখার অভিপ্রায়ে আমাদের পূর্বপুরুষরা যেভাবেঈর্ষা প্রদর্শন করে প্রজননগত সফলতা পেয়েছিল, তার বিবিধ ছাপই দেখা যায় আজকের নারী-পুরুষদের মানসপটে। বলাবাহুল্য, নারী এবং পুরুষেরা ভিন্নভাবে সঙ্গী নিজেদের আয়ত্বে রাখার কৌশল করায়ত্ব করেছিল, সেই পার্থক্যসূচক অভিব্যক্তিগুলোই স্পষ্ট হয় নারী পুরুষের ঈর্ষাকেন্দ্রিক মনোভাব ঠিকমতো বিশ্লেষণ করলে।
তবে সবাই যে অধ্যাপক বাসের এ উপসংহারগুলোর সাথে একমত পোষণ করেছেন তা নয়। যেমন করেননি নর্দার্ন ইলিনয় বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শনের অধ্যাপক ডেভিড বুলার। তিনি তার বই ‘অভিযোজনরত মনন’ (Adapting Minds) বইয়ে[১২৮] এবং বেশ কিছু প্রবন্ধে অধ্যাপক বাসের ঈর্ষা সংক্রান্ত গবেষণাগুলোর পদ্ধতিগত সমালোচনা হাজির করেছেন[১২৯]। পুরুষেরা কেবল সঙ্গীর যৌনতার ক্ষেত্রে অবিশ্বস্ততার সন্ধান পেলেই কেবল ঈর্ষান্বিত হয়ে উঠেন, অন্য কিছুতে তেমন নয় বলে বাস যে অভিমত দিয়েছেন, তা সঠিক নয় বলে বুলার মনে করেন। আমরা জীবনানন্দ দাশের আকাশলীনা কবিতায় যুবককে দেখেছি সুরঞ্জনা এক অচেনা যুবকের সাথে যৌনসম্পর্ক স্থাপন নয়, কেবল কথা বলাতেই উদ্বিগ্ন হয়ে উঠেছে। এ ধরনের অনেক পুরুষই আমাদের চারপাশে আছে। আবার যৌনতার ব্যাপারেও উদার পুরুষের সংখ্যাও কম নয়। যেমন, অধ্যাপক বাসের গবেষণা থেকেই উঠে এসেছে যে, জার্মানি কিংবা নেদারল্যান্ডের মতো দেশে যেখানে যৌনতার ব্যাপারগুলো অনেক শিথিল, সেখানে পুরুষেরা সঙ্গীর যৌনতার ব্যাপারে অনেক কম ঈর্ষাপরায়ণ থাকেন। কোরিয়া এবং চীনের মানুষদের উপর গবেষণা করেও দেখা গেছে সেখানকার পুরুষেরা সঙ্গীর যৌনতার ক্ষেত্রে অবিশ্বস্ততার আলামত পেলে অন্য অনেক দেশের পুরুষদের মতো খুব বেশি মনক্ষুণ্ণ হন না। আবার নারীদের ক্ষেত্রেও তারা কেবল সঙ্গীর রোমান্টিক কিংবা ‘ইমোশনাল’ সম্পর্কে জড়িয়ে পড়াকে বেশি গুরুত্ব দেয়, সঙ্গীর রোমান্সবিহীন যৌন সম্পর্ককে নয় বলে ঢালাওভাবে উপসংহার টানা হয়েছে সেটাও কতটুকু নিশ্চিত সে প্রশ্ন থেকেই যায়। আমরা কিছুদিন আগেই দেখেছি ক্যালিফোর্নিয়ার ভূতপূর্ব গভর্নর এবং খ্যাতিমান অভিনেতা আর্নল্ড শোয়ার্সনেগার এবং তার স্ত্রী মারিয়া শ্রাইভারের দীর্ঘ পঁচিশ বছরের বৈবাহিক সম্পর্ক ভেঙে যেতে। আর্নল্ড শোয়ার্সনেগার বিবাহিত সম্পর্কের বাইরে তার বাসার গৃহপরিচারিকার সাথে যৌনসম্পর্ক রেখেছিলেন। এমন নয় যে, শোয়ার্সনেগার পরিচারিকার সাথে কোনো রোমান্টিক সম্পর্কে জড়িয়েছিলেন। যৌনতার ক্ষেত্রে অবিশ্বস্ততার আলামত পাওয়াতেই মারিয়া শ্রাইভার শোয়ার্সনেগারকে ছেড়ে চলে গেছেন। অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী নারীরা সঙ্গীর যৌন-অবিশ্বস্ততাকে খুব গুরুত্ব দিয়েই গ্রহণ করে, অধিকাংশ পুরুষের মতোই। তাই অধ্যাপক বুলারের মতে বিবর্তন পুরুষ নারীতে ঈর্ষার কোনো ‘আলাদা মেকানিজম’ তৈরি করেনি, বরং নারী পুরুষ উভয়ই ঈর্ষাকেন্দ্রিক একই মেকানিজমের অন্তর্ভুক্ত হতে পারে, কেবল এর পরিস্ফুটন পরিস্থিতিভেদে ভিন্ন হয়।
.
ঈর্ষার পরিণাম
এখন কথা হচ্ছে ঈর্ষার পরিণাম কীরকম হতে পারে? ছোটখাটো সন্দেহ, ঝগড়াঝাটি, দাম্পত্য কলহ, ডিভোর্স থেকে শুরু করে গায়ে হাত তোলা, মারধোর থেকে শুরু করে হত্যা পর্যন্ত গড়াতে পারে, তা সবাই মোটামুটি জানেন। যেহেতু অধিকাংশ বিবর্তনবাদী মনোবিজ্ঞানীরা মনে করেন যে, ‘সেক্সুয়াল জেলাসি’ জৈবিক কারণে পুরুষদেরই বেশি, তারাই পরকীয়া কিংবা কোকিলাচরণের কোনো আলামত সঙ্গীর মধ্যে পেলে গড়পড়তা বেশি সহিংস আচরণ করে।
সঙ্গী ‘অযাচিত’ সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েছে এই সন্দেহ একজন ঈর্ষাপরায়ণ পুরুষের মনে দানা বাঁধলে তিনি কী করবেন? অনেক কিছুই করতে পারেন। হয়তো স্ত্রী বা সঙ্গী একা বাড়ি থেকে বেরুলে গোপনে তার পিছু নেবেন, হয়তো অফিসে গিয়ে হঠাৎ করেই ফোন করে বসবেন জানতে তার স্ত্রী বা সঙ্গী এখন ঠিক কী করছেন, খোঁজ-খবর নেবেন মার্কেটে যাওয়ার কথা বলে স্ত্রী আসলেই মার্কেটে গিয়েছে নাকি ঢুকে গিয়েছে তার গোপন প্রেমিকের ঘরে। তিনি চোখে চোখে রাখবেন তার সঙ্গী কোনো পার্টিতে, বিয়ে বাড়িতে কিংবা জন্মদিনের অনুষ্ঠানে গেলে কী করেন, কোথায় কার সাথে আড্ডা মারেন। সঙ্গীর অবর্তমানে গোপনে তার ইমেইল পড়বেন, কিংবা সেলফোনের টেক্সটে নজর বুলাবেন, ইত্যাদি। এই আচরণগুলোর সমন্বিত একটি নাম আছে বিবর্তনীয় মনোবিজ্ঞানের অভিধানে ভিজিলেন্স (vigilance); এর বাংলা আমরা করতে প্রি ‘শকুনাচরণ’। শকুন যেমন উপর থেকে নজর রাখে তার শিকারের প্রতি, ঈর্ষাপরায়ণ পুরুষের আচরণও হয়ে দাঁড়ায় তার সঙ্গীর প্রতি অনেকটা সেরকমের।
